রাতের রেলগাড়ি





রাতের রেলগাড়ি


ভোরের কুয়াশা ভেদ করে ছুটে চলেছে মেল ট্রেন ।  আবছা নীল আলোয় ভেসে উঠছে চরাচর । দূরের খেজুর গাছ থেকে রসের হাঁড়ি নামছে ।  একটা ভুলো কুকুর ছুটছে হাঁড়ির পেছনে ।  ধান কাটা শুকনো মাঠে জাঁকিয়ে বসছে শীত । গায়ে তার ধূসর চাদর । হঠাৎ ঝাঁকড়াচুলো গাছ ছুটে আসে জানলার কাছে । ভয় পেয়ে সরে আসি ।  চোখে উড়ে আসে কয়লার গুঁড়ো ।  পাশের লোকটি কাঁধ ছোঁয় । চা খাবেন ? অবাক হই । কুয়াশা মোড়া এই যাত্রায় চায়ের স্টেশন কোথায় ? ভাবতে ভাবতে গতি কমে আসে ।  রেলিং দেওয়া লাল কাঁকরের প্ল্যাটফর্ম ।  দু একটা একলা গাছ । কিচ্ছু নেই আর । কাঁধে বাক্স নিয়ে একটি খাটো ধুতি পরা লোক ।  দূর থেকে দৌড়ে আসছে পেতলের সামোভার নিয়ে একটি লোক।  সঙ্গে ঝুড়িতে মাটির ভাঁড় ।
গরম ধোঁয়াওঠা চা হাতে নিয়ে ভাবছি , মিরাকল !  এমন নিস্তব্ধ শীতের ভোরে কি করে এমন উষ্ণতা জুটলো ? মাটির ভাঁড়ের সোঁদা স্বাদ নিতে নিতে চোখ তুলে দেখলাম । পাশের লোকটা দূরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চা খাচ্ছে । পি সি সরকারের মতো লাগলোনা একটুও ।


চিরকাল রাতের রেলগাড়ি আমাকে টানে । বিছানায়  গভীর ঘুমে অচেতন থেকেও ছুটন্ত রেলগাড়ির আওয়াজ পাই । ঝিক ঝিক শব্দে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে চলেছে গাড়ি । ইঞ্জিন কামরার বয়লারে বিশাল হাতা বেলচা করে কয়লা তুলে গনগনে আগুনে ঢালছে এক আদিম মানব । সে রাত জাগতে ভালোবাসে । দিনের সঙ্গে তার যোগ বড় কম । সে কমলা আগুনকে ঘিরে থাকা চাপ অন্ধকারের মানুষ । আমি ঘুমের মধ্যে কামরা বরাবর হাঁটতে থাকি । গাড়ির দুলুনিতে দুলতে দুলতে হাঁটি । পৌঁছে যাই বয়লারের কাছে । একদৃষ্টে দেখতে থাকি ধ্বকধ্বকে আগুন । ওই শিখা কি পৃথিবীর জঠরে জ্বলতে থাকা সেই তেজ ? কি জানি ! তবে এর আকর্ষণ ওই মাধ্যাকর্ষণের চেয়ে কম নয় ! এর আকর্ষণেই আমি রেলগাড়ির কামরায় ঢুকে পড়ি । ঘুম আমাকে পৌঁছে দেয় ছুটন্ত রেলগাড়িতে । সে শুধু দৌড়তে থাকে । আহ্নিক গতির ধারা নিয়ে ।
ঘুমের মধ্যেই আমি আশায় থাকি । ভোরের স্টেশন আসবে ।
এক ভাঁড় চায়ের উষ্ণতা মেখে আমি টলতে টলতে ইঞ্জিন কামরার দিকে যাই । ওকে উষ্ণতা দিতে হবে ।
আমাকে অবাক চোখে দেখতে থাকে সেই কয়লা মাখা লোক। যেন লন্ঠন হাতে লেভেল ক্রসিংএ দাঁড়িয়ে থাকা ওর আপনজন । আমি বলি , চা খাবেন ? লোকটার চোখের পলক পড়েনা । ভাঁড়টা নিয়ে তৃপ্তির চুমুক দেয় । তারপর বলে , ওঃ কী অদ্ভুত কাণ্ড । আমি আমার হাতের যাদুদণ্ড খুঁজি । কোথায় যে হারিয়ে যায় মাঝে মাঝে ! !




চিঠি এসেছে ।

স্নেহের বুবু

আগামী ষোলোয় মানুর বিবাহ স্থির হইয়াছে ।  মাঝে ২ যদিও ভাবি , পাত্রী দেখিবার সময় তপুকে সংবাদ দেওয়া হয় নাই । সে বিলক্ষণ অপমানিত বোধ করিতে পারে , তবু আমি কর্তব্য জ্ঞানে জানাইলাম । আমরা ভালো আছি । আশা করি তোমাদের সব কুশল ।

                                       আঃ মা

মায়ের দুচোখ ভরে জল । দাদার বিয়ের সংবাদ পায়নি । বাবার অসম্মানের কথা ভেবেছে দিদিমা । আমরা দাদি বলি । আঃ অর্থ আশীর্বাদ সহ । আঃ কোনও বিরক্তিসূচক ধ্বনি নয় ।

আমাদের মনে সংশয় । যাবো কি যাবো না ?
অবশেষে সেই রাতের রেলগাড়ি । এক ষাটেই থুথ্থুরে বুড়ি , মাথায় লম্বা একঢাল সাদা চুল নিয়ে সাদা থানে ঢাকা আমার দাদি । বাবা ভীষণ ভালোবাসে । শীতের খেজুর গুড় , পাটালি , ভালো জর্দা , তসরের চাদর নিয়ে আমরা চললাম মামার বাড়ি । বিয়ের কি বুঝি ? বুঝি দাদির আদর । মামার সাইকেল চেপে রেলকলোনির রাস্তায় রাস্তায় পাক দেওয়া । দূরের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকা । সন্ধ্যে হলেই স্টেশনে যাওয়া । চুপ করে শীত পোহাতে পোহাতে লাইনের দিকে তাকিয়ে থাকা । কখনো লাল কখনো সবুজ লন্ঠনের দুলুনি । পাশের বেহারির কালাকাঁদ ।

রাতের রেলগাড়ির মধ্যে সঙ্গী হত চাঁদ । যতদূর যাই সেও সঙ্গে যায় । একটুও ছাড়েনা । আমি একদৃষ্টে দেখতে থাকি । চোখে কুয়াশা জন্মায় । চাঁদের ঘরবাড়ি দেখতে পাই ।  হঠাৎ কুঊঊ শব্দে ঘোর কেটে যায় । দেখি বাবা হোল্ড অল বিছিয়ে ফেলেছে । আমি শুয়ে শুয়ে ভাবি ঘুমোবনা । কিছুতেই না । রেলগাড়ির সঙ্গে ছুটব । কিন্তু নিজের অজান্তে ঘুমিয়ে পড়ি । ভোর হবার আগেই গার্ড কাকু এসে ডাকে । তপু মেয়েটাকে তোল । একটু আদা দিয়ে চা খেয়ে নিক । বাবা না বলতে পারেনা । বিহারের যা ঠাণ্ডা ! মেয়েটা বড্ড শীতকাতুরে ।
চায়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব মামার বাড়ি গেলেই হয় । যেমন মামার বাড়ির মৌসুমী বন্ধুরা ।

  কখনো স্বপ্নে দেখি মামার বিয়েটা হলোনা । সবাই দুঃখ করছে । মামার বিষন্ন মুখ । দাদির মুখে তেমনি শান্তির ছাপ । আমি খুশি হই । বারবার বিয়ের ঠিক হবে । বারবার রেলগাড়ি চাপবো । চাঁদের সঙ্গে মামার বাড়ি যাবো । গার্ড কাকুর দেওয়া আদা চা খাবো । জীবনে কত কিছুই ত হয় । কত সাধ পূর্ণ হয় । তবে এইটুকুই বা হবেনা কেন ? যাদু দণ্ডের ছোঁয়াটা কেবল চাই ।



রাতের রেলগাড়ি যে কত দূরে যেতে পারে তার কোনও ধারণা প্রাপ্তবয়স্ক সচেতন মন করতেই পারেনা । সীমা দিয়ে গণ্ডি দিয়ে ভূগোলকে আমরা সান্ত করেছি । অনন্ত ভূগোল আর সময়ের জাদুকরী মায়া হঠাৎ হঠাৎ মেঘ সরে গিয়ে জ্যোৎস্নার আলোর মতো বেরিয়ে আসে ।
   সকালের রোদ্দুর খোলা জানলা দিয়ে মেঝেতে জ্যামিতিক নকশা তুলেছে । ফুলকাটা নকশা ।  সামনে একটা লম্বাটে টুলের ওপরে দিসতে কাগজ রেখে বুকে বালিশ চেপে লিখছে বাবা । কি লিখছে জানিনা । তবে জানি , এখন কিছু বললে শুনতে পাবেনা । যা বলব একটা উত্তর দিয়ে দেবে যাহোক । এটা লটারি । হ্যাঁ বলতেও পারে নাও পারে ।

   আমি সামনের মেঝেতে পড়ে থাকা ফুলেল নকশা নিয়ে খেলতে থাকি । পাঁচ ছটা তেঁতুল বীচি নিয়ে আলোভরা খোপে রাখি । আর লোফালুফি করে খেলতে থাকি । নকশাটা সেই তেঁতুল বীচির চকলেট রং নিয়ে পাল্টাতে থাকে । আমি ভুলে যাই । কি যেন ? কি যেন অনুমতি নেবো বাবার থেকে ?  চোখে ঘোর লাগে । মেঝেতে শুয়ে পড়ি । এতক্ষণ মাথা নীচু করে লিখে চলা বাবা হঠাৎ চোখ তুলে তাকায় ।  'কি হলো ?' আমি উঠে বসি । একরাশ ঘন অবিন্যস্ত চুলে ভরা মাথা আর দুটো বড় বড় চোখ । অবাক হই । বাবা লক্ষ করেছে ? তবে যে লিখতে গিয়ে কিচ্ছু দেখতে বা শুনতে পায়না ? আস্তে আস্তে উঠে বিছানায় বসি । বাবা কাছে টানে । মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে , কতদিন বলেছি ওসব তেঁতুল বীচি নিয়ে খেলা করোনা । আলোয় চোখে ওরকম ধাঁধা লাগে । আমি চুপ করে বসে আদর খাই । বাবা একসময় একটা ফাউন্টেন পেন আর দুটো কাগজ এগিয়ে দেয় । 'যাও , বসে বসে তোমার যা ইচ্ছে লেখো । ' হাতে স্বর্গ পাই যেন । এমন সময় মায়ের কুন্ঠিত গলা ভেসে আসে ।  গুগুল একটু কাঁচা লঙ্কা এনে দিবি ? শেষ হয়ে গিয়েছে । লক্ষ্মী মেয়ে । দৌড়ে যা বাবা ।

    আমি স্টেশন দেখে নেমে পড়ি । সবসময় এমন জনহীন স্টেশনেই কেন যে গাড়িটা থামে ! আমার হাতে কাঁচা লঙ্কার ঠোঙা আর ডান হাতে ধরা কাগজ কলম । প্ল্যাটফর্মের বাঁধানো বেঞ্চিতে বসে আমি একপাশে লঙ্কার ঠোঙা রাখি । আর তারপর কাগজ পেতে কলম খুলে ধরি ।

  বাবার কাপের শেষে পড়ে থাকা চায়ে চুমুক দিই । আঃ !



রেলগাড়ির যাচ্ছি এবার , আবার যাবো , দোলাতে দুলতে দুলতে রাতের ঘুম গাঢ় হয় । মাথার কাছে জানলা দিয়ে ফুরফুরে হাওয়া এসে চুলে ঢেউ খেলিয়ে যায় । গভীর ঘুমের মধ্যে কত নাম না জানা স্টেশন পেরিয়ে যায় । রাতের অন্ধকারে প্ল্যাটফর্মের ওপরে টিমটিমে হলুদ আলো ছাড়া তাদের আর কোনও প্রাণ নেই ।  থাকতে হয় তাই থাকা । তাদের বুকের ওপর দিয়ে চলে যায় রাতের রেলগাড়ি । একপাশে কামরার দরজায় একা স্টেশন মাষ্টার দাঁড়িয়ে থাকে । রাতের শেষ মেল ট্রেন চলে গেলে সাইকেল নিয়ে একটু দূরের কলোনীতে ফিরে যাবে ।
       কিন্তু সব স্টেশন কিছু এমন নিস্তব্ধ অভিমানে বসে থাকেনা । রাতের ধ্যানমগ্ন গাম্ভীর্যকে বিদ্রূপে উড়িয়ে দিয়ে কোনও স্টেশন অত্যধিক আলো ঝলমলে হয়ে থাকে । তার প্ল্যাটফর্মে টানা করোগেটেড টিনের শেডের তলায় দুমুখো বেঞ্চি । বড় হুইলার স্টল । চায়ের ফেরিওয়ালা ছাড়াও কেক বিস্কুট পেস্ট্রি প্যটিসের দোকান । সেখানে রেলগাড়ি যেন বিশেষ অতিথি । থেমে থাকে কিছুক্ষণ ।  আমার ঘুম ভেঙে যায় । কে যেন এই স্টেশনে নামবে । সে বার্থের তলা থেকে টেনে বার করছে তার বাক্স বেডিং। ব্যস্ততা তুঙ্গে । যেন যাত্রাটা মিথ্যে । গন্তব্যে পৌঁছনোটাই আসল ।  ঘুম ভেঙে উঠে বসি । নতুন যাত্রী উঠে আসে ।

    এক পৌষের ঠাণ্ডায় বাবা আমাকে নিয়ে উঠেছে এক রাতের গাড়িতে ।  দাদি আর নেই । সব্বাই পৌঁছে গেছে চক্রধরপুর ।  শুধু আমি আর বাবা পরে যাচ্ছি । বাবা আমাকে নামিয়ে দেবে স্টেশনে । মামা আসবে নিতে । বাবা যাবে চাইবাসা । দুদিন পর আসবে ।

     ঘুমের মধ্যে মন খারাপ । বাবা ডাকছে । গুগুল ওঠ । এসে গেছে । তোকে নামতে হবে । ঘুম চোখে উঠে বসি । নামব । কিন্তু বাবা ? বাবাকে ছেড়ে নেমে যাবো ?

গাড়ি চলতে শুরু করে দিয়েছে । জানলা দিয়ে হাত বাড়িয়ে হাত নাড়ছে বাবা । মন খারাপ করছিস কেন ? আমি ত পরশুই চলে আসব !

  নেমে গেছি । বাবা সেই কবে রাতের রেলগাড়ি চেপে চলে গেছে ! কোথায় গন্তব্য কে জানে ?



  যেদিন দুপুরবেলা হঠাৎ রাজ্যের ঘুম চোখে নামে , সেদিন সাঁঝবেলায় ঘুম ভেঙে উঠে বসি , সঙ্গে একরাশ মন খারাপ । জানলার ল্যাম্প পোস্ট দিয়ে আসা মরা হলুদ আলো বিছানায় এসে পড়ে । মনে হয় , একদিন অন্ধকার থেকে যাবে এমনই স্থবির হয়ে । উঠে দাঁড়াবে না । আলোর সুইচে হাত পড়বেনা ।
    দুপুরের ঘুম তাই আমার একটুও ভালো লাগেনা । যদি এমন ঘুমিয়ে পড়ি ? যে সন্ধ্যে হয়ে গেলো ? কিংবা হয়ত রাত হয়ে গেলো ? ঘুম ভাঙলনা ?
 
  একটা সব হারানোর স্টেশন সবসময় হাতছানি দেয় । দ্রুত রেলগাড়ি ছোটে ।  ঝাপসা আলোর মালা সরে সরে চলে যায় । জানা হয়না কোন স্টেশন পেরিয়ে গেলো ।  বেশ বড় ছিল ত ! তবে কি ওইখানে কারোর নামার ছিলোনা ? গন্তব্য নয় কারোর ?  এমন সরে যাওয়া আলোর ফাঁকে ফাঁকে কামরার মধ্যে ফিরে চাই । আমার চারিদিকে আমারই প্রিয়জন ।

    সেবার চলেছি কাশ্মীর । তখন আট । ট্রেনে উঠে দুদিন ধরে যাওয়া হবে পাঠানকোট । ভারী আনন্দ আমাদের । ভাইবোনেরা মশগুল । দু দুটো রাত ট্রেনে ! কি মজা ! একটা চলন্ত ঘরবাড়ি আমাদের । আসলে তখন ত জানিই না , ঘরবাড়ি সত্যিই চলন্ত ! আজ যেখানে আছি কাল সেখানে নেই । থাকতেই পারিনা ।
এও জানিনা যে সবার গন্তব্য আলাদা । কে যে কখন নেমে যাবে আগে থেকে বলা যায়না । কখনো জানান দিয়ে শোরগোল তুলে কুলির মাথায় বাক্স প্যাঁটরা চাপিয়ে কেউ নামে । কেউ আবার অলক্ষে চুপচাপ চাঁদভাঙা জ্যোৎস্নায় নেমে পড়ে অখ্যাত স্টেশনে । পড়ে থাকে তার সব সম্পদ । হঠাৎ জানলা দিয়ে দেখতে পাই চরাচর ভেসে যাওয়া জ্যোৎস্নায় একলা মানুষ কী আনন্দে মাঠ পেরিয়ে যাচ্ছে ।
এমন একবার হলো । মাকে জিজ্ঞেস করলাম , আচ্ছা ওই লোকটা ট্রেন সিগন্যালে থামতেই নেমে গেলো কেন ? এখানে ত স্টেশন নেই ? মা বলল , ওর বাড়িটা হয়ত এখান থেকে কাছে হয় । স্টেশন থেকে দূর । তাই এখানেই নেমে পড়েছে । আমি তাও বললাম , ওর ভয় ত করছেনা মোটেই ? কেমন দুহাত তুলে লাফাতে লাফাতে চলেছে । মা হাসল । অনেক দিনের পরে ও হয়ত ওর মা বাবাকে দেখতে পাবে । তাই ভয় নেই আর । আনন্দে পথ চলছে ।


গন্তব্য তাই আছেই । কেউ বাক্স বয়ে নিয়ে যেতে ভালোবাসে । অর্জিত ধন । কেউ বা প্রিয়জনের কাছে ফেরার তাগিদে অমনি দিকশূন্য নেমে পড়ে ।
একটাই প্রশ্ন থেকে যায় । প্রিয়জন অপেক্ষায় আছে ত ?



সব পথই যে সরলরেখায় চলবে এমন কথা নেই । কোনও কোনও পথ ঘুরে ঘুরে একই জায়গায় ফিরে আসে । বৃত্তাকার ত শুধু পৃথিবীই নয় , মহাবিশ্বে ছড়িয়ে থাকা সব গ্রহ তারারাই ত বৃত্তাকার । সম্ভবত একই জায়গায় ঘুরপাক খেতে খেতে ওরা গোল হয়ে যায় । ঠিক যেমন ময়দার গুলি হাতে পাকালে গোল হয় । তাহলে পৃথিবীর সব পথই বা গোল গোল ঘুরবে না কেন ?
   হাওড়া স্টেশনে এসে যখন ট্যাক্সি কূলির মাথায় মালপত্র চাপিয়ে আমাদের ভেতরে ঠেলে দিতো তখন ভয় পেতাম । কত অজস্র মানুষ ! কত কিসিমের লোকজন ! আমি হারিয়ে যাবো । কি হবে ? বাবা প্ল্যাটফর্মে বেঞ্চিতে বসিয়ে সামনে মালপত্র রেখেছে । কে নাকি চেনা লোক আসছে । একটু দেখা করবে । বাবা মাকে হঠাৎ দেখতে পাচ্ছিনা । প্রায় ভ্যাঁ করে কাঁদতে যাবো , এমন সময়ে পাশে বসা ভদ্রলোক বললেন , ওমা ! কি বোকা মেয়ে ত ? কাঁদছ কেন ? সত্যিই বোকারাই কি চিরকাল কাঁদে ? চালাক যারা তারা দূরে দাঁড়িয়ে কান্নাটা দেখে উপভোগ করে । নিশ্চয় করে । নয়ত এত এত করুণ বীভৎস রসের গল্প লেখাই হতোনা ! আমি চালাক হতে শিখিনি তখনও । বললাম আমার মা ? দিদি আর ভাই ছিল । বাবাও । ভদ্রলোক আমার কাঁপা গলার কথায় মিষ্টি হেসে বললেন , ওই ত তোমার মা দাঁড়িয়ে আছেন । ওই দেখো তোমার দিদি ওর চশমার মধ্যে দিয়ে হাঁ করে সবাইকে দেখছে । তোমার ভাই মায়ের কাছে চুপটি করে দাঁড়িয়ে । তোমাকে তোমার বাবা এই মালপত্র পাহারা দিতে বলেছেন । কেমন ত ? আমি অবাক । এই লোকটা জাদুকর । নিশ্চয় । কি করে জানলো এত কিছু ? বড় বড় চোখে দেখছি । বলা ত যায়না ! ম্যাজিক কার্পেটে করে হয়ত আমার চোখের সামনে দিয়েই উড়ে গেলো । কিন্তু লোকটা বসে থাকে । বলে , বাবা এখনই আসবে । চুপ করে বোসো।  আমি দেখতে পাই ,  ভীষণ ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে একটা লাল আর সোনালী রঙা ইঞ্জিন ঢুকতে থাকে । লোকটা বলে , চেয়ে দেখো , ঠিক যেন একটা রয়্যাল ঈগল । আমি আবিষ্ট হয়ে পড়ি । ধোঁয়ার মধ্যে থেকে ঈগল ডানা মেলবে হয়ত । আর তখনই প্ল্যাটফর্মে অতিরিক্ত তৎপরতা । ট্রেন ঢুকে গেছে । ট্রেন ঢুকে গেছে । বাবা কূলির মাথায় বোঝা তুলতে থাকে । মা দিদি আর ভাইকে নিয়ে আমার পাশে এসে বসে । আমি মায়ের শাড়ির আঁচলটা আঁকড়ে ধরি । মা হাসে । কি হলো ? মা আমাদের যদি ট্রেনে উঠতে দেরি হয়ে যায় ? ট্রেনটা যদি আরো দূরে চলে যায় ? মা আবার হাসে । ধ্যূত । হাওড়া স্টেশন থেকে আরো দূরে কি করে যাবে ? এখান থেকেই ট্রেন সব দূরে দূরে যায় । আবার ফিরে আসে । আমরা ঠিক উঠব ।
আমি ভাবি । হাওড়া তবে সেই গোল গোল ঘুরতে থাকা পথের যোগবিন্দু ? বাবা ডাকে । উঠে এসো ।
আমি যাবার সময় পাশে তাকাই । সেই লোকটা কোথায় গেলো ? যে জাদুকর আমায় চেনে ? মাকে বাবাকে জানে ? তার ম্যাজিক কার্পেট উড়িয়ে সে এই এত লোকের চোখের সামনে দিয়ে উড়ে গেলো ? আমি দেখতে পেলাম না ? আমার অভিমান হয় । তারপর ট্রেনে উঠে জানলার ধারে বসি । বাইরে চোখ মেলে আকাশে খুঁজি । ওই কি ম্যাজিক কার্পেট উড়ে যাচ্ছে ? নিশ্চয় ওটাই । আমার মুখে হাসি ভাসে । মা জিজ্ঞেস করে , হাসছিস কেন রে ? আমি বলি , জানো আমরা এখন রয়্যাল ঈগলে চেপেছি । একটু পরেই ও উড়বে ।

মা হেসে মাথার চুল ঘেঁটে দেয় । বলে , শুধু মাথামুন্ডু । আর রূপকথা পড়তে হবেনা । আমি মাকে চুপিচুপি বলি । না সত্যি ! আজ জাদুকর এসেছিল ! আমার পাশে বসে বলে গেছে ! মা অদ্ভুতভাবে হাসে ।


একটা সবজেটে শহর , যার অলিগলি জুড়ে বাগানে ঘেরা ছোটবড় বাড়িঘর , সেই সব ছেড়ে চলে এলাম পৃথিবীর কেন্দ্রে । ঠিক হাওড়ার মতোই যেখান থেকে সবখানে যাওয়া যায় , কিন্তু ফিরে আসতে হয় সেখানেই । আসার সময় কী ভীষণ দুঃখ ! স্কুলের দিদিমণিরা বললেন , আবার এসো কিন্তু । দেখা করে যেও । পাড়ার মাসি পিসি কাকা মামা দিদা দাদু জেঠিমা জেঠু , সকলে মুখে দুঃখ মেখে রেখেছে । কেন যে তোরা চলে যাচ্ছিস !

ট্রেনে উঠলেই একরকম ভালোলাগা ছড়িয়ে পড়ে । স্থবিরতা নেই । চলমান একটা সময় । দুধারে চলছে জীবন । জানলা দিয়ে সরে সরে যাচ্ছে পলকে পাল্টে যাওয়া ছবি । কে থামে ? কেউ থামে ? চলতেই হয় । চলার লাবডুব শব্দ রেলগাড়ির সঙ্গে তাল মেলায় । আমার দুঃখ প্রকাশ করা হয়না । দুঃখে বুকটা ফাঁকা ফাঁকা লাগে । কিন্তু তা ছবি হয়ে ওঠেনা । মন খারাপ । কিন্তু কেন , সেটা বুঝতে পারিনা । শুধু দেখি মুখোমুখি বসে বাবা আর মা । দুজনের মুখের ওপর দিয়ে সরে সরে যাচ্ছে দুঃখের কুয়াশা ।

নতুন শহর কিন্তু নতুন নয় । জন্মেছি এখানেই । রক্তের ধারা নিয়ে বেঁচেছি কটা বছর । তারপর হঠাৎ অন্য শহরে যাওয়া । আবার ফিরে আসা । সেই শহর আমাকে প্রথমেই টেনে নিলো । কী ভীষণ গতি তার ! ! কোনো ছবি চোখের সামনে ভাসতে না ভাসতেই উধাও । কিছু চোখ মেলে বেশিক্ষণ দেখতে পাবোনা । মিলিয়ে যাবে দৃশ্য ।
স্কুলে ভর্তি হতে কদিন অপেক্ষা করতে হবে । তার মাঝে পুরোনো সম্পর্ক , রক্তের সম্পর্ক একবার ঝালিয়ে নেওয়া । বলতো কে আমি ? মনে পড়ছে না ? জানি ত । বাবা আনেনা , সম্পর্ক রাখেনা যে । ছটফট করে সরে আসি ।
তারপর একদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই মনে হলো , নাঃ , বেরিয়ে পড়ি । ছোট্ট দু বছরের ভাইয়ের হাত ধরে তার দশ বছরের দিদি বেরিয়ে পড়ল পথে । মা হাঁফ ছাড়ল । ঘরের কাজ সেরে নেওয়া যাবে । হাঁটছি এক নতুন গলিতে । যার মাঝ দিয়ে ট্রেন নয় , ট্রেনের মতো , ট্রাম চলছে । দুপাশে অজস্র দোকানের পসরা । আর সিনেমা হল । গৌরী সিনেমা ছাড়া এর আগে দেখিনি এরকম । এই দেখলাম । কী ভিড় সব সিনেমা হলের সামনে ! হাঁটতে হাঁটতে অনেক এগিয়ে গেছি । দেখি পায়ের তলায় ফুটপাতে লেখা 'দর্পনা' । ফেরার পথ ধরলাম ।
বাড়ি ঢুকে দেখি মা ভীষণ চিন্তায় পড়েছে । এত গাড়িঘোড়া চারদিকে ।

আমি আবার ফুটপাতে খেলা দেখানো সেই জাদুকরকে ডাকতে থাকি । গিলি গিলি গে গিলি গিলি গে । ফিরে এসো ছবি । ওই যে দেড়শো খোকার কাণ্ড দেখেছিলাম না ? ইস্কুল থেকে নিয়ে গিয়েছিল কি ? মনে পড়েনা ।জাদুকর তার বিরাট জোব্বা থেকে নেড়ে নেড়ে সাতরং রুমাল বের করে আনে । সে যত নাড়ায় তত ছবি জেগে ওঠে । আমি আনন্দে ভাসতে থাকি । ওই ত দিলীপ নন্দী কাকু ঠাকুর বানাচ্ছে । ওই যে পাশের বাড়ির জেঠিমা হাসছে । সব স্থলপদ্ম তুলে নিলি ? ওই দিদির বন্ধু রীতাদি দিদির কাঁধ ধরে কাঁদছে । কেন চলে যাচ্ছিস রে ? আমার আনন্দ আমার দুঃখ মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে । ঠিক জাদুকরের সাতরং রূমালের মতো । নাড়তে নাড়তে যা কেবল সাদা হয়ে যায় । আমার মনে পড়ে । প্রিয়মুখ কি কেউ সাদা চাদরে ঢেকেছিল ?
আমাকে জাগিয়ে দিয়ে জাদুকর ডেকে ওঠে , মা । তুমি আর কত ঘুমোবে ? আমরা পৌঁছে গেছি ত !



  শরতের আকাশের মতো নির্মল আর কিইবা আছে ! তুলো তুলো মেঘের ময়ূরপঙ্খী উড়িয়ে আকাশ ডাক দেয় । আমি বিছানা ছেড়ে উঠে বসি । বিছানার পাশে রাখা চায়ের পেয়ালা । সেই গাঢ় বাদামী রঙের ননীর অমৃতবিন্দু দেওয়া চা । মা দার্জিলিং চা ছাড়া খেতে ভালোবাসেনা । আমি খুঁজে খুঁজে আনি । গ্রে স্ট্রীটের বীণা টি হাউস থেকে প্রথমে । তারপর স্কুলের পথে অরফ্যান টি থেকে । দোকানের মধ্যে জমাট অন্ধকার । বাইরে সর্পিল কিউ । অন্ধকারে ভেসে ভেসে আছে অগুণতি বিস্কুট রঙের পেটি । ওপাশের ভদ্রলোক আমার হাতের তেলোয় ঢেলে ঢেলে রাখছেন বিভিন্ন ধরণের চা পাতা । আমি গম্ভীর মুখে শুঁকে শুঁকে দেখছি । শেষে বলছি , ওই প্রথমে যেটা দিয়েছিলেন ওটাই । ভদ্রলোক প্রশ্রয়ের হাসি হাসছেন । হুঁ , তবে ? আমি ত প্রথমেই সেরাটা দিয়েছি । পেছনের লোকে বিরক্ত হচ্ছে । এই খুকি , হলো ? ভদ্রলোক ধীরে সুস্থে আমাকে চা পাতা দিচ্ছেন । ওমা ! সঙ্গে আবার ছোট্ট একটা প্যাকেট ! ও কাকু ! আমার কাছে আর পয়সা নেই ত ! ভদ্রলোক হাসছেন । একটু বিব্রত । ওটা নতুন এসেছে । এমনিই দিলাম । মা খেয়ে কি বলেন জানিও ত । আমি সংকোচে পা ফেলি । বেরিয়ে আসতে আসতে শুনতে পাই । আপনার কেউ হয় নাকি ? নাঃ , কেউ না । ওর মা চা ভালোবাসে বলে কেমন বেছে বেছে চা কেনে । কিচ্ছু জানেনা । তবু ।

স্টপেজ এসে গেছে । আমি নেমে যাই । ফুটপাত এখন নির্জন । এখনো স্কুল কলেজ অফিসের ভিড় নামেনি রাস্তায় । বেশ হাওয়া খেতে খেতে এসেছি । চওড়া ফুটপাত বেঁকে গিয়েছে ভেতরে । রাস্তার মুখে বাঁশের খাঁচা বানানো প্রায় শেষ । ঠাকুর আসবে কতক্ষণ । ঠাকুর যাবে বিসর্জন । আমি মনে মনে আওড়াতে থাকি । উৎসব আমার ভালো লাগেনা । মা এমনি দিনে ভালো থাকে । উৎসব এলে মুখ ভার ।

মোড় ঘুরতেই ডান দিকের ফুটপাতে চার নম্বর বাড়ির চারতলার বারান্দা থেকে গমগমে কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে । মামনি এসো এসো এসো । আমি কুঁকড়ে যেতে থাকি । লোকে দেখছে আমাকে ?
নীচের তলায় নাটকের মহড়া চলছে । আমি পাশ কাটিয়ে উঠে যাই । সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে আছে সেই জাদুকর । দীর্ঘদেহী ।  মুখে হাসি । চোখে অপার স্নেহ । সেই স্নেহ যেন গলে গলে নামছে । আমি ভেতরে ঢুকি । এইটুকু হেঁটে আসার পরিশ্রমেই ঘাম হচ্ছে । বড় বড় শ্বাস । জাদুকর এক গ্লাস জল আনে । একটা গামছা এগিয়ে দেয় । নাও , মুখটা মুছে ফেলো দেখি । জল খাও । পাখাটা চালিয়ে দিই ।
ধীরে ধীরে আমি শামুকের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসি ।
জাদুকর বলে , আচ্ছা , তোকে যে সকলে বলে তুই খুব খোলা মনের , তা ত নয় ! তুই মনটাকে খোল রে মামনি । আমি হাসি । কেমন ? তোমার হাসির মতো ? জাদুকর হা হা করে হেসে ওঠে । আমি দেখতে পাই । রাণুর প্রথম ভাগ বইগুলো ছিঁড়ে যাওয়া সত্ত্বেও ছোটকাকা রাগ করেনি । এমন হেসেছিল । মনে মনে বলি । ছোটকা, তুমি আমার ছোটকা হবে ? আমি ত মুখ ফুটে বলিনি ? তবে জাদুকর কি করে যেন বুঝে ফেলেছে । আমার মাথায় একটা বিরাট হাত । হাতের তেলো মাথা ঢেকে ফেলছে । জাদুকর বলছে , মামনি আমি তোর জেঠু । তোকে আমি উত্তরাধিকার দিয়ে যাবো ।

  আজ বড্ড গরম । রোদ্দুর বৈশাখের মতো প্রখর । থিমের পুজোর ধানখেত তৈরি হচ্ছে । ও পথে গাড়িঘোড়া বন্ধ । আমি চুপ করে চোখ বুঁজে বসে আছি । ভেতরে শুনতে চাইছি সেই হাসির শব্দ । সেই গমগমে স্বর । জাদুকর সত্যিই উত্তরাধিকার রেখে গেছে । রক্তে সেই টান টের পাই । এই টান ছাড়া আমার আর কোনও উৎসব নেই ।


১০

  একটা অমাবস্যার রাত্রে কংকালি তলা থেকে ফিরেছিলাম প্রান্তিকের বাসা ঘরে । ফিরতি পথে পৌষের কঠিন শীতে থেমেছিলাম প্রান্তিক স্টেশনে । সেদিন ওই স্টেশনকে সত্যিই মনে হয়েছিল শেষ প্রান্তস্টেশন ।  ধূধূ রুক্ষ প্রান্তরের খোয়াই ঢেউয়ের মধ্যে জেগে আছে একটা সাত হাত চওড়া আর বিশ হাত লম্বা প্ল্যাটফর্ম। মাঝে দুটো গাছ প্ল্যাটফর্ম ভেদ করে দাঁড়িয়ে আছে। সেখানেই বেদী । বসা যায়।  আমি একটু চায়ের খোঁজে গেছিলাম । একটা ছোট্ট উনুন জ্বালিয়ে চা বিক্রি করছিল যে লোকটা তাকে আমার অদ্ভুত মনে হয়েছিল । চা বিক্রির চেয়েও ওই হাড় কাঁপানো শীতে ওর বোধহয় আগুনের উত্তাপ বেশি প্রয়োজন হয়েছে। নয়ত একমেবাদ্বিতীয়ম একটিমাত্র ক্রেতার জন্য সে ওই শীতের অন্ধকার রাত্রে স্টেশনে উনুন জ্বালিয়ে বসে থাকবে কেন ? চা খেতে খেতে আমার অবিশ্বাসী মন তাকে জিজ্ঞেস করেছিল - হ্যাঁ গো? তোমার চায়ের বিক্কিরি কেমন ? সে কেমন একরকম হেসেছিল ! উল্টে আমায় প্রশ্ন করেছিল - এখানে নয়া ? অবাক আমি ! কি করে জানলে ? সে আবারো হেসেছিল । চা কেন গো? শুধু কি চা ? ওই উনুনের তাত কি একা আমার ? কেন পড় নাই ? একজন আগুন জ্বাললে পাঁচজনে পোহায় ! আমি ইদিকসিদিক চাই । পাঁচ কেন,  একজনকেও ত দেখিনে ।  সে তার ময়লা চাদরখানা পাক মেরে মেরে মাথা মুখ সব ঢেকে ফ্যালে । বলে - বসো দিকি। কংকালি হয়ে এলে আর রামীকে দেখতে পেলেনা? ওই যে গগনজোড়া তারার চাদর সে ত সেই মেলেছে ! ওকে রোজ ধুতে হয় কিনা । সে আসবে আঁচ পোহাতে । সঙ্গে আসবে তার বাউল। সে ভারী দুঃখী কিনা । তাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে আনতে হয় । সে তার ভ্রমরকালো চুলে আঙুল দিতে দিতে উদাস গায় - সই কেমনে ধরিব হিয়া ।

আমি একমনে শুনতে থাকি । আর সত্যি সত্যি বিশালাক্ষীর ছেলে উদ্দাম ছুটে আসে । আমি তার নতুন পদের অনুভবে কাঁপতে থাকি । কে যেন আমায় চাদরে জড়িয়ে ধরে । বলে শীত করছে ? আমি প্ল্যাটফর্ম থেকে রেললাইন দেখি । একজোড়া রেখা । কেউ কারো সঙ্গে মেলেনা । অথচ পাশাপাশি চিরকাল। সে চাদরে ঢাকতে ঢাকতে গেয়ে ওঠে সুখের লাগিয়া এ ঘর বান্ধিনু অনলে পুরিয়া গেলো ।

চায়ের ভাঁড় এগিয়ে দিতে দিতে চা ওলা ডাকে,  ও বোস্টুমী এ নাও চা । ফিরে দেখি এক বাউলানি । তবে কি চা ওলা তার চণ্ডীদাস ?  অনলে পুড়িয়ে রাখে হৃদয়বাসনা?

১১
 একটা প্ল্যাটফর্মের মাঝে লাল ইঁটের শক্ত দেওয়াল । তাতে ঠেস দিয়ে বসে আছে বুড়ো ভিখারিণি। তার শতচ্ছিন্ন ময়লা কাঁথার ওপরে রোদ্দুর পড়ে গৌরব দিচ্ছে। ওপাশের দেওয়ালে টুকরি নিয়ে বসেছে ফলওয়ালা। তার ফলের ঝুড়ি থেকে কমলালেবু দিয়েছে ভিখারিণিকে। সে পরম আদরে লেবুর কোয়া খুলছে । সামনে ঝুড়িতে নিজের জিনিসপত্র নিয়ে অনাথ ছেলেটা দাঁড়িয়ে। ওর মোটা চশমার ভাঙা কাঁচে রামধনু রং । ও ওই দেওয়াল ভেদ করে যেতে চায় পৌনে দশ নম্বর প্ল্যাটফর্মে। নাঃ, জাদুকর বলেছে কেউ দেখতে পাবেনা। ওই আপাত অদৃশ্য প্ল্যাটফর্মে থাকবে সাদা ধোঁয়া তোলা একটা লাল রঙের রেলগাড়ি। তাতে চেপে বসলেই জাদুকরের বাড়ি। কাল রাতে স্বপ্নে যে দৈত্যের মতো লোকটা তাকে বলে দিয়েছিল সূলূক, সেই নাকি আসবে তাকে নিয়ে যেতে। ছেলেটা জানে সত্যিই ওই দেওয়ালের মধ্যে আসলে একটা অন্য পৃথিবী আছে । সেই যাদু পৃথিবীতে তার মরে যাওয়া বাবা মা এখনো বেঁচে। তার অপেক্ষায়।  তাকে তাই যেতেই হবে। এখানে এতদিন ধরে ও যাদের বাড়ি বাসন ধুতো, কাপড় কাচতো, তারা জানেই না যে ও আসলে একটা গরীব অনাথ দুর্ভাগা ছেলে নয়। জানলে ওরা কক্ষনো এভাবে ওকে দুঃখ দিতোনা।
ছেলেটা পায়ে পায়ে এগিয়ে আসে। বুড়ি ভিখিরি তার দিকে সন্দেহের চোখে দ্যাখে। কমলালেবু খেতে চায় নাকি এটা? আরেকটা ভিখিরি বাড়ল? বিপদ বড়! তাড়াতে হবে এটাকে। এমন সময় ফলওয়ালা ছেলেটার দিকে ফিরে তাকায়। প্রশ্রয়ের হাসি হাসে। বলে – যা রে ছেলে। দেওয়ালের ওপারে আছে অন্য পৃথিবী। তোর রেলগাড়ি অপেক্ষায় আছে । শিগগির যা। ছেলেটা ঝুড়ি নিয়ে সটান দেওয়ালে ধাক্কা দেয়। বুড়িটা অবাক চোখে দ্যাখে বাচ্চাটা গায়েব!
ওপারে তখন রেলগাড়ির কামরায় একটা সুন্দর ছেলে। তার বাবা মার কাছে চলেছে। এ পৃথিবীর সব ক্লেদ ঝেড়ে ফেলে সে চলেছে অন্য রেলগাড়ি চেপে অন্য স্টেশনে।
ফলওয়ালার দিকে তাকিয়ে বুড়ি সন্দিগ্ধ স্বরে জিজ্ঞেস করে – ছেলেটাকে কোথায় পাঠালে? ফলওয়ালা গূঢ় হাসে। বলে,  সে খবরে তোমার দরকার কি? তুমি ত নিশ্চিন্ত। এখানে নতুন ভিখিরি আসেনি।
 রেলগাড়ি তখন বনের মধ্যে পাতা রেললাইন ধরে ছুটে চলেছে। নীচে তার নীল নদী ফেনা তুলে ছুটছে। বনের গায়ে পাহাড়জোড়া নানা রঙের ফুলের গালচে। কত কত সুস্বাদু খাবারের প্যাকেটে তার বার্থ ভরে গেছে! এত খাবার সে কক্ষনো খায়নি। মাঝে মাঝে তার মনে হচ্ছে, এসব সত্যি নয়,  স্বপ্ন। এক্ষুনি ভেঙে যাবে। চোখ জলে ভরে উঠছে। আর তক্ষুণি সে চোখ বন্ধ করে ফেলছে। আহা স্বপ্ন! স্বপ্ন তুমি বেঁচে থাকো। নইলে আমি কি নিয়ে বাঁচি !

১২
একবার মরুভূমির কাছে গিয়েছিলাম । যত কাছে যাই তত বালুকণা উড়ে উড়ে চোখ মুখ ট্রেনের বার্থ সব ভরিয়ে দেয় । ভোরের নরম হাওয়া তখনও সূর্যের রক্তচক্ষুকে আড়াল করে আছে । তাই বুঝতে পারিনি মরুভূমি আসলে ঠিক কতটা নিষ্ঠুর কতটা প্রাণহীন । খুব দ্রুত কাঁচের জানালাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হলো । তবুও চেষ্টা করে দেখতে চাইলাম । কিচ্ছু নেই কোত্থাও । উঁচুনিচু ঢিবি ঢিবি জমির মাঝে মাঝে নাতিউচ্চ ছোট ছোট ঝোপ । অন্ধকারে বুঝিনি , কাঁটাঝোপই হবে নিশ্চয় । মন হাহাকার করছিল । চিরকাল প্রকৃতির বিচিত্র বর্ণ বিচিত্র ঢং আমাকে ভুলিয়ে রাখে । এ পৃথিবীতে যে দুঃখ আছে, সুখও আছে, হাসিকান্নার নির্দিষ্ট সময় আছে , প্রকৃতির মধ্যে সেসব ভুলিয়ে দেবার সমূহ আয়োজন আছে । কিন্তু একী ! এত নিষ্প্রাণ ! শুধু তাই নয়, কি ভীষণ বেআব্রু! কোথাও কোনো আড়াল নেই ! চারিদিক ধূধূ ! হঠাৎ যেন সমস্ত মন একেবারে বিকল করে দিলো । মা হাতে টান দিলো । নেমে চল । সকলে নেমে গেছে ।
সেদিন সকাল হতেই দেখি চারিদিকে একটাই রং । আগুনের মতো সাদা । কি মাটি কি আকাশ সর্বত্র ওই এক রং । আকুলিবিকুলি করে উঠলো মন । ফিরে যাই বরং । আমার চলে যাওয়াই ভালো । কিন্তু কি একটা সুর নয় ? চোখ বন্ধ করলে আমি শুনতে পাই ভালো । বন্ধ করলাম । শুনি কে যেন এদেশীয় বীণ বাজাচ্ছে । ভালো করে শুনতে থাকি । শুনতে শুনতে মনের মধ্যে একটা ছোট্ট নদী বইতে থাকে । বেশ শীতল লাগে । ক্রমশঃ সুর নিকটে আসে । চোখ খুলে ফেলি । দেখি ওমা ! কে যেন দুটো কাঠের খুঁটি পুঁতেছে। মাঝে একটা দড়ি । সেই দড়ির ওপরে সূর্য্যের সাতরং ঘাগড়া পড়ে একটা ছোট্ট মেয়ে দুদিকে হাত ছড়িয়ে হাঁটছে । বীণ বাজাচ্ছে এক পাকাচুলো বুড়ো । আমি অবাক ! এই নেইরঙের রাজ্যে ও এত রং পেলো কোথা থেকে ? এগিয়ে গেলাম । মেয়ে তখন নেমে এসেছে । আমার দিকে চেয়ে হাসতেই বললাম , দড়ির ওপর হাঁটতে ভয় করেনা ? সে মাথা দুদিকে নাড়লো । না । করেনা । সারা জীবন হাঁটতে পারি । বিষাদ গ্রাস করছে । দড়ির ওপর হাঁটতে হাঁটতে কখনো ত নেমে দাঁড়াতেও ইচ্ছে করে ।
মা আবার ডাকে । ওরে ঘরে ঢুকে আয় । মরুভূমির দুপুর ভয়ংকর । গা পুড়ে যাবে । আমি তখন পুরোহিতের সঙ্গে মন্ত্র বলছি । তিনি বলছেন – কল্পনা করুন । আপনার মা তপ্ত বালুর ওপরে হাঁটছেন । আপনি তাঁকে পাদুকা দিন । মাথার উপরে সূর্য । আপনি ছত্র দান করুন । ছায়া দিন । আমি হাতজোড় করি । মনে মনে বলি , মা ছাতাটা সরিও না । স্বস্তি দাও । এখানে বড্ড রুক্ষ জীবন ।
১৩
আমার কাছে কোথাও যাওয়া মানেই ফিরে আসা । সেই ছোট্ট থেকে আমি জানি , যে যেখানেই যাক না কেন ঠিক ফিরে আসে । গভীর রাত্রে যখন নিঝুম ঘুমে ডুবে আছি , সেই ছোট্ট আমিও একটি মাত্র টোকার আওয়াজে জেগে উঠতুম । জানলার খড়খড়িতে টোকা যতই মৃদু হোক তার অসীম ক্ষমতা । মা নিঃশব্দে উঠে যেতো দরজা খুলতে । ঘুমের মধ্যেই টের পেতাম বাবা একটা বড় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে পাশ ফিরে শুলো । মা যে কেমন করে অত অন্ধকারে একটিও শব্দ না করে উঠে যেতে পারতো তা কে জানে ! আবার নিঃশব্দে পাশে এসে শুতো। আমি কাঠ হয়ে শুয়ে থাকতাম । ভোরের দিকে বাবা উঠে বাথরুমে যেতো । একবার আলগোছে কার যেন গায়ের চাদর ঠিক করে দিতো। কপাল থেকে অদৃশ্য চুল সরিয়ে দিতো । আমি ভাবতাম কখন সকাল হবে ।
সকালবেলায় যার জন্য রাতের অর্ধেকটা জেগে জেগে শুয়ে থেকেছি সেই ছোটকা তখন রান্নাঘরের সামনে পিঁড়ে পেতে রাজ্যের গল্প জুড়েছে । মার মুখ থমথমে । হাসিতে যোগ দিচ্ছেনা । গম্ভীর বাবা কথা খুঁজে পাচ্ছেনা । অগত্যা আমাদের ভাইবোনেদের নিয়েই ছোটকা ব্যাস্ত হয়ে পড়ল । আমরা তখন সহজ পাঠের দেশে । ওর চেয়ে বেশি কিছুই বুঝিনা ।
সন্ধ্যের আগেই ছোটকা তৈরি । এবার অনেকদিনের জন্য যাওয়া । দিল্লি যাবো । কবে আসব আর বলতে পারিনা । এবার বাবা মুখ খুলল – থানায় যেতে হবে একবার । আমি যাবো সঙ্গে । দারোগা বাবু আমাদের নাটকের দলের লোক। আমি বলেছি , আমার ভাই দারুণ ব্রিলিয়ান্ট । সে এসবের মধ্যে নেই । শুধু একবার দেখা করে যেতে হবে । ছোটকার মুখে অদ্ভুত হাসি । চোখটা অকারণ মুছে নিয়ে বলল – আচ্ছা সে হবে । খাওয়া দাওয়া সেরে দেখা করে আসব খন। বাবা অবাক । তুই যে বললি সন্ধ্যের গাড়ি ? ছোটকা হাসল । কাল গাড়ি । আজ নয় । আজ অমলের বাড়ি থাকবার কথা ছিল । কিন্তু তুমি যখন এত ভয় পাচ্ছ তখন নয় থেকেই যাই । বাবা নিশ্চিন্ত নিঃশ্বাস ফেলল । তবে কাল সকালে দেখা করব ।
সেদিন সন্ধ্যেয় ছোটকা মেতে উঠলো আমাদের নিয়ে । ঘোড়া হলো ব্রহ্মদত্যি হলো বেতাল হলো অরণ্যদেব হলো । সাধ মিটিয়ে খেলে নিলাম । রাতে শুয়ে শুয়ে মা বাবার মৃদু কথা শুনতে শুনতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি । হঠাৎ দরজায় ঝনঝন শব্দ । এত রাতে ? ঘরের জোরালো আলো জ্বলে উঠলো । বাবা কে কে বলতে বলতে উঠোন পেরিয়ে সদর দরজা খুলতে গেলো । খোলা দরজা দিয়ে বাবাকে ঠেলে দিয়ে ঢুকে এলো গোটাকতক জোরালো টর্চ । বাবা হতবাক হয়ে দেখছে উর্দিপরা দারোগা ও তার লোকজন তছনছ করছে ঘরদোর । - কি হলো ? ভাইটি কই ? দেশের ভালো করবে আপনার সেই ভাইটি ? বাবার চোয়াল ঝুলে পরছে । মা আমাদের দুহাতে জড়িয়ে বসে । ছোটকা কোথাও নেই ।
সবাই চলে গেলে মাকে জিজ্ঞেস করল বাবা – হতভাগা কোথায় গেলো ? মা ঠোঁটে আঙুল দিলো । দূরে একটা মেল ট্রেনের হুইসল বাজলো জোরে । ট্রেনটার চাকার আওয়াজ আর হুইসল আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেলো ।
সেদিনের পর ছোটকার কথা কেউ জোরে জোরে বলতো না । চুপিচুপি আলোচনা হতো । তবু্ সকলের বিশ্বাস ছিলো, ট্রেনটা আবার ফিরিয়ে আনবে সেদিন রাতের সেই যাত্রীকে । সেই অনিকেত মানুষটা কিন্তু অসম্পূর্ণ রেখেছিল তার যাত্রা । আর কখনো ফিরে আসেনি ।
সেইদিন থেকে বুঝেছিলাম সব যাত্রা ফিরতি পথে এসে শেষ হয়না । যতই বলি মৃত্যুর পর অসংখ্য জন্ম আছে , কিন্তু সেকথা সত্যি করে দেবার জন্য এখনো কেউ ফিরে আসেনি ।
১৪
মেলা বদলে যায় । ছোটবেলায় মেলাতে নাগরদোলায় উঠবো, পুতুল কিনবো, আর রেশমী চুড়ি নেবো, যা পরদিনই ভেঙে ছড়িয়ে যাবে । এত ক্ষণস্থায়ী তার জীবন, তবু কি আকর্ষণ। অনেক সময় দিদি আঠা দিয়ে জুড়ে জুড়ে নকশা বানাতো সেইসব টুকরো চুড়ির কাঁচ দিয়ে । কিন্তু তাতে ত গোটা চুড়ি আর ফিরে আসেনা। সাময়িক দুঃখ হতো ঠিক। পরে বুঝলাম, মেলাও ত অমনি ভেঙে ভেঙে যায় । তার রঙীন সামিয়ানা, তার কাঠের ঘোড়া, পাথরের বাসন, পুতুল, বেলোয়ারি রকমারি নিয়ে টুকরো হয়ে যায় । অন্য কোথাও গিয়ে জোড়া লাগালেও পুরোনো মেলাটা ফেরেনা । মাসি বলতো, এই যে কল্পতরু মেলা, পয়লা থেকে দশই জানুয়ারি, দুর্গাপুর মাতিয়ে রেখেছে, এটা আসলে শান্তিনিকেতন থেকে এসেছে । পোষের মেলাটা। আবার এখান থেকে যাবে অজয়ের ধারে কেঁদুলি। যেহেতু একই মেলা ভেঙে ভেঙে অন্য জায়গায় যায় , তাই আমি ভাবতুম মেলাটা আছেই। নিত্যকার মেলা।
আমার শ্বশুরবাড়ির সামনে বসে ঝুলন মেলা। গঙ্গার তীর বরাবর। গেট খুলে বেরোলেই একটা লোহার বাসনপত্র ও নিত্যব্যবহারের জিনিসের দোকান বসে। প্রথম দেখেছিলাম এক বুড়ো। সঙ্গে আসত তার পুরো পরিবার। বৌ আর দুই ছেলে। দোকানটা একটু উঁচু কাপড় দিয়ে ঢাকা। লম্বা করে পাতা তক্তা দিয়ে তার ওপরে বসে বসে জিনিস সাজাতো সে সারাদিন। কাপড়ের দেওয়াল জুড়ে, ট্রিপলের ছাদ থেকে নেমে আসতো তার পসরা। আমি অবাক হয়ে ভাবতাম, এরা থাকে কোথায় ? খায় কি ? হদিস পেতাম না । তারপর একবার মেলা এলো। দেখি বুড়োর ছেলের বৌ হয়েছে। কচি কলাগাছের মতো। আমাদের দুর্গা দালানের কলা বৌ যেন। কিন্তু সে কথা কয়না। দেহাতী। সব্বাইকে লজ্জা। আমি যত বন্ধুত্ব করতে চাইতুম সে তত লুকিয়ে পরত। দিন যায়। বুড়ো আসেনি সেবার। তার বিধবা বৌ দোকান সামাল দেয়। ছেলে আসেনা। সে গিয়েছে ভিন দেশে কাজের খোঁজে। আমি গিয়ে দাঁড়াতে বুড়ি বলল – এখনকার ছেলেপুলে বাপের ব্যাবসা ভালোবাসেনা। কে জানে কোথায় কোথায় ঘোরে ! আমি বললুম – সে ত তোমরাও ঘুরে ঘুরে পসরা সাজাও। বুড়ির গালে হাত। কি যে বলো ! আমাদের ত চেনা মেলা ! চেনা মাঠ ! অচেনা অজানা কোথাও যাইনা ত ? ভাবি তাই ত ! কথা বলতে বলতে বুড়ির পাটাতনে উঠে বসেছি । উঁকি মেরে দেখি, তক্তার নীচে, কাপড় ঘেরা জায়গাটুকুতে কেমন সুন্দর গেরস্থালি । বুড়ির বৌ আর নাতি নাতনি সেখানে রাঁধাবাড়ার আয়োজন করছে। আমার পুতুলখেলা রান্নাবাটি খেলা মনে পড়ে গেলো। কী মজা ! জীবন কী বর্ণময় ! আজ এখানে ত কাল সেখানে । আজ এখানে গেরস্থালি ত কাল অন্য কোথাও । আমাকে অবাক হয়ে সব দেখতে দেখে বুড়ি হাসলো । ছেলের বৌকে বলল, দিদিকে একটু লেবুর আচার দে না । আচার কখন বানাও ? বুড়ি হাসে । ও হয়।
এবারের মেলায় বুড়ি নেই । বুড়ির বৌ বিধবা । ওর বর কাজ করতে গিয়ে দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছে । ও এসেছে ওর বারো চোদ্দোর ছেলেমেয়েকে নিয়ে। আমার প্রশ্নের উত্তরে বলল – কত বারণ করেছি ! শুনলে ত ! ভাগ্যিস শ্বশুরের দোকানটা ছিল ! আমার বিস্ময়ের অবধি নেই। এই দোকান, এই মেলা, এ কি স্থায়ী কিছু ? সেই লাজুক বৌটার মুখে এখন অনেক কথা । সে বলে ওঠে, সবই ত ভেঙে যাবে দিদি। মেলা ভাঙবে, আমাদেরও ত ভাঙবার দিন আসবে ।
আমি নিঃশব্দে ভেতরে আসি। নিজের অস্তিত্বের স্থায়িত্ব নিয়ে বেশ একটা নিরাপত্তা, একটা গর্ব কাজ করত। ওই বৌটা একটা কথায় সেটা ভেঙে দিলো। আমি দেখতে পেলাম ভাঙা পুতুল । ভাঙা রেশমী চুড়ির মতো ভেঙে যাচ্ছে টুকরো টুকরো জীবন । আঠা দিয়ে জুড়ব সে সাধ্যি নেই ।


১৫

রওনা হতেই হবে । ওসব কারো ইচ্ছেতে হয়না । হঠাৎ একদিন দুটো চকচকে ইস্পাতরেখার ওপরে এক অদৃশ্য হাত দাঁড় করিয়ে দেয় । আর তারপর চলা শুরু । থামার সিগন্যাল এলে আপনিই ব্রেক কষবে ।
যাত্রাই একমাত্র ধ্রুব । বাকি সব আপেক্ষিক । এসব দ্বেষ প্রেম ক্ষতি ধ্বংস সহানুভূতি সীমাসংঘাত জমি সম্পদ সব সঅব আসলে আপেক্ষিক । আপেক্ষিক কথাটার সাদা মানে - মিথ্যে । যেমন পৃথিবীর অবিচ্ছিন্ন যাত্রা সত্ত্বেও ভেবে নিচ্ছি যে সে স্থির । আপেক্ষিক । মিথ্যে ।

এরকম করে ভাবতে ভাবতে মাথায় অনেক কুয়াশা জন্মায় । তাহলে চলতে চলতে ফুরিয়ে যেতেই আসা ? নক্ষত্রেরও একদিন নিভে যেতে হয় ?

হয় । নিভে যাওয়া নক্ষত্র তখন স্থির । তার যাত্রাপথ তখন বহুদিনের পুরোনো পোড়ো স্টেশনের মতো বাতিল । আর তার কেন্দ্রে তখন জমা হয়েছে অসীম স্থৈর্য । ধ্যানী ঋষির মতো । সেই স্থিরতা তার চারপাশের অবিরাম গতিশীল অস্তিত্বগুলোকে টেনে আনতে থাকছে । ক্রমে তারা তার পরিধি ছাড়িয়ে কেন্দ্রে ঢুকে পড়ছে । আর তাহলেই তাদের অস্তিত্ব মিশে যাচ্ছে নিভে যাওয়া নক্ষত্রের মাঝে ।
এরকম করে বাইরে ঘুরতে থাকা সক্কলে তখন শোক করতে শুরু করে । আহা গো ! বড় ভালো ছিলেন মানুষটা । চলে গেলেন ! তারা জানতেও পারছেনা যে ওই নক্ষত্রের তখন চলার তাড়া নেই । সে শুধু ভিতরপানে পাড়ি দিয়ে চুপটি করে বসে । তার সব ইন্দ্রিয় এখন কাজ শেষ করেছে । কিন্তু সে নিভে গিয়েও ফুরিয়ে যায়নি ।

মাঝে মাঝে কৃষ্ণ গহ্বর জানিয়ে যায় সে আছে । এই যে আমি , চরৈবেতি করছি প্রতিনিয়ত, এই আমার হাত পা একদিন কচ্ছপের মতো ভিতরে সাঁধ করবে । আমার প্রাণবায়ু মিশিয়ে যাবে । দেহ বিলীন হবে । কিন্তু চেতনা ? সে সেই কৃষ্ণগহ্বর । যা প্রতিনিয়ত আমাকেই গিলছে একটু একটু করে । আর তারপর আমি নিভে গেলেও সে তার ইন্দ্রিয়াতীত অস্তিত্ব নিয়ে অনন্ত কাল ধরে ধ্যানে বসে থাকবে । মাঝে মাঝে তার কাছাকাছি যদি কেউ আসে তবে সে প্রবল বেগে তাকে তার কেন্দ্রে টেনে নেবে ।

গতকাল স্বপ্নে ওরকম এক তারাকে দেখলাম । সে আমাকে স্বপ্নেও দেখা দিলোনা । কিন্তু চোখের দেখার বাইরেও আমি তার অস্তিত্ব টের পেলাম । হঠাৎ দেখলাম একটা আগুনের শিখার মতো উজ্জ্বল মুখ ! এ তো আমার সেই দেড় বছরের ছোট ভাই ! সেই যে চলে গেলো একদিন ! শোক স্বপ্নেও ধাক্কা দেয় । আর সেই শোকের মধ্যেও অনুভব করলাম ওই কালো মরে যাওয়া তারাটা আমাকে আকর্ষণ করছে ।
যাত্রা শেষ হলে আমিও তো ওখানেই যাবো ! ওখান থেকেই যে শুরু হয়েছিল চলা ! তারপর অনন্তকাল মিশে থাকব তারার কোলে ।


১৬

আমাদের ছোটবেলার সেই বাড়িটার সামনে ছিল ধুধু মাঠ । ওই বয়সে মাটির ওপর দাঁড়িয়ে যখন চারপাশ দেখতাম তখন সব কিছুকে খুব উঁচু খুব বড় লাগত । ঘরগুলো বিরাট । উঠোনটা কত্ত বড় ! আর মাঠটা যেন তেপান্তরের মাঠ। যার একদিকে পাঁচিলের পাশ দিয়ে চলে গেছে বড় রাস্তা আর অন্যদিকে ফলসার বিলের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে স্টেশন । কখনও ঘুমন্ত মাঝরাতে হুইসেল দিতে দিতে বেড়িয়ে যেত মেল ট্রেন । আর সেই শব্দে ঘুমের মধ্যে এক অদ্ভুত অনুরণন । যেন সেই ট্রেনের কোটরে আমরা মায়ের সঙ্গে চলেছি । মা কত বার বাবাকে বলছে - শুনছ, ভেতরে ঢুকে এসো । কিন্তু বাবা নির্বিকার সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ছে ট্রেনের দরজায় দাঁড়িয়ে । একহাতে শুধু হাতলটা ধরা । আমি যেন সেই উন্মুক্ত চলমান ছবি দেখবো বলে গুটিগুটি মায়ের হাত ছাড়িয়ে বাবার পাশে এসে দাঁড়িয়েছি । আর বাবা আমাকে দেখতে পেয়ে চমকে উঠে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে । চোখ গোল করে বলেছে এত অবাধ্য কেন তুমি ? পড়ে গেলে কি হত ? আমি বাবাকে বলতে পারিনা - তুমিও তো মায়ের কথা শুনছনা । পড়ে গেলে কি হত বলতো ? বরং ঘুমের মধ্যে মায়ের পিঠের মধ্যে মুখ গুঁজে দিই । মা বুঝতে পারে ট্রেনের শব্দে আমার স্বপ্নচৈতন্য জাগছে । আমি মনে মনে মামার বাড়ি চলে যাচ্ছি । ওইতো কত রাত্রি ! কাঁচের জানলা দিয়ে দেখতে পাচ্ছি সরে সরে যাচ্ছে অন্ধকার । কখনও বা একটি দুটি হলুদ আলো । ফাঁকা ফক্কা লেভেল ক্রসিং । ঝাঁকড়া মাথা আরো অন্ধকার গাছেরা । এসবের মধ্যে সমানে সঙ্গে চলেছে চাঁদ । সে যেন ট্রেনে না উঠেও আমার যাত্রাসঙ্গী । ওই যে চাঁদের মধ্যে একটুকরো কালচে ছোঁয়া । ওইতো চাঁদের বুড়ি চরকা কাটছে । আমাকে যখন মা বলে ওই যেদিন তুই জন্মালি সেদিন পৌষের কি শীত ! বাপরে ! কিন্তু তুই হলি দুপুর একটা । কষ্ট হলোনা আমার । আমি ভাবি আমি হলাম ? আমি জন্মালাম ? তাহলে আমি চিরটি কাল এমন করে মায়ের গায়ের মধ্যে নাক মুখ গুঁজে ঘুমই না ? এই সেদিন এসবের শুরু ? ভয়ংকর দুঃখ হয় । ছোট্ট বুকটা মনে হয় ফেটে যাবে । মাকে আমি মাত্র সেদিন পেয়েছি ভেবে নিজের অসহায় অবস্থার কথা জেনে কেঁদে উঠি । আর ঠিক তখনই দাদি এসে জিজ্ঞেস করে কি হলো রে ? কাঁদতে কাঁদতে বলি - আমাকে কোথা থেকে পেলে ? দাদি চাঁদের দিকে আঙুল দিয়ে দেখায় । ওই দ্যাখ চাঁদের বুড়ি চরকা কাটছে । তোর মা আর আমি এইখানে খাটিয়ার ওপর বসে ছিলাম । বুড়ি তখন তোকে ছুঁড়ে দিলো । তুই এসে তোর মায়ের কোলে পড়লি । ঠিক যেমন তোর মা আমার কোলে এসে পড়েছিল একদিন । আমি আনন্দে ভুলে যাই যে মা বলেছিল তুই হলি দুপুর একটায় ।

ট্রেনের স্বপ্ন শেষ না হতেই একদিন মা আমাকে ঠেলে তুলল । উঠে পড়ে মায়ের সঙ্গে বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম । মা বারান্দার পূব কোণে এনে আমাকে হাত দিয়ে দেখালো । একেবারে শেষ বাড়িটার পাঁচিলের গায়ের শিউলি গাছটা ফুল দিয়েছে । ভোর রাত্রে সেই ঝরে পড়া সাদা শিউলির বিছানা মাঠের ওপর এক অদ্ভুত সুররিয়ালিস্টিক ছবি তৈরি করেছে । আমি হাঁ করে দেখছি । মা বলল গুগুল যা তো ওই শিউলি কটা কুড়িয়ে নিয়ে আয় । শ্বেত পাথরের টেবিলটার ওপর সাজিয়ে দেবো ।

 

সেইদিন প্রথম স্বপ্নের ট্রেন আমাকে তারা ফোটা শিউলির সামনে নামিয়ে দিলো ।




১৭

দিনের আলোর একটা অদ্ভুত দম্ভ থাকে । সে যেন চারিদিকের দৃশ্যমান জগৎকে সমস্ত গোপন কোণ থেকে তীক্ষ্ণ আলো দিয়ে প্রকাশ করে দিচ্ছে । কোথাও কোনো গোপনীয়তা নেই । রহস্যময়তা নেই । সব অকপট । ভালোবাসা ভালো থাকা স্নেহছায়া থেকে শুরু করে বিদ্বেষ লোভ মোহ সব যেন প্রকাশ্য দিনের আলোয় রাজপথে পরস্পরের সঙ্গে কুশল বিনিময় করে । এই হয়তো ভালোবেসে আজন্ম প্রতিবেশীকে বলছি , এই পৃথিবী তোমার আমার সকলের । আবার পিছন ফিরে লোভের এবং লাভের অংশীদারকে বলছি, ভাগাভাগি চলে কি করে ? এ দেশ শুধু তোমার আমার ।
 দিনের আলোর এই সীমাহীন দম্ভ কিন্তু মিথ্যে । সে দেখাতে পারে না মনের গহনে লুকিয়ে থাকা যাযাবর জীবনের মোহ । রাত নামলে আলো ফুরোয় । মনের মধ্যে নরম হলুদ প্রদীপের মতো আলো জ্বলে ওঠে । আর অদ্ভুত ! তখনই সেই আলোয় আমরা পরস্পরের মুখ দেখতে পাই । দেখি এক জীবন জুড়ে আমরা মুখোমুখি বসে আছি । আমাদের পায়ের তলায় কোনো শক্ত মাটি নেই । আমাদের মাথার ওপরে একমাত্র চিরন্তন আশ্রয় আকাশ । তাঁবুর মতই অট্টালিকাও গতিশীল । গুটিয়ে নিয়ে সময় পথ চলতে শুরু করে । কেউ কোনোদিন মাটি খুঁড়ে তুলে আনে জানলার কাঠ । আমরা রেলগাড়ির কামরায় মুখোমুখি বসে ভাবি , তাই তো ! তাঁবু তবে কবেই ছিঁড়ে গেছে ! তবু কি শেষ হয় ? আবার নতুন নদীর পাড় খুঁজি । খুঁজি নতুন পর্বতের সানুদেশ । একা একা সংসার পাতি । এভাবেই নতুন নতুন গন্তব্যে পৌঁছে যাই ।
এই যাত্রা তবু ফুরোয় না । পৃথিবীর আহ্নিক গতির সঙ্গে সঙ্গে ঘূর্ণায়মান জগৎ আমার পায়ের তলার মাটিকে স্থির থাকতে দেয়না । আমি রাতের রেলগাড়ির কামরায় বসে জানালায় চোখ রাখি । সরে সরে যাওয়া ভুবন জানিয়ে দেয় সময় মতো স্টেশনে নেমে যেতে হবে । শেষ স্টেশন এলেই নামতে হবে ।
আপাতত প্রতি রাতের এই প্রাণের খেলার পরে দিনের নতুন স্টেশনের অপেক্ষায় থাকি । অনেক মানুষের ওঠানামার ভিড়ে ক্ষণিকের থেমে থাকা রেলগাড়িকেই নিত্য সত্য ভেবে আরও একবার ভ্রান্তিবিলাসী হই ।

তারপর ...সব রঙ শেষ হলে ...সব লোভ নিভে গেলে , আমি চিরকালীন রাতের যাত্রি হবো । রেলগাড়ি যেখানেই নিয়ে যাক , চাঁদের আলোয় ভেসে যাবো অনন্ত আশ্রয়ে ।



১৮


রাতে গভীর ঘুমে কখনো দূরাগত রেলগাড়ির শব্দ কানে আসে । কানে ?  নাকি চেতনসীমায় তা বাজে না । বাজে ভেতরে কোথাও । বুঝতে পারি না । ঘুম ভাঙে না । শুধু রাতের নিজস্ব আলোয় এগিয়ে আসে রেলগাড়ির কামরা । ভেতরে বসে থাকে কত অচেনা মানুষজন !
এক শিশু তার আধফোটা বুলি দিয়ে ক্রমাগত আমাকে ডাকে । আমি বিস্মিত চোখ মেলে দেখি । কে এ ? আমাকে এমন আপন করে ডাকে কেন ? ও চেনে আমায় ? আমি কেন চিনি না ? বুকে ভীষণ কষ্ট হয় । কিন্তু বোবা কথা মুখ ফুটে বেরোয় না । আমি তাকে দুহাত বাড়িয়ে ধরতে যাই । সে দুষ্টু হেসে অন্য দিকে দৌড় দেয় । আমি জানলা দিয়ে বাইরে তাকাই ।
রাতের অন্ধকারে পৃথিবীর ছবি একরকম । শ্যামল প্রান্তর ঊষর ভূমি পাহাড় পর্বত সাগর কিনার সব এক । কোনো ভেদ নেই । অথচ দিনের আলোয় কত বৈচিত্র্য! আমার মনে হয় অনন্তকাল এই কামরায় উঠেছি আর নেমেছি । স্টেশন বদলায় । কিন্তু ওঠানামা বদলায় না ।
ঘুমের মধ্যেই তাই চেনা শব্দে বেঁচে উঠি । এই কামরায় ওই যে যুবক তার পকেটঘড়ি বের করে দেখছে । তাকে তো আমি ভীষণ ভালোবাসি ! আমার বুকের সব কটা শিরায় টান পড়ছে যে! আমি দৌড়ে কাছে যেতে চাই । কালো কোঁকড়ানো চুলে হাত বুলিয়ে সেই সুদর্শন যুবক কিন্তু আমাকে দেখে না । তার দৃষ্টি আমাকে ভেদ করে চলে যায়। “বুবু , কাশীতে নামবো। তৈরি থাকো”। আমি এবার বুবুর দিকে তাকাই । আঃ! সেই মুখ! সেই ছোট্ট কপাল আর অদ্ভুত সুন্দর আঁকা ঠোঁট! এবার যেন জোয়ার আসে বুকে। আমি থামতে পারি না। ছুটে যেতে গিয়ে দেখতে পাই, সেই শিশু হাত বাড়িয়েছে। সুদর্শন যুবক তাকে কোলে তুলেছে। স্টেশন আসছে। নেমে যেতে হবে।
আমার কান্না পায়। আমি বলতে চাই -আমায় নিয়ে যাও। ও কাকে কোলে নিয়েছ? ও কে? ঠিক তখনই সেই যুবক মুখ ফিরিয়ে দ্যাখে। কী অন্তর্ভেদী দৃষ্টি! আমি কাঁদতে থাকি। যুবক ডাকে, বুবু এসো। ও এখন থাক। ওর স্টেশন আসেনি।
আমাকে চিরকালীন বিষাদে আচ্ছন্ন করে নেমে যায় মা মামণ আর আমার পিঠোপিঠি ভাই।
রেলগাড়ি আমাকে নিয়ে চলতে থাকে। আমি স্টেশনের অপেক্ষায় জেগে থাকি। আমার স্বপ্নচেতনা পাথরে দাগ তোলার স্বরে বলে -স্টেশন আসবে। আসবেই।







১৯


জীবনে কখনও ভাবিনি রাতে শুয়ে বিছানায় কান পাতলে রেলগাড়ির শব্দ শুনতে পাবো না ।
আজ কতদিন ঘুমের মধ্যে সেই হুইসেল শুনতে পাই না । এমন নিস্তব্ধ রাত ভয় ধরায়। ঘুমিয়ে যদি ভালোবাসার শব্দ না পাই তবে তো নির্ঘুম রাত কাটবে । স্বপ্ন দেখব কী করে ?
গতকাল রাতে লম্বা বারান্দায় হাটছি। সামনে গঙ্গার ধার খা খা করছে । মনে হলো গঙ্গা এই মাত্র নেমেছে হিমালয় ছেড়ে। এর আগে ওর সঙ্গে দেখা হয়নি পৃথিবীর। জীবনের এত উৎসব ও জানে না। আমি ওর সঙ্গে কথা বলতে থাকলাম। ছলছলে জলে একটা নৌকা পর্যন্ত নেই।
ওপারে আলো ঝিলমিল করছে । অনেক রাতেও ওগুলো নেভে না। কে জানে কখন নেভে। কেউ কি আর জানতে পারে আলো কখন নেভে ?
আগে এই পার থেকে ওপারের আলোর পিছনে তারা জ্বলার মতো মিটমিট করে আলো ছুটে যেতো। দূর পাল্লার রেলগাড়ির আলো।
হঠাৎ মনে হলো আলো ছুটছে না? শব্দও পেলাম মনে হলো!
আমি আলোর দিকে চেয়ে রইলাম ।
অন্ধকার ভেদ করে আলো ছুটে আসছে।
রেলগাড়ি হারায়নি!
চেতনার গভীরে ডুব দিয়ে সে তুলে আনছে আলো আর প্রিয় শব্দ ।
গঙ্গাকেও আর সদ্যজাত মনে হলো না।