সভ্যতার সংকট ৪

তামিল  বিজ্ঞানী হনুমান মহাবীর এসেছেন সিংহলে। তিনি ভেষজবিজ্ঞানে দিকপাল। অধুনা এর সংগে যোগ হয়েছে রসায়ন। সে আবার উদ্ভট বস্তু। রাজা রাম নাকি সময় সময় খুব ভীত হয়ে পড়েন। শত্রুসৈন্য আক্রমণ করলে কিভাবে তার মোকাবেলা করবেন। মহাবীর তাই রাজার নির্দেশে এসেছেন সিংহল। সিংহলে আসার তাঁর কোনও মানা নেই। সিংহল রাজ্যে হরদমই আসাযাওয়া করে থাকেন দাক্ষিণাত্যের এইসব রাজ্যের অধিবাসীরা। রাজপুরীতে অতিথিসেবার সাজ সাজ রব। রাজা খুব বিদ্যাবৎসল। তিনি বিদ্বানের আদর করেন। উপরন্তু মহাবীর অসামান্য প্রতিভাধর।  রাজপুরীর সুমুখে সিংহদুয়ার সেজে উঠল নানা পত্রেপুস্পে। মহাবীর এলেন এবং যারপরনাই প্রীত হলেন। সিংহলের সম্পদ একবার যে চোখে দেখেছে সে আর ভুলতে পারেনা। রাজ দরবারে পরম সাদরে আনা হোল তাঁকে। রানী মন্দোদরী ও সেসময় দরবারে বসে আছেন।  দশানন সবিনয়ে জিজ্ঞেস করলেন - বলুন মহামতি, কি হেতু আগমন? রাজা আঁচ করতে পারছিলেন যে অশোক কাননের বিরল ভেষজ সম্ভারের আকর্ষণেই মহাবীরের এখানে আসা। তবুও একবার জেনে নিতে হয়। গবেষণার জন্য তিনি কি চান। হনুমান ও অশোক কাননের কথাই ভাবছিলেন। কিন্তু হঠাৎ চোখ পড়ল স্ফটিক স্তম্ভে। রাজার দরবার কক্ষটি দাঁড়িয়ে আছে অগুন্তি স্ফটিক স্তম্ভের উপর। মহাবীর আগে কখনও দেখেননি এইরকম। তাঁর রাজ্যের অধিকাংশই ঘন অরন্য ও শস্যক্ষেত্র । সেখানে নাগরিক সভ্যতার এরকম বিকাশ ঘটেনি। ফলে স্ফটিক স্তম্ভের অদ্ভুত আলো বিচ্ছুরণ দেখে তাঁর মনে হোল এ নিশ্চয়ই অমূল্য কোনও মণি মাণিক্য। তিনি ভেষজ ভুলে রাসায়নিক অস্ত্রের কথা চিন্তা করতে লাগলেন। আচ্ছা, যদি এই স্ফটিকের মধ্যে লুকিয়ে রাখা যায় আণবিক বোমা ? তিনি কৌতূহলের বশে লাফ দিয়ে পড়লেন একটি স্তম্ভে । ভুললে চলবেনা যে মহাবীর উচ্চমানের অ্যাথলিট ছিলেন। আরণ্যক রাজ্যে উচ্চ বৃক্ষশাখায় হেলায় এক তরু থেকে অন্য তরুতে বিচরণ করতে পারতেন। এই আরজ গুলো মরুশ্ন দেশের লোক ! ব্যাটারা অরণ্যের বোঝে কি ? মন্দোদরী সেই স্তম্ভের কিনারেই বসেছিলেন । বিপদ বুঝে বললেন - করেন কি মহামতি ? স্তম্ভ ভেঙে পড়লে যে দরবারের ছাদ ভেঙে পড়বে !  হনুমান অপ্রস্তুত হলেন । নতুন আণবিক বোমাটি তবে কি করে পরখ করা যায় ? দশানন অভয় দিলেন । আপনি এই রাজ্যের যে কোনও স্থানে সেটি প্রয়োগ করতে পারেন । হনুমান অবাক । কিন্তু তাতে যে সিংহলের প্রভুত ক্ষতি ! দশানন প্রশ্রয়ের হাসি হাসলেন । মহাবীর আমার পুত্র মেঘনাদ এখন স্পেস রিসার্চে ব্যাস্ত । জানেন তো ? তবু সে বলেছে এমন কোনও বিপদ এলে তাকে একবার জানাতে  । রাম যে এধরণের পদক্ষেপ নিতে পারেন সে আমি আঁচ করেছিলুম । হনুমান নিশ্চিন্ত হলেন । হুম । সে অনেক বড় বিজ্ঞানী । ক্লাইমেট কন্ট্রোল থেকে শুরু করে সাবস্টিটিউট পাওয়ার প্রোডাক্শান সবেতেই অনায়াস বিচরণ । 

সভ্যতার সংকট ৩

           সীতা ও মন্দোদরী, দুই সখী মহানন্দে দিন কাটাচ্ছেন অশোক কাননে। চিরদিনই উদ্ভিদ তাঁকে আকর্ষণ করে। তাই সীতা নাম না জানা সব লতাগুল্ম বৃক্ষরাজি ও ফুলফলের জগতে মগ্ন হয়ে আছেন। বেশ ক'টি সিংহলী সুন্দরী তাঁকে দেখাশুনো করে। এদের রাম ও লক্ষণ চেরী সম্বোধন করেন। চেরী হোল চের শব্দটির স্ত্রীলিঙ্গ। দ্রাবিড় সভ্যতার নয়নতারা, সিংহলকে আর্য রাজারা চের রাজ্য নামে ডাকে। চের অর্থ রাক্ষস, পিশাচ। সীতার এদের সম্পর্কে কোনও বিরূপ মনোবৃত্তিই নেই। তিনি নিজে অনার্য  রাজকন্যা। বিদেহ তখন মগধ বা বগধ রাজ্যের মধ্যে পড়ে।
              এরকম করে যখন দিন কাটছে তখন রাজা দশানন গুপ্ত মন্ত্রণালয়ে মিলিত হয়েছেন বাকি দুই ভ্রাতার সঙ্গে। দ্বিতীয় কুম্ভকর্ণ মহাযোগী। তিনি বৎসরের ছ মাস সময়ে সমাহিত থাকেন। সমাধি থেকে বুত্থিত হলে, বাকি ছ মাস নগরীর আত্মিক জ্ঞানলোভী মানুষদের সঙ্গে আধ্যাত্মিক আলোচনায় অতিবাহিত করেন। এসময়ে অশোক কাননের বিভিন্ন স্বাদিষ্ঠ ফলমূল খান তিনি। তাঁর মত জ্ঞানী ধীর ও স্থির ব্যক্তি এরাজ্যে আর নেই। তৃতীয় বিভীষণ। কূটনৈতিক বুদ্ধিতে অগ্রজদের থেকে অনেক এগিয়ে। রাজার প্রতি অসীম শ্রদ্ধা। যেন তেন প্রকারেন সিংহলকে সর্বরকমে বিপদমুক্ত রাখার দায়িত্ব যেন তাঁর। মোটামুটি এক্সটারনাল এফেয়ারস মানে বিদেশ সংক্রান্ত প্রতিরক্ষার বিষয়টি তাঁর হেফাজতে। দশানন এরকম কুটিল চিন্তাভাবনা করতে ভালোবাসেননা।
           আজ বিভীষণ এক মহা দুশ্চিন্তার সংবাদ এনেছেন। রাজা রাম নাকি সিংহলে প্রেরন করেছেন তাঁর বিশ্বস্ত,  তামিল বিজ্ঞানী মহাবীর হনুমানকে। সে এসে দেখে যাবে সীতা কেমন ভাবে বন্দিনী জীবন কাটাচ্ছেন। দশানন যারপরনাই বিস্মিত ! সেকি ! তিনি বন্দী হবেন কেন ? তিনি মাননীয়া অতিথি ! বিভীষণ জানালেন - এই রাজাগুলো কিচ্ছু বোঝেনা। রাজ পরিবারের আতিথ্য কি বস্তু সে এরা কি করে জানবে? দশানন জিজ্ঞেস করলেন - সীতা কি স্বাধীন নন? তাঁর স্বামি কি নিজের স্ত্রীকে ক্রীতদাসী হিসেবে রেখেছেন ? বিভীষণ মাথা নাড়লেন। জানিনা। এরা তো দাসপ্রথাকে সর্বক্ষেত্রে প্রয়োগ করছেন। স্ত্রী, আত্মীয়স্বজন, রাজকর্মচারী, সেনাবাহিনী। এমনকি সদ্যপ্রাপ্ত বন্ধুদেরও দাস বানিয়ে নিচ্ছেন। দশানন হতবাক - কেমন করে ? বিভীষণ বিষণ্ণ হাসলেন। কেমন করে আবার ? দেখছেন না তামিলদের কেমন ক্রয় করে ফেলেছেন আগাম রাজ্যের লোভ দেখিয়ে ? ধরার শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীরাও এখন ওদের দাস।