সৃষ্টির আদিকাল ও এখন
মহাত্মা রত্নাকর যখন সংসার প্রতিপালনের জন্য দস্যুবৃত্তিকে তাঁর মূল কর্ম বলে স্বীকার করেন তখন একদিন দেবর্ষি নারদ সেই পথে চলেছিলেন। ঘন অরন্যে স্বয়ং বিষ্ণুদূতের তো আর শঙ্কার কোনও কারণ ছিলনা! তবু তাঁকে আক্রমণের মুখে পড়তে হলো। আক্রান্ত নারদ রত্নাকরকে দেখে বুঝেছিলেন যে এ সাধারণ দস্যু নয়। হৃদিরত্নাকরের অগাধ জলে অমূল্য মণিমাণিক্য আছে। তাঁর চোখের দৃষ্টিতে নির্মোক শূন্যতা ছিল, বোধ করি। এমন নিঃস্পৃহ দস্যুকে তাই সাহসে ভর করে নারদ জিজ্ঞাসাই করে ফেললেন। কেন বাপু এমন কাজ করো? উত্তর এলো, পরিবার প্রতিপালনের জন্য। নারদ চমকিত হলেন। এ ব্যক্তি সাধারণ নয়। এর দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ ঠিক দস্যুর মতো নয়। নারদ একটা চেষ্টা করলেন। দেখাই যাক না, যদি এর মনের মোড় ফেরে। যদি নিজের অন্তরে সেই অমূল্য ধনের সন্ধান পায়। তবে এর জীবনের গতিই বদলে যাবে। নারদ ছল করলেন। পরিবার প্রতিপালনের জন্য যদি তুমি এমন নীচ বৃত্তি নিয়ে থাকো, তবে যাও, প্রত্যেককে জিজ্ঞেস করো, কে তোমার দায়ভাগী হবে। তোমার পালন যারা স্বীকার করে তারা কি তোমার দায় স্বীকার করবে? এরপর সকলেই জানেন যে রত্নাকরের চৈতন্য বিকশিত হলো। তিনি জানতে পারলেন যে তাঁর অপরাধের দায় ভাগ করে নেবার মতো কোনও পরিজন নেই এই পৃথিবীতে। তবে কার জন্য তিনি এই বৃত্তি স্বীকার করেছেন? কা তব কান্তা কস্তে পুত্রা? তিনি অতএব গভীর ধ্যানে ডুবে গেলেন। তাঁকে ঘিরে এ পৃথিবীর যত মায়া মোহ বল্মীকের আবরণ তৈরি করল। কিন্তু তিনি যেমন নিজবৃত্তিতে অবিচল ছিলেন, ঠিক তেমনই আপন অন্তরে অন্তর্যামীর সন্ধানে অবিচল রইলেন। ফলস্বরূপ এক প্রভাতে তাঁর অন্তর সেই পরম আলোয় আলোকিত হলো। দীর্ঘকাল তিনি সাধনায় রত থেকে ব্রহ্মার আশীর্বাদ পেয়ে মুনি উপাধি লাভ করেন। এরপর বহুকাল কেটে গিয়েছে। আদিকবি একদিন তমসা নদীর তীর ধরে হেঁটে চলেছেন। সঙ্গে তাঁর শিষ্য ভরদ্বাজ। তিনি এসেছেন তমসা তীর্থে স্নান করার বাসনায়। তাঁর বিশ্বাস, তমসা তীর্থে স্নান করলে মনের সকল তামস দূর হবে। যাত্রা পথে তমসার দুই তীরের অপূর্ব নিসর্গ শোভা দেখতে দেখতে চলেছেন। হঠাৎ চোখে পড়ল এক নিষাদ সম্মুখে বৃক্ষশাখায় মিথুনরত এক ক্রৌঞ্চযুগলের মধ্যে পুরুষ পাখিটিকে তীরবিদ্ধ করেছে। পুরুষ পাখিটি শাখাচ্যুত হয়ে পড়ে আছে। আর স্ত্রীপাখিটি করুন সুরে বিলাপ করছে। দুঃখিত মুনি এ দৃশ্যে এতটাই ব্যথিত হয়েছিলেন যে নিষাদকে অভিশাপ দেন একটি শ্লোক বলে। সেই শ্লোকই সৃষ্টির আদি শ্লোক। মহাকাব্যের শুরু। শ্লোকটির সৌন্দর্য এখনও মোহিত করে আমাদের।মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং ত্বমগমঃ শাশ্বতীঃ সমাঃ।যৎ ক্রৌঞ্চমিথুনাদেকমবধীঃ কামমোহিতম্।।বাল্মীকি নিষাদের এমন রসভঙ্গকারী আচরণেই সম্ভবত বিরক্ত হয়েছিলেন। সৃষ্টির সবচেয়ে স্বর্গীয় সবচেয়ে মনোহর যে রস, শৃঙ্গার, তাকে নষ্ট করা কোনও মানুষের নীরস ও নিষ্ঠুর মনের পরিচয় দান করে। অবশ্যই এ নিষাদের মনে কাব্যরস নেই। যে মানুষ রোজকার বেঁচে থাকা বাবদে জীবিকা নির্বাহ করে সে মানুষ হয়ে উঠতে পারে কি? মানুষের মনে কাব্যরস থাকবেনা, উচ্চতর দর্শন থাকবেনা, আর সেসব প্রকাশের উপযুক্ত ভাষা সৃষ্টি হবেনা, এমনটি হলে সে আর মানুষ রইল কি করে? তাই আদিকবি একটি মাত্র শ্লোকে জীবনের সারবত্তা বুঝিয়ে দিলেন। যে কোনও কারণেই হোক, রসভঙ্গ কোরোনা। সৃষ্টির একটি ছন্দ আছে, একটি ভাব আছে, একটি তালমিল আছে, যা ব্যহত হলে কুৎসিত লাগে। আর সেই সব সৌন্দর্যকে ভাষা দিতে পারে শুধু মানুষ। তাই ভাষাকে সম্মান করো।এরপর দীর্ঘকাল কেটে গিয়েছে। এক বিখ্যাত রাজকন্যা পণ করেছেন তিনি ধরিত্রীর সবচেয়ে জ্ঞানী মানুষটিকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করবেন। স্বয়ম্বর হোক। গার্গী মৈত্রেয়ীর মতো তিনি উপস্থিত বরমাল্যপ্রত্যাশীদেরকে এক এক করে তর্কযুদ্ধে আহ্বান করবেন। যে ব্যক্তি সেই যুদ্ধে তাঁকে পরাজিত করবে তাঁকেই তিনি গ্রহণ করবেন। কনকাঙ্গিনী কন্যার সঙ্গে তর্কে ধূলিসাৎ হচ্ছেন একের পর এক সম্ভ্রান্ত মানুষ। এমন সময়, সম্ভবত কোনও ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তির চক্রান্তে, উন্মুক্ত দ্বার দিয়ে প্রবেশ করলেন একটি সুকুমার ব্রাহ্মণ তনয়। তাঁর মুখে চোখে এমন সারল্য এমন দুনিয়াদারীর অভাব যে সকলেই তাঁকে বোকা সাব্যস্ত করেছে। সে নিজের ভালো বোঝেনা। সে নিজের স্বার্থ জানেনা। যে ডালে বসে সেই ডাল কাটে। সভার লোকজন তাকে তাড়িয়ে নিতে যায়। কিন্তু রাজকন্যার জন্য থামতে হয়। মৌন তর্কযুদ্ধে সেই কুমার জিতে যায়। যদিও সকলেই তাকে ভুল বোঝার খেসারত বলেছে, কিন্তু কে বলতে পারে যে কুমার জেনেশুনেই নিজের বোধ ব্যক্ত করেননি? এক ছাড়া দুই নেই তো! অবশ্য দুনিয়া তাঁকে ক্ষমা করেনি। তাঁকে পরিত্যাগ করলেন পত্নী। নিজের দুর্ভাগ্যকে কপালে করাঘাত করে মেনে নিলেন। কিন্তু সরল কুমার নিজের আনন্দে ঘুরতে থাকলেন। ঘুরতে ঘুরতে এক দীর্ঘিকার তীরে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। হঠাৎ বীণার সুরে ঘুম ভাঙল। মনোবীণার সুর কি? হৃদয়ে সরস্বতী উদয় হলেন। সৃষ্টি হলো মন্দাক্রান্তা ছন্দ। সৃষ্টি হলো কুমারসম্ভব। আদিপিতা ও আদিমাতা যে কাব্যে কুমারের জন্ম দিলেন মহাকবি করে। ভাষার সৃষ্টি হলো।এই দুটি কাহিনীই কিন্তু একটি দিকনির্দেশ করে। তা হলো, সরলতা আর উদারতা, সঙ্গে নিজের অন্তরে ডুবে যাওয়ার ইচ্ছে, এইই আমাদের মূলধন। কাব্য সরস্বতী তবেই কৃপা করবেন। হিংস্র কুটিল নিষ্ঠুর স্বার্থপর, এতোগুলো বিশেষণই প্রয়োজন, তাঁর কৃপাবঞ্চিত যুগে যুগে। সেই কারণেই জ্ঞানী বৈয়াকরণ লেখেন – শুস্কং কাষ্ঠং তিষ্ঠতি অগ্রে। আর কালিদাস লেখেন – নীরস তরুবর পুরত ভাগে।তাই, ভাষার কারিগর হবার আগে তাঁর কৃপা চাই। তা পেতে গেলে নির্মলতার সাধনা যে কি দরকার! দিকে দিকে কিন্তু নিজের ঢাকের এমন চর্চা চলছে যে ভয় হয়, মা সরস্বতী মূক না করে দেন আমাদের।প্রকাশিতএকুশে বর্ণমালা ২০১৮যুগসাগ্নিক প্রকাশনা
No comments:
Post a Comment