লস্ট ফরেস্ট
জোহানেস ডি জেন্সেন
(১৮৭৩ সালে ডেনমার্কের ফরসো শহরে জন্মগ্রহণ করেন জোহানেস ভি জেনসেন। কোপেনহেগেনে ডাক্তারি পড়া অসম্পূর্ণ রেখে দেশভ্রমণে বেড়িয়ে পড়েন।
১৮৯৭ সালে আ্যমেরিকা যান। সেখান থেকে ফিরে এসে অভিজ্ঞতা লেখেন। সেই লেখাগুচ্ছর একটি লস্ট ফরেস্ট। ১৯৪৪ সালে নোবেল প্রাইজ পান।)
১
কোরা একজন চাষী। সে নিজের জমি নিজেই চাষ করতো। একবার যখন তার হাতে কিছু টাকা জমলো, সে শহরে গেল ক্রীতদাস কিনতে। পশারি তাকে অনেকগুলো দাস দেখালো। কিন্তু কোরার আর মন ওঠেনা।
"তুমি চাও সবকটাকে এখানে টেনে আনি?" পশারি গজ গজ করে উঠলো। এই দুপুরে দাসেরা সব ঘুমিয়ে।"
কোরা সহজ সুরে বলল -তবে আর কোথাও যাই?
"দাঁড়াও দাঁড়াও!" বিরক্ত পশারি শিকলে এক টান দিলো। সঙ্গে সঙ্গে ঘুমন্ত দাসেরা সার বেঁধে দাঁড়িয়ে পড়ল।
কোরা প্রত্যেককে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল।
"একে দেখো। শক্তপোক্ত লোক"। পশারি একটা দাসকে ঠেলে দিয়ে বলল, “কি মনে হয়? বুকে ঘুসি মেরে দেখো। ছাতিটা বেশ শক্ত নয়? আর কব্জি দেখো। শিরাগুলো যেন বেহালার তার। এই! মুখ খোল।"
পশারি এক আঙ্গুল দিয়ে তার মুখটা আলোর দিকে ঘুরিয়ে দিলো।
"এবার এর দাঁত দেখো শুধু।" সে গর্বের স্বরে বলল। তার হাতে ধরা ছুরিটার বাঁট সে দাসটার দাঁতের পাটিতে বুলিয়ে দিলো।
"দেখো লোহার মত শক্ত। পেরেককে দুটুকরো করে দিতে পারে"।
কোরা খানিক চিন্তা করল। সপ্রশংস দৃষ্টিতে সে দাসটির গায়ে হাত রাখল। আঙ্গুল টিপে টিপে তার নমনীয় অথচ দৃঢ় পেশীগুলিকে অনুভব করল, সেগুলো বেশ শক্ত কিনা।
অবশেষে মনস্থির করে সে দাসটিকে কিনে ফেলল। দাম নিয়ে গজগজ করতে করতে শিকল থেকে তাকে খুলে দিলো পশারি। কোরা বাড়ি নিয়ে চলল।
কিছুদিন পরে দাসটি অসুস্থ হয়ে পড়ল এবং হতাশা গ্রাস করতে থাকলো তাকে। এখন যেহেতু সে আর বাজারের পণ্য হিসেবে নেই, থিতু হয়েছে এখানে, এখনই তাই সে তার জন্মভূমি সেই অরণ্যর জন্য আকুল হয়ে পড়ল। এটা দারুন লক্ষণ। কোরা জানে।
একদিন দাস যখন চিৎ হয়ে শুয়েছিল, জীবনে তার আর কোন আকর্ষন নেই যেন, তার চোখের দৃষ্টি শূন্য, তখন কোরা তার বিছানার পাশে গিয়ে বসল। তাকে বলল, “ভয় পেয়োনা। তুমি আবার তোমার বনে ফিরে যেতে পারবে। কথা দিচ্ছি। আমার কথায় তুমি নির্দ্বিধায় বিশ্বাস করতে পারো। তুমি এখনো তরুণ। তুমি যদি আমার জমিতে স্বেচ্ছায় ভালো করে চাষ করতে পারো তবে পাঁচ বছর পরে আমি তোমাকে মুক্তি দেবো। যদিও আমি তোমাকে কিনে এনেছি, তবু।”
দাস এর পর কাজ শুরু করলো। দানবের মতো কাজ করতে লাগল সে। দরজার সামনে বসে ওই বাদামী চামড়ার তলায় পরিশ্রমে কেঁপে ওঠা সুগঠিত শরীর লক্ষ করত কোরা। প্রায় প্রতিদিনই ঘন্টার পর ঘন্টা এভাবে দাসকে লক্ষ করতো সে, কারণ এ ছাড়া তার আর কোন কাজ ছিল না। সে অনুভব করছিল শরীর একটা সুন্দর বস্তু আর সেটা দৃষ্টিসুখের ও বটে।
২
পাঁচ বছরে দাস দশটি অয়নান্ত গুনে ফেলল। দশবার সূর্য আকাশে তার পথ পরিবর্তন করলো। প্রতি অপরাহ্নে সূর্যাস্তের সময় সে পাথরের টুকরো বা ঢেলা দিয়ে চিহ্ন করে রাখত।
প্রথমবার যখন সূর্যের দক্ষিণায়ন হল সে তার ডান হাতের বুড়ো আঙুল গুনে রাখল। এভাবেই উত্তরায়ন পর্যন্ত সেই অসীম সময়কে সে চিহ্নিত করল তার তর্জনী দিয়ে। ডান হাতের আঙ্গুল দুটো, যা তার দাসত্বের স্পষ্ট চিহ্ন ছিল, সে দুটি যেন মুক্তি পেল।
ধীরে ধীরে দিন ও সময় হিসেব এবং অন্তহীন প্রতীক্ষা তার ধর্ম হয়ে দাঁড়াল। তার আধ্যাত্মিক সম্পদ, অন্তরের সম্পদ, যা কেউ তার থেকে কেড়ে নিতে পারবে না।
যত দিন যেতে লাগল তার অংক আরো বড় হতে লাগল। আরো বিস্তৃত ও গভীর। বছরগুলো যেন অসীম কোন বিমুর্ত ঘটনা যাকে সে আর ধরতে পারে না। অথচ প্রতিটি সূর্যাস্ত তাকে নতুন আশা দেয়। বিশ্বাস দৃঢ়তর হয়। ক্ষণস্থায়ী বর্তমান যেন অন্তহীন অতীত হয়ে চলেছে প্রতিক্ষণে। ভবিষ্যৎ অনন্ত সুদূর।
বলাটা খুবই সহজ ঠেকছে। বাস্তব তা নয়। অবশেষে এই পাঁচ পাঁচটা বছর পর দাস এল প্রভুর কাছে। মুক্তি চাইল। বনের মাঝে তার যে ঘর আছে সেখানে যেতে চায় সে।
“তুমি খুব বিশ্বস্ত দাস। বলো তোমার দেশ কোথায়। পশ্চিমে কি? আমি তোমাকে অনেকবার ওই দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখেছি”, কোরা বলল।
হ্যাঁ পশ্চিম বনভূমিতেই তার ঘর। দাস ঘাড় নোয়ালো। “তাহলে তো সে অনেক দূর!” কোরা বলল। দাস মাথা নাড়লো। সত্যিই অনেক দূর।
“তোমার কাছে তো টাকা নেই! আছে?” দাস চুপ করে রইল। বিমর্ষ হয়ে ভাবলো, তাইতো! তার কাছে তো টাকা নেই!
“টাকা ছাড়া তুমি কিন্তু কোথাও যেতে পারবে না। যদি তুমি আমার জন্য আরো তিন বছর কাজ করো তবে... না থাক, দু বছর, তবে আমি তোমাকে দেশে যেতে টাকা দিতে পারি।”
দাসটি একথা শুনে মাথা নিচু করে চুপ করে রইলো। তারপর আবার নিজের পায়ে শেকলটা পড়ে নিলো। সে আগের মতই আবার কাজ করতে শুরু করলো কিন্তু আগের মত দিনের হিসেব আর রাখল না। সে দিনের বেলায় স্বপ্ন দেখতে শুরু করলো। ঘুমের মধ্যে তার কথা ও চিৎকার শুনতে পেত কোরা।
কিছুদিন পর সে আবার অসুস্থ হল। শয্যাশায়ী হয়ে পড়ল। কোরা আবার তার বিছানায় পাশে এসে বসল। দীর্ঘ সময় ধরে তাকে বোঝাতে লাগলো যেন সে কোনো অভিজ্ঞ জ্ঞানী।
“আমি বুড়ো লোক। তরুণ বয়সে আমারও ইচ্ছে হতো পশ্চিম বনভূমিতে যেতে। কিন্তু কখনই আমার কাছে পর্যাপ্ত টাকা ছিল না। বেঁচে থাকতে আমি আর কখনোই যাবো না সেখানে। মরে গিয়ে আমার আত্মা যাবে সেখানে। কিন্তু তুমি শক্তপোক্ত জোয়ান। খুব পরিশ্রমী। তবু ভাবো, তুমি কি আমার তরুণ বয়সের চেয়েও বেশি শক্তিমান? ভালো করে ভেবে চিন্তে দেখো। একটা বুড়োর পরামর্শ মন দিয়ে শোনো। তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠো।”
কিন্তু দাস খুব ধীরে ধীরে সুস্থ হতে লাগল। যখন সে আবার উঠে দাড়ালো তখন তার আর আগের মতন উৎসাহ নেই। সব উচ্চাশা চলে গেছে। কাজের মাঝে মাঝে আলস্যে সে শুয়ে পড়ে। ঘুমিয়ে পড়ে।
তারপর কোরা একদিন তাকে চাবুক মারলো। এতে ভালো হলো, কারন সে খুব কাঁদলো।
৩
এভাবেই দুটো বছর চলে গেল। এবার কোরা সত্যিই তাকে মুক্তি দিলো। সে পশ্চিমে রওনা দিলো। কিন্তু কয়েক মাস পর সে বেচারা ফিরে এলো। সে তার অরণ্য, তার দেশ খুঁজে পায়নি। কোরা বলল, “আমি তোমাকে বলেছিলাম না? কেউ বলবে না যে আমি তোমার প্রতি কখনো নিষ্ঠুর হয়েছি। আচ্ছা, তুমি আবার যাও। এবার পূবে যাও। হতে পারে ওইদিকেই তোমার বন।”
আরো একবার উদীয়মান সূর্যের দিকে মুখ করে দাস পথে বেরিয়ে পড়ল। এবং অবশেষে বহু দূরে সে তার নিজের দেশে, সেই বনে এসে উপস্থিত হলো। কিন্তু এই অরণ্যকে তো সে চেনে না!
পরাজিত ও বিধ্বস্ত দাস পশ্চিমে মুখ করে ফিরতে লাগলো। ফিরে এলো কোরার কাছে। ফিরে এসে বলল, যদিও সে অরণ্য খুঁজে পেয়েছে তবু সে তার দেশ নয়।
“হুঁ।” কোরা কাশল। বলল, “আমার কাছেই থাকো। যতদিন আমি বেঁচে থাকব ততদিন পৃথিবীতে তোমার আশ্রয়ের অভাব হবে না। আমি চলে গেলে আমার ছেলেরা তোমাকে দেখবে।”
দাস অতএব রয়ে গেল। কোরার বয়স হয়েছে। কিন্তু দাসের পূর্ণ যৌবন। তাকে কোরা ভালো খাবার দিতো, যাতে সে অনেকদিন বাঁচে। তাকে পরিষ্কার রাখত, যাতে তার অসুখ না করে। আর মাঝে মাঝে তাকে চাবকাতো, যাতে সে মিনমিনে হয়ে থাকে। মাথা না তোলে।
প্রতি রবিবার দাস একটা ঢিবির ওপর বসে পশ্চিমে তাকিয়ে থাকতো।
কোরার চাষবাস খুব ভালো হলো। প্রচুর বনভূমি সে কিনতে লাগল এবং সে সব পরিষ্কার করে ফেলতে থাকলো, যাতে তার দাস আরো বেশি জমি চাষ করতে পারে। দাস বনের গাছ কাটতে শুরু করলো। এখন কোরার অনেক টাকা।
একদিন সে তাই একটা ক্রীতদাসী নিয়ে এলো।
বছর যেতে লাগলো। এখন কোরার বাড়িতে ছ’টি শক্ত ছেলে দাস হয়ে বাড়তে থাকল। বাবার মতো তারাও নিঃশব্দে কাজ করতে থাকে। তাদের বাবা তাদের বলেছে, একমাত্র যখন কেউ কাজ করে তখনই তার সময়টা দ্রুত কাটে। আয়ু ফুরোলে সকলেই সেই চিরকালীন অরণ্যে চলে যাবে।
প্রত্যেকটি ছুটির দিনে দাস তার ছেলেদের নিয়ে ওই ঢিবির ওপরে যেত। সেখানে পশ্চিমসূর্যের দিকে তাকিয়ে সে তাদের অপেক্ষা করা শেখাতো।
কোরা এখন জরাগ্রস্ত। বুড়ো সে অনেকদিন হয়েছে, কিন্তু এখন বয়সের কঠিন ভার ছাড়া তার কাছে আর কিছু নেই। ছেলেরা কেউই তার মতন শক্তপোক্ত হলো না। তবে তাতে ভয়ের কিছু নেই। কারণ কাটারির এক কোপে একটি দাস একটা মানুষকে কেটে ফেলতে পারে। চমৎকার সব দাস।
তাদের লোহার মতন দৃঢ় মাংসপেশী। বাঘের মতন দাঁত।
কিন্তু সময়টা ভালো, তাই দাসেরা তাদের কুঠারের ঘায়ে শুধু গাছই কাটছে।
