সভ্যতার সংকট ২

অশোক কানন সিংহল রাজ্যের সবচেয়ে সুন্দর এলাকা।  রাজা দেশ বিদেশ থেকে নানা ফুল ফল লতা গুল্ম সব এনে রোপন করিয়েছেন।  সুশোভিত কানন সুগন্ধে আমোদিত সারাক্ষণ।  আপাতত জানকী এই বাগানে অবসর জীবন যাপন করছেন।  রানি মন্দোদরী আজ এসেছেন বাগানের শিবদেউলে পুজা দিতে।  স্বামী দশানন শিবের ভক্ত।  আজ একমাস তিনি সন্ন্যাসী সেজে পথে পথে ভিক্ষা করেছেন।  নিজ রাজ্যের সীমানা ছাড়িয়ে অরন্যে ঘেরা পার্বতভুমিতেও গিয়েছেন।  প্রজারা তাকে চিনে ফেললে অযাচিত ভিক্ষা দিয়ে ফ্যালে ।  সন্ন্যসীর ঈপ্সিত নয় তা।  এভাবেই ঘুরতে ঘুরতে তিনি অরন্যে এক বনচারীর কুটিরে গিয়ে পড়েন । গিয়ে দেখেন সেই অসভ্য রাজা এখন বনবাসে। এ তারই কুটীর । তখন জানকী একা।  দশাননকে দেখে স্মিত হাসিতে মুখ ভরিয়ে ফেললেন।  পরাক্রমশালী রাজা হলে কি হয়,  দশানন যে জগত বিখ্যাত!  তার ওপর শিব ভক্ত।  তার ও যে বাপের বাড়ি শিবের ভক্ত।  দশানন কথায় কথায় জানতে চাইলেন এই অসভ্য রাজার খপ্পরে কি করে পড়লেন জানকী ?  উত্তরে জানকী বললেন সবই কপাল।  নয়ত বিদেহ রাজ কেনই বা হরধনুতে জ্যা রোপণ করলেই জানকীর পতি হতে পারা যাবে,  এইকথা ঘোষনা করবেন!  ফলে ভূমিকন্যা হয়েও তাকে রামের ঘরণী হতে হল। বহুদিন পর দশাননের মত সহমর্মি কাউকে পেয়ে জানকীর আনন্দ ধরেনা।  সেকথা বুঝতে পেরে রাজা প্রস্তাব দিলেন - চলো ভগ্নী আমার প্রাসাদে চলো।  এই অবসরে রাজা জানালেন কিভাবে লক্ষণ তার ছোট বোনের সম্মানহানির চেষ্টা করেছিল।  তবে সে যুদ্ধ বিশারদ।  তাই পেরে ওঠেনি।  এই কথা শুনে জানকী বললেন তবে চলুন যাই আপনার সাথে।  শিব পুজা উদযাপন ও হবে,  আবার আত্মীয় সাথে কিছুদিন অতিবাহিত ও হবে।
        গভীর অরন্যে দিক ভুল যাতে না হয় তাই প্লেন থেকে সীতা নিজের ছোটখাট গহনাপাতি ফেলতে ফেলতে এসেছেন।  রাম তো তার ভাষা পড়তেই পারেন্ না।  চিঠি লিখে লাভ নেই।  লক্ষণকে আর বিশ্বাস করা চলেনা।  রাজা দেখলেন সীতা গহনা ফেলছেন।  তাই দেখে দশানন বললেন জানকী স্বর্ণ রাজ্যে চলেছ ভগিনী। এ গহনা তুমি আবার ফিরে পাবে।  সীতা হাসলেন।  অশোক কানন প্লেন থেকে দেখে সীতার মনে হল স্বর্গের নন্দন কাননও এর কাছে নিষ্প্রভ।  দশানন লক্ষ করলেন জানকীর মুগ্ধভাব। বললেন - ভগিনী,  আগামী চাঁদে শিবব্রত উদযাপন করব।  তুমি কাননের লতা কুটিরে এ কদিন বাস করো।  এর সৌন্দর্য উপভোগ করো।   অশোক কাননে কোনো শোক কষ্ট অসুখ প্রবেশ করতে পারেনা।  শিবের বর। আর যখন আমরা শিবের অনুগ্রহীত তখন এই কাননে আমরা সুরক্ষিত।

রানি মন্দোদরী জানকীর গলা জড়িয়ে ধরে বললেন - পিয় সহি,  আমার স্বামী তোমার অগ্রজ। বলো আজ এই উৎসব দিনে তোমার কিভাবে প্রীতিবিধান করতে পারি?  জানকী হাসলেন।  আপাতত ওই তামিল মহাবীর,  হনুমানকে এখানে ঢুকতে দেওয়া চলবেনা। সে ব্যাটা কিস্যু বোঝেনা , খামোখা মহা উত্পাত শুরু করবে । রানী হাসলেন । তাহলে রাম খবর পাবেন কিকরে ? সীতা মুখ নামিয়ে বললেন - উনি একটু বুঝুন যে অবাধ্য সহোদরকে এমন অন্যায়ে সায় দিতে নেই ।

সভ্যতার সংকট

দরবার ঘরে মন্ত্রী পরিবেষ্টিত হয়ে বসে আছেন দশানন । স্বর্ণ মানিক্যে মোড়া তাঁর দরবার ঘর । সিংহল রাজ্যে এখন মধ্যাহ্ন কাল । যশসূর্য মধ্যগগনে । দশানন তাঁর ক্ষুরধার মেধার সাহায্যে এই রাজ্যকে এক সমৃদ্ধ সভ্যতায় পরিণত করেছেন । তাঁর পূর্বপুরুষ তামিল রাজ্য থেকে বিতাড়িত হয়েছিলেন । এই দ্বীপরাজ্যের গরিমা এখন বিশ্বজোড়া ।
        তামিল রাজ্যে এখন দুই ভাইয়ের দ্বন্দ চলছে । ফল পোহাতে হচ্ছে প্রজাদের । বালী ও সুগ্রীব সমানে দ্বন্দ করছেন নিজেদের মধ্যে । অন্যদিকে কর্ণাট । তারাও সিংহলকে সমঝে চলে ।
      কিছুদিন হলো দশানন খবর পেয়েছেন তামিলদের এই দ্বন্দের সমাধানে এক আর্য্য নৃপতি এগিয়ে এসেছে । এই আর্য্যদের দেশ দখলের একটা প্রবণতা আছে । তিনি এদের মোটেই পছন্দ করেন না । কিন্তু তামিল সুগ্রীব নিজের স্বার্থে এই রাজাকে মিত্র পাতিয়েছেন ।
অথচ দশানন শুনেছেন আর্য্যরা তামিলদের বানর বলে ডাকে । কর্ণাটদের ভালুক । আর সিংহলিদের রাক্ষস । সিংহলিদের পরাক্রমকে ভয় পায় অথচ ব্যঙ্গ করতেও ছাড়েনা । আর কিইবা বলবেন দশানন ! তামিল সুগ্রীবই বা কিকরে এই রাজার সহায়তা নেয় ? তিনি তো জানেন কি ভীষণ বিজ্ঞানবুদ্ধি ধরে এই তামিল গুলো । শুধু ঝগড়া বিবাদ করেই নিজেদের দুর্বল করে ফেলেছে ।
         আজ মন্ত্রীসভায় বিশেষ আলোচনা ছিল কিভাবে আর্য্যদের সাম্রাজ্যবাদী গতিকে রোধ করা যায় । কারণ সিংহলের ধনসম্পদ তাদের লোভের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে । হঠাত ঝড়ের বেগে ঘরে প্রবেশ করল শুর্পনখা । এই ছোট বোনটির প্রতি রাজার অশেষ দুর্বলতা । রানী মন্দদোরী ও তাই নিয়ে রাজাকে মধুর ঠাট্টায় বিদ্ধ করেন । রাজা মুখ তুলে যথাসম্ভব গম্ভীর স্বরে জানতে চাইলেন কি ব্যাপার ? একটা জরুরি মিটিংএ এভাবে কেন ঢুকে আসা ? শুর্পনখা তার সুন্দর ভুরু তুলে নাকের পাটা ফুলিয়ে জানতে চাইল তারা ছ জন বন্ধু একটু সাগর পেরিয়ে ওপারে গিয়ে জঙ্গল সাফারি করতে চায় । রাজা স্তব্ধ । মানে ? ছটি দুগ্ধপোষ্য বালিকা ? কী প্রস্তাব !! অসম্ভব । ওই ভীষণ শ্বাপদসংকুল অরণ্যে মাত্র ছটি মেয়ে । অনুমতি মিলবেনা । শুর্পনখা মুখ লাল করে মাথা নীচু করে বলল - দাদা তুমি ভুল করছ । আমি বেশ কয়েকটা ক্ষেপণাস্ত্রতে ট্রেনিং নিয়েছি । বন্দুক চালানোর প্রশিক্ষণ তুমিই দিয়েছ । আর , ইয়ে , মানে তুমি নিজেই স্বীকার করেছ যে ও ব্যাপারটায় আমি নাকি তোমাকেও ছাড়িয়ে গিয়েছি । আমার বন্ধুরাও সব ট্রেইনড  । সো ? যাচ্ছি তো ? রাজা ইতিমধ্যেই রাঙা মুখে মাথা নত করেছেন । যাও , সাবধানে । বোন ঘর ছেড়ে যাওয়ার পর তলব করলেন সেনাপতিকে । সে ভদ্রলোক আবার শুর্পনখার গুণমুগ্ধ । সে তো এই অ্যাসাইনমেন্ট পেয়ে মহা খুশী । রাজা রাজকার্যে মন দিলেন ।

     গহীন বনে একটা বাঘের পেছনে ক্যমেরা বাগিয়ে দৌড়তে দৌড়তে শুর্পনখা দলছুট হয়ে পড়ল । এত ঘন বন যে পথ খুঁজে পেতে বেগ পেতে হচ্ছে । একটা ঝাঁকড়া গাছের তলায় বসে সে মাথা ঠান্ডা করে ভাবতে বসল । কিংকর্তব্যম অতঃপরম । এমন সময়ে গাছের পেছন থেকে সাদা রঙের এক অদ্ভুত দর্শন মানুষ বেরিয়ে এলো । শুর্প একটু ভয় পেলেও নাগরিক সভ্যতায় শিক্ষিত বলে জিজ্ঞেস করল আপনি কে ? কিন্তু ওই শ্বেত দৈত্য মনে হয় তার ভাষা বুঝলনা । আর অসভ্যও বটে । সে এগিয়ে এসেই হামলে পড়ল শুর্পর ওপর । কিন্তু শুর্পনখা আধুনিক অস্ত্রেশাস্ত্রে সুপণ্ডিত । এই শ্বেত দৈত্যকে পরাস্ত করতে বেশি সময় লাগল না ।
 
     ভরা দরবারে ক্রুদ্ধ দশানন বসে । এত বড় স্পর্ধা যে তাঁর ভগ্নীর বলাতকারের চেষ্টা ? এতো সেই অসভ্য আর্য্য রাজার ভাইটা । সেরকমই তো বলল সেনাপতি । সে নাকি নিজেদের এলাকায় বলে বেড়িয়েছে শুর্পনখার নাক কেটেছে । মানে তার সম্মানহানি করেছে । এখনো দশাননের ক্ষমতা তারা জানতে পারেনি ।

   মন্দদোরীর শত বাধা সত্ত্বেও রাজা ওই অসভ্য আর্য্য রাজার স্ত্রীকে বন্দী করে এনেছেন । দাসী করে প্রাসাদসংলগ্ন বাগানে বন্দী করে রেখেছেন ।
   মর্মে মর্মে বুঝুক তারা , পরিবারের মেয়েদের শ্লীলতাহানির আশঙ্কা থাকলে কেমন বোধ হয় ।