জলপরী

হেই জোর সে দাঁড় টান রে বাপ l  ঈষানে মেঘ l  এখনি দেখতে দেখতে ছেয়ে ফেলবে l  রোগা হারু তার ততোধিক রোগা ছেলেটাকে তাড়া দেয় l  খোকার মাত্র বারো l  পান্তার জোরে দূহাতের শির ফুলিয়ে সে আর কত সামলাতে পারে ! ঝড় উঠল বলে l  সাঁ সাঁ করে হাওয়ার সাথে নিকষ কালো মেঘ ছুটে আসছে আকাশ ময় l  নিমেষে নৌকো খানা মোচার খোলার মত পালটি খেলো l  হারু দুহাত দিয়ে নৌকো সিধে করতে গিয়ে ভেসে গেল খোকা l

রাতে খোকার মা ভাত বেড়ে দিতে দিতে মাছ ভাজা খানা খোকার পাতে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করল হ্যাঁ রে এত বড় মাছটা পেলি কি করে ? খোকা বলল - মা ! জলে উল্টি পালটি খেতেই এক জলপরী পেটের তলা দিয়ে আমায় জলে ভাসিয়ে দিল l  আমি মাছের জন্য ডুবছিলুম বলে সে এই মাছ খানা আমার হাতে দিল l  

প্রতিভার উপহাস

ভদ্রলোক একভাবে মাথা নীচু করে লিখে চলেছেন l  সামনে টেবিলে রাখা টেবিল ল্যাম্পের আলোয় l  তাঁর কপালের ভাঁজ ঢেকে উড়ে চলেছে কিছু চূর্ণ কুন্তল l  চোখে মোটা কাঁচের চশমা l  হলদেটে কাগজে ঝরনা কলমে লিখে চলেছেন l সামনে রাখা একটা হাতল ভাঙ্গা চেয়ার l  সন্ধ্যে বহুক্ষণ নেমে গেছে l  খোলা দরজা দিয়ে ঢুকে চেয়ার খানায় বসলাম l  নিজের মনেই বুঝতে পারলাম এ বাড়িতে চোর ও ঢুকতে চায়না l  আমার আসা ও বসা তিনি কিছুই নজর করলেন না l  বাধ্য হয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে নিজের উপস্থিতি জানালাম l  মুখ তুললেন l  চেয়ে আছেন আমার দিকেই অথচ দৃষ্টি আমাকে ছাপিয়ে চলে গেছে সুদূরে l  অগত্যা মৃদু কণ্ঠে বললাম - আপনার একটি লেখার জন্যে এসেছি l  কি জানেন, এখনকার লেখকদের বড় বেশি এক্সপেরিমেন্ট l  খুব সচেতন ভাবে লেখা l  স্পনটেনিটি নেই l  কিছুতেই সেই অদ্ভুত কালজয়ী ব্যপারটা আসছেনা l  খুব টেম্পরারি l  অনেকটা সন্দেশের মত l  গলা দিয়ে নামলেই শেষ l  ভদ্রলোক অবাক হয়ে শুনছিলেন l  বললেন - সে কি ? আমি তো জানতাম সাহিত্যে বিপ্লব ঘটে গেছে l  দারুণ সব গবেষণা চলছে l  বললাম - হুঁ, সে ঠিক l  তবে ওই মন কে একেবারে জিয়ন কাঠির ছোঁয়ায় অমরাবতী তে তুলে নেবে সেই সৃষ্টি কই ? ওই বাহ্ বেশ l  খুব ভালো l  এই পর্যন্ত l  এতক্ষণে ভদ্রলোকের মুখে হাসি ফুটল l  বললেন - ওহ্ এবার বুঝেছি l  আপনি এই আমাদের মত অনাহার ক্লিষ্ট লেখক দের লেখা চান l  পেটে ভাত না পড়লে মরিয়া হয়ে যে লেখা বের হয় তা হল সাধকের সিদ্ধি l  আপনার কথায় মনে হচ্ছে এখন আর লিখে কেউ অনাহারে মরে না l  হাসলাম - ঠিক ই ধরেছেন l  এখন বইয়ের প্রমোশন হয় l  তাতে বিক্রি ঠিক মত হয় l  চশমা টা নামিয়ে চোখ দুটো মুছলেন l  বললেন - বেশ কথা l  অন্তত আমার মত নিশ্চিন্তে লেখার জন্যে মরা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়না l

বেরিয়ে আসার সময়ে দেখলাম একটা ছেঁড়া পাতা উড়ে এল কাছে l  কুড়িয়ে নিয়ে চোখ রাখতেই দেখলুম - দিবারাত্রির কাব্য l  রচনা মাণিক বন্দোপাধ্যায় l 

মাতৃকা

সেদিন বাজার থেকে ফিরে বিনয় রাই কে খুঁজে পেলেন না l  কোথায় যে যায় থেকে থেকে l  অনেক ডাকাডাকি করেও সাড়া না পেয়ে নিজেই ডাইনিং টেবিলে বসে এক গেলাস জল নিয়ে খেলেন l  অবসরের পর যেন চট্ করে বুড়ো হয়ে গেছেন l  দৌড়াদৌড়ি করে কিছু আর করতে পারেন না l  একটু পরে শোনা গেল রাইয়ের গলা l  মুখ মুছতে মুছতে ঢুকে এলেন l  বিনয় কে দেখে বললেন, কখন এলে ? খুব তাড়াতাড়ি হয়ে গেল তো ? বিনয় হাসলেন l  তোমার অনেক কাজ, তাই বুঝতে পারোনা l  আমি ঘন্টা দুয়েক ছিলাম না l  তোমার কদ্দুর ? রাই বললেন, মোটামুটি শেষ l একদম ছোটটা খুব নিরবিরে l  মাথা তুলতেই চায়না l  কত করে আকাশ দেখিয়ে পাখি দেখিয়ে তবে খাওয়ালাম l  বিনয় প্রশ্রয়ের হাসি হাসলেন l  বেশ করেছ l  এখন বলত জলখাবার টা রাখা ছিল খেয়েছ কি ? রাই চোখ বড় বড় করে তাকালেন l  যাহ্, ভুলে গেছি l  আর এতগুলোকে সামলান কি আর মুখের কথা ? মাথার ঠিক থাকে কারো ? তুমিই বল l  বিনয় হাসলেন আবার l  না না তুমিই বলো l  দীর্ঘশ্বাস টা ঠেলে বেরোল বুক থেকে l  রাই ডাকলেন, চল তো একবার দেখবে ছোটটা কে l  চল যাই l  দুজনে উঠে এলেন দোতলার অপরিসর বারান্দায় l  সেখানে কতগুলি ফুল গাছের টব l  মাঝে একটি টবে সদ্য জন্মানো জুঁই চারা l  রাই ছুটটে গিয়ে আলতো হাতে চারাটা কে টব সমেত তুলে গ্রিলের কাছে নিয়ে এলেন l  বললেন, নে নে আলো খা l  যত পারিস খা l
নীচে পাশের বাড়ির ঝি বাসনের পাঁজা নিয়ে বসেছিল l  বলে উঠল, ওই রে পাগলের কাণ্ড দেখ, গাছ কে আলো খাওয়াচ্ছে l 

হরিপদ কেরানী

বিলাস বাবু নিজের পুরনো ঘুণ ধরা কাঠের টেবিলে বসে বসে জাবেদা খাতা খানা খুলে দেখছিলেন l  বেশি এন্ট্রি নেই l  এক সময়ে এতে এন্ট্রি তুলতে তুলতে দিন কাবার হয়ে যেত l এখন সে সময় আর নেই l  হায় পুরাতন তোমার দিন গিয়াছে l  তাঁর ও অবসরের আর দেরি নেই l  বছর দুয়েক বড় জোর l  তাও বয়স কমানো ছিল বলে l  ছেলে ছোকরা গুলো খেপায l  দাদু, কত কমানো ছিল ? No idea ? বাস রে l
        সরকার বাহাদুর এবার এমন যন্ত্র এনেছেন যে হাতে করে লেখালিখির দিন শেষ l  সব এখন যন্ত্রে হবে l  কম্পুটার l  বিলাস বাবুর মোটা ফ্রেমের মোটা কাঁচের চশমা দিয়ে চোখ দুটো বোঝা যায়না l  তিনি তো যন্ত্রে কাজ করতে পারবেন না l  তাই বড় সাহেব ওই পুরনো জাবেদা খাতা খানা উল্টে পাল্টে দেখতে বলেছেন l  কোনও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চোখ এড়িয়ে না যায় l  বিলাস বাবু দেখলেন, খাতার মাঝে একটা ছবি l  সবুজ ধানখেতের মধ্যে দিয়ে ছুটে চলেছে এক বালক l  পরনে আধময়লা কাপড় l  খালি গা l  পাতা ওল্টালেন l  দেখলেন মাটির দাওয়া l  একটি বৌ মাথায় কাপড় দিয়ে চুলোয় ফুঁ দিচ্ছে l  ধোঁয়ায় চোখ দিয়ে জল পড়ছে l  পাতা ওল্টালেন l  রেলগাড়ি ছুটছে l  ধোঁয়া উড়িয়ে l  একটি কিশোর অবাক চোখে দেখছে l  জানলায় একজন মাঝবয়সী লোক l  হাত নাড়ছেন l  তাঁর চোখে জল l  পাতা ওল্টালেন l রেলগাড়ির ভেতরে বসে একটি তরুণ l  চোখে খুশি l  ট্রেন ছুটছে l  সামনে এক গলা ঘোমটা দিয়ে একটি গাঁয়ের বধূ l  পাতা ওল্টালেন l  চুনকাম করা সাদা একটি দপ্তর খানা l  নতুন একটি আম কাঠের টেবিল l ওপরে দিস্তে করে রাখা লাল শালুতে মোড়া হিসেবের খাতা l বিলাস বাবু উঠে পড়লেন l  ছোকরা অ্যাসিস্ট্যান্ট তাড়াতাড়ি এসে জিজ্ঞেস করল - এনি প্রবলেম ? বিলাস বাবু দুঃখী হাসিতে মুখ ভরিয়ে বললেন - এই খাতায় যা আছে তা তোমাদের যন্ত্রে ধরবে না l  ছোকরা ভুরু কুঁচকে কি ভাবল l তবে ওটা আপনি আপনার জিম্মায় রাখুন l