প্রতিভার উপহাস

ভদ্রলোক একভাবে মাথা নীচু করে লিখে চলেছেন l  সামনে টেবিলে রাখা টেবিল ল্যাম্পের আলোয় l  তাঁর কপালের ভাঁজ ঢেকে উড়ে চলেছে কিছু চূর্ণ কুন্তল l  চোখে মোটা কাঁচের চশমা l  হলদেটে কাগজে ঝরনা কলমে লিখে চলেছেন l সামনে রাখা একটা হাতল ভাঙ্গা চেয়ার l  সন্ধ্যে বহুক্ষণ নেমে গেছে l  খোলা দরজা দিয়ে ঢুকে চেয়ার খানায় বসলাম l  নিজের মনেই বুঝতে পারলাম এ বাড়িতে চোর ও ঢুকতে চায়না l  আমার আসা ও বসা তিনি কিছুই নজর করলেন না l  বাধ্য হয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে নিজের উপস্থিতি জানালাম l  মুখ তুললেন l  চেয়ে আছেন আমার দিকেই অথচ দৃষ্টি আমাকে ছাপিয়ে চলে গেছে সুদূরে l  অগত্যা মৃদু কণ্ঠে বললাম - আপনার একটি লেখার জন্যে এসেছি l  কি জানেন, এখনকার লেখকদের বড় বেশি এক্সপেরিমেন্ট l  খুব সচেতন ভাবে লেখা l  স্পনটেনিটি নেই l  কিছুতেই সেই অদ্ভুত কালজয়ী ব্যপারটা আসছেনা l  খুব টেম্পরারি l  অনেকটা সন্দেশের মত l  গলা দিয়ে নামলেই শেষ l  ভদ্রলোক অবাক হয়ে শুনছিলেন l  বললেন - সে কি ? আমি তো জানতাম সাহিত্যে বিপ্লব ঘটে গেছে l  দারুণ সব গবেষণা চলছে l  বললাম - হুঁ, সে ঠিক l  তবে ওই মন কে একেবারে জিয়ন কাঠির ছোঁয়ায় অমরাবতী তে তুলে নেবে সেই সৃষ্টি কই ? ওই বাহ্ বেশ l  খুব ভালো l  এই পর্যন্ত l  এতক্ষণে ভদ্রলোকের মুখে হাসি ফুটল l  বললেন - ওহ্ এবার বুঝেছি l  আপনি এই আমাদের মত অনাহার ক্লিষ্ট লেখক দের লেখা চান l  পেটে ভাত না পড়লে মরিয়া হয়ে যে লেখা বের হয় তা হল সাধকের সিদ্ধি l  আপনার কথায় মনে হচ্ছে এখন আর লিখে কেউ অনাহারে মরে না l  হাসলাম - ঠিক ই ধরেছেন l  এখন বইয়ের প্রমোশন হয় l  তাতে বিক্রি ঠিক মত হয় l  চশমা টা নামিয়ে চোখ দুটো মুছলেন l  বললেন - বেশ কথা l  অন্তত আমার মত নিশ্চিন্তে লেখার জন্যে মরা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়না l

বেরিয়ে আসার সময়ে দেখলাম একটা ছেঁড়া পাতা উড়ে এল কাছে l  কুড়িয়ে নিয়ে চোখ রাখতেই দেখলুম - দিবারাত্রির কাব্য l  রচনা মাণিক বন্দোপাধ্যায় l 

2 comments: