দ্যা ভেলট
রে ব্র্যাডবেরি

(অনুবাদ)

{ ভেলট - দক্ষিণ আফ্রিকার তৃণভূমি অঞ্চল। সিংহদের মুক্তাঞ্চল}


    -জর্জ, তোমার একবার নার্সারিটা দেখে আসা উচিত।                                                  
   -কেন? সেখানে আবার কি হলো?                                                                     
  -জানিনা...                                                                                     
   -আচ্ছা যাবো।                                                                                           
  -আমি বলতে চাইছি যে তুমি শুধু একবার দেখো, কিংবা একজন সাইকোলজিস্টকে এনে দেখাও।    
    -নার্সারি দেখে সাইকোলজিস্ট কি করবে?                                                                
  -তুমি ভালোই জানো কী তার করণীয়।
জর্জের স্ত্রী থেমে গেলেন। তার চোখের সামনে জ্বলন্ত স্টোভটা নিজে নিজেই তাদের রাতের খাবার বানাচ্ছে তখন।
 তিনি আবার বললেন -আসলে নার্সারিটা আর আগের মতন নেই।                                                
  -চলো এখনই একবার দেখে আসি।
তাদের হ্যাপিলাইফ হোমের হল ধরে তারা হাঁটতে শুরু করলেন।

এই বাড়িটা করতে তাদের তিরিশ হাজার ডলার খরচা হয়েছে। বাড়িটা তাদের খাওয়ানো, জামাকাপড় পড়িয়ে দেওয়া থেকে খাট দুলিয়ে ঘুম পর্যন্ত পাড়িয়ে দেয়। গান গায়, খেলা করে -আর- তাদের ভালো রাখে।

        তারা নার্সারির দশ ফুটের মধ্যে আসতেই কোথাও একটা সুইচ সেটা সেন্স করতে পারল। সামনে আলো জ্বলে উঠল। একইভাবে তাদের পেছনে ফেলে আসা ঘরগুলোতে ক্রমান্বয়ে আলো জ্বলতে ও নিভতে থাকল।
        -এবার? জর্জ জিজ্ঞেস করল।

তারা এখন নার্সারিতে দাঁড়িয়ে। শুকনো ঘাসখড়ের মেঝেতে দাঁড়িয়ে। চল্লিশ ফুট বাই চল্লিশ ফুট ঘরটা উচ্চতায় তিরিশ ফুট। সমস্ত বাড়িটা তৈরি করতে যা খরচ হয়েছে তার অর্ধেকটাই এই ঘরের পেছনে গেছে। তখন জর্জ ভেবেছিলেন ছেলেমেয়েদের জন্য এর চেয়ে ভালো কিছু হতে পারে না।
 নার্সারি ফাঁকা। গ্রীষ্মের প্রখর দুপুরে বনের মধ্যে একটুকরো ঘাসজমি যেন। দেওয়ালগুলো ফাঁকা। দ্বিমাত্রিক।

        লিডিয়া হ্যাডলি ঘরের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে। দেওয়ালগুলো তখন ঘড়ঘড়ে শব্দ তুলে পিছিয়ে যেতে থাকল। স্বচ্ছ দূরত্বে দেখা দিলো আফ্রিকার বনভূমি। ত্রিমাত্রিক। চারিদিকে ফুটে উঠল সেই রং, পাথরের নুড়ি, এমনকি এক একটা শুকনো ঘাস পর্যন্ত। মাথার ওপরের ছাদটা হয়ে দাঁড়ালো হলুদ সূর্যের ভীষণ উত্তাপে গলে যাওয়া আকাশ।
        জর্জ হ্যাডলি কপালে ঘাম ফুটে ওঠা টের পেলেন।
        -চলো আমরা এই রোদ্দুর থেকে যাই। এটা একটু বেশিই রিয়েল। তবে আমি অবিশ্যি এখনও সেরকম খারাপ কিছু দেখিনি।                                                                              
   - একটু দাঁড়াও। দেখতে পাবে। স্ত্রী বললেন।
এবার গন্ধ তৈরির যন্ত্রটা দুটো মানুষের দিকে উত্তপ্ত বনভুমির গন্ধ ছড়িয়ে দিলো। লায়ন গ্রাসের শুকনো খোড়ো গন্ধ। পাতার আস্তরণে ঢাকা পড়ে থাকা শ্যাওলা ভরা শীতল জলার গন্ধ। জানোয়ারের বুনো গন্ধ আর লাল লঙ্কার মতো ধুলো ওড়ার গন্ধ।
        এরপর শব্দ। দূর থেকে ছুটে আসা হরিণের দলের খুরের শব্দ। শকুনের উড়ন্ত পাখার আওয়াজ। আকাশে একটা ছায়া সরে গেল কি? ওপরে চেয়ে ছিলেন জর্জ। ছায়াটা তার ঘামে ভেজা মুখের ওপর সরে গেল।
        “নোংরা জন্তু”! তার স্ত্রীর গলা শোনা গেল।
        -ওগুলো শকুন।                                                                                     
        -দেখো, ওই দূরে, ওগুলো সিংহ। এখন ওরা জলার দিকে যাচ্ছিল। একটু আগেই খাওয়া শেষ করেছে। 
       বললেন লিডিয়া -কি জানি কি খাচ্ছিল!                                                            
  জর্জ হ্যাডলি মুখের ওপরে পড়া তীব্র রোদকে হাত দিয়ে আড়াল করে তেরছা চোখে দেখতে চেষ্টা করলেন দূরে                -কোনো জন্তু নিশ্চয়। জেব্রা বা জিরাফের বাচ্চা হবে।                                         
           লিডিয়ার গলায় আতঙ্ক -তুমি ঠিক জানো? ওগুলো জিরাফের বাচ্চা বা জেব্রা?                    
       জর্জের গলায় হাসি -না। নিশ্চিত জানার জন্য একটু দেরি হয়ে গেছে। ওখানে কটা হাড় ছাড়া আর কিছুই পড়ে নেই। কিছু যদি পড়ে থাকে সেই আশায় শকুনগুলো ঘোরাফেরা করছে।  
       -তুমি চিৎকারটা শুনেছিলে? লিডিয়া জিজ্ঞেস করলেন।                                               
       -না।                                                                                          
       -এই তো! এক মিনিট আগে!                                                                     
       -না শুনিনি।                                                                             
সিংহগুলো এগিয়ে আসছিল। আরও একবার এ ঘরের স্থপতিকে মনে মনে কুর্ণিশ করলেন। কী অদ্ভুত প্রতিভা! সব কিছুই অদ্ভুত অবিশ্বাস্য! খুব কম খরচেই এই ম্যাজিক ঘরটাকে পাওয়া গেছে। সত্যি বলতে, প্রত্যেকটা বাড়িতেই এরকম একটা ঘর থাকা উচিত। হ্যাঁ, একথা সত্যি যে মাঝে মাঝে এ ঘর তোমাকে চমকে দেবে, ভয় পাওয়াবে, তার অবিশ্বাস্য রকমসকম তোমাকে হতবাক করে দেবে, হঠাৎ বুকের মধ্যে ধক করে উঠবে, কিন্তু বেশির ভাগ সময়েই শুধু ছেলেমেয়েরা নয় তো, নিজেরাও যে কী মজা পাওয়া যায়! হঠাৎ এক অজানা দূরের দেশ ঘুরে আসা যায়। চকিতে দৃশ্যপট পাল্টায়।                                                      
   এই যেমন এখন! এই খুব কাছেই, মাত্র পনেরো ফুট দুরত্বের মধ্যে এসে গেছে সিংহগুলো। তারা এত জ্যান্ত যে হাতে তাদের গায়ের রোম অনুভব করতে পারা যাচ্ছে। মুখ ভরে যাচ্ছে ওদের গায়ের চামড়া থেকে উঠে আসা বুনো  গন্ধে। সে চামড়ার উজ্জ্বল হলুদ যে কোনো দামী ফরাসী আসবাবের থেকে ঠিকরে পড়া রঙের মতোই ঝকঝকে। সিংহ ও ভেলটের হলুদ, সিংহের নিঃশ্বাস থেকে উঠে আসা মাংসের গন্ধ, তাদের লালা গড়িয়ে পড়ার গন্ধ, সব সব। সব বড় বেশি জ্যান্ত।
        সিংহগুলো হিংস্রভাবে তাদের হলদেসবুজ চোখ নিয়ে একদৃষ্টে জর্জ আর লিডিয়ার দিকে তাকিয়েছিল। 
    -সাবধান! চিৎকার করল লিডিয়া।   সিংহগুলো ওদের দিকেই ছুটে আসছিল।                  
      লিডিয়া আঁতকে উঠে ছুটতে শুরু করলেন। জর্জ তাকে অনুসরণ করলেন।
দরজা দিয়ে বেরিয়ে এসে জর্জ অদ্ভুতভাবে হাসছিলেন আর লিডিয়া ঝরঝরিয়ে কাঁদছিলেন। দুজনেই দুজনের দিকে চেয়ে ভয় পেয়েছেন।                                                                            
   -জর্জ!                                                                                          
  -লিডিয়া!                                                                                       
  -ওরা আমাদের আর একটু হলেই ধরে ফেলেছিল জর্জ!                                             
  -দেওয়াল লিডিয়া দেওয়াল। ব্যাস, এর বেশি কিছু নয়। স্বচ্ছ কাঁচের দেওয়াল। স্বীকার করতেই হবে যে ভীষণ জ্যান্ত। কী অদ্ভুত! তাই না? কিন্তু এই দেওয়ালগুলো আসলে অতিপ্রতিফলনক্ষম, অতিসক্রিয়, রঙিন ফিল্ম মাত্র। মেন্টাল টেপ। মানসিক চলচিত্র বলতে পারো, যা ওই কাঁচের দেওয়ালে ফুটে উঠছে। পুরোটাই গন্ধ ও শব্দ এনে নিখুঁত যান্ত্রিক ছবি, লিডিয়া।  নাও, রুমালটা ধরো। চোখ দুটো মুছে ফ্যালো দেখি।                  

ততক্ষণে বন্ধ দরজার এপারে দাঁড়িয়ে থাকা জর্জের গায়ে শরীরটা ছেড়ে দিয়েছেন লিডিয়া। তখনও সমানে কেঁদে চলেছেন।                                                                                        
-আমার ভয় করছে জর্জ। তুমি দেখেছ? ওগুলো যেন বড্ড বেশি রিয়েল! তুমি বুঝতে পারোনি?        
-আচ্ছা আচ্ছা। লিডিয়া...                                                                        
 -তোমাকে ওয়েন্ডি আর পিটারকে বারণ করতেই হবে জর্জ। ওরা যেন আর আফ্রিকার বিষয়ে কিছু না পড়ে।              -হ্যাঁ হ্যাঁ। জর্জ স্ত্রীকে আশ্বাস দেন।                                                           
   -প্রমিস?                                                                                       
  -হ্যাঁ রে বাবা, প্রমিস।                                                                            
  -এখন তুমি এই নার্সারির দরজাটা লক করে দাও তো। অন্তত ততদিন, যতদিন না আমি পুরোপুরি ভয়টা কাটিয়ে উঠি।                                                                                       
 -তুমি তো জানো পিটার কী করে! মাস খানেক আগে ওকে শাস্তি দিতে দরজাটা আমি মাত্র কয়েক ঘণ্টা বন্ধ রেখেছিলাম। আর ওঃ! কি গোলমালটাই না করেছিল! ওয়েন্ডিও। ওই নার্সারিটা ওদের প্রাণ।       
  -এটা এখন বন্ধ থাকবে, ব্যাস।                                                                  
  -ঠিক আছে।                                                                             
 জর্জ বাধ্য হয়েই বিশাল দরজাটা লক করে। তারপর বলে -তোমার একটু বিশ্রাম দরকার। বড্ড চাপ পড়েছে মনে হচ্ছে।                                                                                          
  -জানিনা। সত্যি জানিনা। লিডিয়া ওর নাকটা মুছে নিয়ে একটা চেয়ারে বসে পড়ল। চেয়ারটা নিজে থেকেই ওকে শান্ত করতে দুলতে লাগল।                                                                                                                                                                      
   -হয়তো আমার তেমন কোনো কাজই নেই। কিংবা দুশ্চিন্তা করার জন্য অপর্যাপ্ত সময় আছে হাতে। চলো না আমরা বাড়ি বন্ধ করে ক’দিনের জন্য কোথাও ঘুরে আসি? লিডিয়া বললেন।                       
  -তুমি তার মানে আমাকে ব্রেকফাস্টে ডিম ভেজে দিতে চাইছ।
        -হ্যাঁ।                                                                                       
     -আমার মোজা কেচে দিতে চাইছ?                                                                        
    -হ্যাঁ। জলে ভেজা চোখ নিয়ে মাথা নাড়েন লিডিয়া।                                                 
     -বাড়ি পরিষ্কার করতে চাইছ?                                                                    
     -হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ!                                                                                    
    -কিন্তু আমরা তো এই জন্যেই বাড়িটা কিনেছিলাম, তাই না? যাতে আমাদের কিছুই না করতে হয়?   
    -হুঁ।  কিন্তু এখন আমার মনে হচ্ছে এ বাড়ি আমার নয়। আমার এখানে কোনো প্রয়োজন নেই। এ বাড়ি নিজেই এখন একাধারে স্ত্রী মা ও নার্সের ভুমিকা পালন করছে। আচ্ছা, বলো তো? আমি কি আফ্রিকার অরণ্যের প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারি? আমি কি অটোমেটিক স্ক্রাবের মতো অল্প সময়ে নিপুণভাবে বাচ্চাদের চান করাতে পারি? পারিনা। আর ভয়টা শুধু আমি নয়, তুমিও পাচ্ছো জর্জ। আমি লক্ষ করেছি। কিছুদিন হল তুমিও ভয় পাচ্ছো। 
                                                                                 
    -আমি মনে হয় একটু বেশিই স্মোক করছি আজকাল।                                            
   -তোমাকে দেখে মনে হয় তুমি যেন জানোই না তোমার কী কাজ আছে। প্রতিদিন সকালে তুমি একটু বেশি স্মোক করো। বিকেলে একটু বেশি ড্রিঙ্ক করো। রাতে তোমার একটু বেশি ডোজের ঘুমের ওষুধ লাগছে। এ বাড়িতে তোমারও নিজেকে অপ্রয়োজনীয় লাগছে নিশ্চয়।                                                 
      -তাই? জর্জ যেন নিজের ভেতরে একবার দেখে নিতে চাইলেন।                              
  লিডিয়া একবার নার্সারিটার দিকে চাইলেন।                                                   
      -ওঃ জর্জ! সিংহগুলো ওখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারবেনা তো?                          
   জর্জ দেখলেন নার্সারির দরজাটা ভীষণভাবে কাঁপছে। যেন কেউ খুব জোরে ধাক্কা দিচ্ছে দরজাটা।             
  -নিশ্চয় নয়। তিনি উত্তর দিলেন।

        রাতের খাবার জর্জ আর লিডিয়া একাই খেতে বসলেন। শহরের আর এক প্রান্তে একটি বিশেষ প্লাস্টিক মেলা বসেছে। ওয়েন্ডি আর পিটার সেখানে গিয়েছে। টেলিভিশানের পর্দায় এসে তারা জানিয়ে গিয়েছে যে তাদের দেরি হবে। জর্জ আর লিডিয়া যেন খেয়ে নেন।    
        ডাইনিং রুমে টেবিল তখন তার ভেতর থেকে যান্ত্রিকভাবে হাজির করছিল গরমাগরম সব পদ।       
   -আমরা সস নিতে ভুলে গিয়েছি। জর্জ বললেন।                                            
  টেবিলের ভেতর থেকে একটা নীচু গলা ভেসে এলো -দুঃখিত। সস এসে গেলো টেবিলে।


জর্জ তখন ভাবছেন, নার্সারিটা কিছুদিন বন্ধ রাখলে বাচ্চাদের এমন কিছু ক্ষতি হবেনা। যে কোনো জিনিসই মাত্রা ছাড়ালে ক্ষতিকর হয়। আর দেখাই যাচ্ছে বাচ্চারা আফ্রিকা নিয়ে একটু বেশিই মাথা ঘামিয়েছে। ওই প্রখর রোদ! তিনি যেন তখনও ঘাড়ে সেই রোদের থাবা টের পাচ্ছেন। আর সিংহগুলো? রক্তের গন্ধ! তবে এটা সত্যিই অদ্ভুত। দেখার মতো। বাচ্চাদের মনের গতিপ্রকৃতি টেলিপ্যাথি দিয়ে নার্সারি কী নিখুঁত ধরেছে। ওদের ইচ্ছে অনুসারে প্রত্যেকটা জিনিসকে জীবন্ত করে তুলেছে। বাচ্চারা জেব্রার কথা ভেবেছে, তো জেব্রা হাজির। রোদ্দুর তো রোদ্দুর। জিরাফ তো জিরাফ। মৃত্যু – তো মৃত্যু!!
      
  হ্যাঁ! ওই শেষ ভাবনাটা! টেবিলের দেওয়া মাংসের টুকরোটা বিস্বাদভরে চিবোতে চিবোতে জর্জ ভাবলেন। মৃত্যু চিন্তা! এর জন্য কিন্তু বাচ্চারা বড্ডই ছোট। পিটার আর ওয়েন্ডি। কিংবা হয়তো কখনই খুব ছোট নয়!

        তোমার জানার অনেক আগেই হয়তো তুমি কারোর মরণ চাইছ! ধরো, তুমি যখন দু বছরের বাচ্চা তখনও তো তুমি খেলনা বন্দুকের ক্যাপ ফাটিয়ে লোককে মারতে চেয়েছ!
        কিন্তু আফ্রিকার অরণ্যে সিংহের মুখের মধ্যে এই মৃত্যু –বারবার ঘুরে ফিরে মনে পড়তে থাকল।
       
  -কোথায় যাচ্ছ?

জর্জ লিডিয়ার প্রশ্নের উত্তর করলেন না। অন্যমনস্কভাবে নিজের চিন্তায় ডুবে তিনি নার্সারির দিকে পা বাড়ালেন। তার সামনের হলওয়েতে আলোগুলো জ্বলে উঠতে লাগল। আর পেছনের গুলো নিভতে লাগল আপনাআপনি। দরজায় কান পেতে তিনি শুনতে লাগলেন দূরে কোথাও সিংহ ডাকছে।                             

  দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই তিনি দূরে একটা আর্তনাদ শুনতে পেলেন। পরক্ষণেই সিংহের ভয়াল গর্জন সেই আর্তনাদকে চাপা দিয়ে দিলো।                                                                   

   তিনি আফ্রিকার অরণ্যে দাঁড়িয়ে। গত বছর এই নার্সারিতে তিনি যে কতবার ওয়ান্ডারল্যান্ড, এলিস, মকটার্টল, আলাদীন ও তার জাদু চিরাগ, অথবা জ্যাক, ওজে়র পাম্পকিনহেড, বা ডক্টর ডু লিটলকে দেখেছেন! একেবারে সত্যি চাঁদের মতন চাঁদের ওপরে গরুকে লাফাতে দেখেছেন! একটা সুন্দর কল্পনার মনোরম প্রতিচ্ছবি। কতদিন যে এই কৃত্রিম আকাশে পেগেশাসকে উড়তে দেখেছেন! দেখেছেন রঙিন আতসবাজির বাহার। শুনেছেন পরীদের গলায় মিষ্টি গান।                                                   
       কিন্তু এখন? এই উত্তপ্ত গনগনে উনুনের মতো আগুনে আফ্রিকা তার সব খুনখারাপি নিয়ে কী করে এলো এখানে?
       
    হয়তো লিডিয়াই ঠিক। হয়তো তাদের একটা ছুটি দরকার। এই কল্পনার জগতের অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি রকমের বাস্তব থেকে তাদের বাচ্চাদের একটু অব্যাহতি দরকার।
        হ্যাঁ এটা ঠিক যে, মনেরও একটা অনুশীলন লাগে। কল্পনাকেও চর্চা করতে হয়। কিন্তু তাই বলে শিশুর মনে এরকম কল্পনা কি করে এলো? কবে থেকে?...
        এখন মনে পড়ছে। গত সারাটা মাস ধরে তিনি কখনও সিংহের গর্জন শুনতে পেয়েছেন, কখনও বা তার স্টাডির দরজা ভেদ করে নাকে এসে লেগেছে তাদের গায়ের চড়া বুনো গন্ধ। হয়তো ব্যাস্ততার কারণেই তিনি এসব আমল দেননি।
        একা একা জর্জ আফ্রিকার তৃণভুমিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সিংহগুলো খাওয়া ছেড়ে তাকে লক্ষ করছিল। এই পুরো কাল্পনিক দৃশ্যাবলীর মধ্যে একটাই ত্রুটি রয়ে গেছে। তা হলো, জর্জের পেছনে খোলা দরজাটা দিয়ে তিনি তার স্ত্রীকে ছবির মতো দেখতে পাচ্ছেন। অন্ধকার হলের শেষে ডাইনিং টেবিলে বসে লিডিয়া রাতের আহার সারছেন।        
                
 সিংহগুলোর দিকে চেয়ে জর্জ বলে উঠলেন -যাও! সিংহগুলো এক ফোঁটা নড়ল না।           
    তিনি এঘরের ব্যাপারটা জানেন। তুমি তোমার চিন্তাকে পাঠাও। সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো ফুটে উঠবে।
“আলাদীন তোমার জাদু চিরাগ নিয়ে এসো” জর্জ চেঁচিয়ে উঠলেন। কিন্তু ভেলট যেমনকার তেমনই রইল। সঙ্গে সিংহগুলোও। “ওঃ! আমি আলাদীনকে চাইছি!” তিনি আবার বলে উঠলেন নার্সারিকে। উলটে সিংহগুলো তাদের রোদে তেতে যাওয়া চামড়ার মধ্যে থেকে গরগর করে উঠল।

“আলাদীন?!”
জর্জ ডিনার টেবিলে ফিরে এলেন।                                                             
       -ঘরটার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। কোনো কথাই শুনছে না।                                                -         বা...। লিডিয়া বিড়বিড় করলেন।                                                                      
      - বা—কি?                                                                                     
      -বা ও কথা অনুযায়ী কাজ করতে পারছেনা। এতদিন ধরে বাচ্চারা ওখানে আফ্রিকার কথা, সিংহ আর তাদের শিকারের কথা ভেবেছে যে ওর মাথা গুলিয়ে গেছে।                                                   
    -হতে পারে।                                                                                  
   - কিংবা পিটার হয়তো ওকে এভাবেই প্রোগ্রাম করে রেখেছে।                                    
    -প্রোগ্রাম করে রেখেছে?                                                                     
       -ও হয়তো মেশিনপত্র নেড়েচেড়ে ওরকমই কিছু করে রেখেছে।                                
     -পিটার মেশিন সম্পর্কে কিছুই জানেনা।                                                         
      -দশ বছরের তুলনায় ও বেশ বুদ্ধিমান। ওর আই কিউ...                                           
      -হলেও। জর্জ থামিয়ে দেন স্ত্রীকে।

        হ্যালো মা, হ্যালো বাবা।

        বাচ্চারা ফিরেছে। সামনের দরজা দিয়ে ঢুকে আসছে ওয়েন্ডি আর পিটার। ওদের গোলাপি গাল, চকচকে মার্বেলের মতো নীল চোখ। হেলিকপ্টারে চড়ার কারণে গায়ের পোশাক থেকে বেরিয়ে আসা তাজা ওজোনের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে।

        জর্জ আর লিডিয়া একসঙ্গে বলে উঠলেন -বাঃ! একদম ঠিক সময়ে এসে পড়েছ। বসে যাও খেতে।               কিন্তু বাচ্চারা হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে রইল -আমরা অনেক হট ডগ আর স্ট্রবেরি আইসক্রিম খেয়েছি। পেট ভরা। তবু বসছি।                                                         
      -বোসো তবে। বলো। আমাদের নার্সারির গল্প বলো। জর্জ বলে উঠলেন।                        
    ভাইবোন তাকে অবাক হয়ে দেখে একে অপরের দিকে চাইল -নার্সারি?                            
    -আফ্রিকা আর বাকি যা কিছু আর কি! জর্জ গলায় একটা মেকি উচ্ছ্বাস আনলেন।                  
    -আমি বুঝতে পারছিনা। পিটার উত্তর দিলো।                                                   
   -তোমাদের মা আর আমি এখুনি আফ্রিকা থেকে ঘুরে এলাম। টম সুইফট আর ইলেকট্রিক লায়নদের সঙ্গে।                                                                                                
     -কিন্তু নার্সারিতে তো আফ্রিকা নেই? পিটার সহজ সুরে বলল।                                 
     -ওঃ পিটার! আমরা জানি!                                                                   
      -আমার কোনো আফ্রিকার কথা মনে পড়ছে না। ওয়েন্ডি তোমার মনে পড়ছে?                    
      -না। ওয়েন্ডি উত্তর দিলো।                                                                  
      -আচ্ছা একবার দৌড়ে যাও তো। দেখে এসো।                                            
পিটারের কথা শেষ হতে না হতেই ওয়েন্ডি উঠে দাঁড়িয়ে পা বাড়ালো।                                    
     -ওয়েন্ডি যেও না! জর্জ চিৎকার করলেন। কিন্তু ততক্ষণে সে চলে গিয়েছে। হলওয়ের আলোগুলো যেন জোনাকির মতো তাকে তাড়া করেছে।    
                                    
আঃ দেরি হয়ে গেছে। জর্জের মনে পড়ল শেষবার ঘরটা দেখে আসার পর তিনি দরজাটা বন্ধ করতে ভুলে গিয়েছেন।                                                                                         
     -ওয়েন্ডি দেখে এসে আমাদের জানাচ্ছে। পিটার আশ্বস্ত করল।                            
     -ওর কাছে কিছু জানার নেই। আমি নিজের চোখে দেখে এসেছি। জর্জ বিরক্ত।               
      -তুমি ভুল করছ বাবা।                                                                      
      -না ভুল করিনি। যাক গে ছাড়ো।                                                    
      ওয়েন্ডি ফিরে এসেছে। হাঁপাতে হাঁপাতে সে বলল -কই? আফ্রিকা তো নেই ওখানে?             
       জর্জ উঠে দাঁড়ালেন -চলো একসঙ্গে গিয়ে দেখা যাক।

সকলে মিলে নার্সারির দরজা খুলতেই দেখা গেল সুন্দর সবুজ বনানী, বেগুনি পাহাড়, আর গাছের ফাঁকে ফাঁকে তার লম্বা চুলে উড়ন্ত প্রজাপতির আলপনা নিয়ে গান গাইছে রীমা। অপূর্ব সে সুর!                     

     আফ্রিকার নৃশংস ভেলট অদৃশ্য। সিংহগুলো গায়েব। এখন তার বদলে রীমা। এমন মধুর সুরে সে গান গাইছে যে চোখে জল এসে যায়।                                                             
        জর্জ বাচ্চাদের দিকে ফিরলেন -যাও। শুতে যাও এবার। তারা কিছু বলতে চাইছিল, কিন্তু জর্জ রুক্ষ স্বরে বলে উঠলেন -শুনতে পেয়েছ কি বলেছি? তারা এয়ারক্লোজেটের দিকে চলে গেল। শুকনো পাতা উড়িয়ে নেওয়ার মতো এক হাওয়ার ঘূর্ণি তাদের যেন গিলে ফেলল। তারা শোবার ঘরে পৌঁছে গেল।             

       জর্জ তখন সেই মনোরম বনাঞ্চলে হাঁটছিলেন। একটু আগে যেখানে সিংহরা ঘোরাঘুরি করছিল ঠিক সেইখানে কিছু একটা দেখতে পেয়ে কুড়িয়ে নিলেন। তারপর ফিরে এলেন স্ত্রীর কাছে।                  
        -এটা কি? লিডিয়া জিজ্ঞেস করলেন।                                                     
        -আমার একটা পুরনো ওয়ালেট। তিনি লিডিয়াকে দেখালেন। ওটা থেকে তপ্ত ঘাস ও সিংহের গায়ের বুনো গন্ধ আসছিল। সিংহের লালা লেগেছিল চিবোনো ওয়ালেটটার গায়ে। দুদিকে লেপটে ছিল রক্ত।
        জর্জ নার্সারির দরজাটা শক্ত করে বন্ধ করে তালা দিয়ে দিলেন।

সেদিন মধ্যরাতেও জর্জ জেগে। বুঝতে পারছেন লিডিয়াও জেগে।                                      
       -তোমার কি মনে হয়? ওয়েন্ডি বদলে দিয়েছে দৃশ্যটা? অবশেষে লিডিয়া জিজ্ঞেস করলেন।      
      -অবশ্যই।                                                                                  
     -এই ভয়ংকর ভেলটের বদলে সুন্দর বনাঞ্চল আর সিংহের বদলে রীমাকে এনেছে?               
    -হুঁ।                                                                                         
    -কেন?                                                                                     
     -জানিনা। তবে যতক্ষণ না জানা যাচ্ছে ততক্ষণ নার্সারি বন্ধ থাকবে।                           
     -তোমার ওয়ালেটটা ওখানে গেল কি করে?                                                     
     -আমি কিচ্ছু জানিনা। তবে আমার খারাপ লাগছে ভেবে যে আমি বাচ্চাদের জন্যই ওই ঘরটা তৈরি করেছিলাম। এখন বাচ্চারাই যদি এরকম অদ্ভুত হয়ে যায় তবে ঘরটা...                             
     -ঘরটা ওদের এধরণের পাগলামি থেকে বাঁচাতেই তৈরি করা হয়েছিল।                          
    -আমাকে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। জর্জ ওপরে ছাদের দিকে চেয়ে রইলেন।                       
    -ওরা যা চেয়েছে আমরা সব দিয়েছি। এই কি তার প্রতিদান? অবাধ্য মিথ্যেবাদী বাচ্চা?              
    -কে যেন বলেছিল? বাচ্চারা আসলে কার্পেটের মতো, মাঝে মাঝে ওদের মাড়িয়ে চলা উচিত? আমরা কখনও ওদের গায়ে হাত তুলিনি। স্বীকার করতেই হয় যে ওরা অসহ্য হয়ে উঠেছে। যখন খুশি বাড়িতে ঢোকে, বেরোয়। এমন হাবভাব যেন আমরাই ছেলেপিলে। নষ্ট হয়ে গেছে ওরা। আমরাও।                        
    -কয়েক মাস আগে যেদিন তুমি ওদের রকেটটা নিয়ে নিউ ইয়র্কে যেতে বারণ করেছিলে, ঠিক তার পর থেকেই ওরা এরকম অসভ্যের মতো ব্যবহার করছে।                                                   
    -আমি ওদের বলেছিলাম যে ওরা অতটাও বড়ো হয়নি।                                         
     -যাই হোক, তারপর থেকেই ওদের ব্যবহার এমন শীতল।                                           
     -কাল সকালে একবার ডেভিড ম্যাক্লিনকে ডাকবো ভাবছি। আফ্রিকা দেখাতে।                           
    -কিন্তু ওটা তো এখন আর আফ্রিকা নেই! ওটা তো এখন গ্রীন ম্যানসন্স কান্ট্রি আর রীমা!         
     -আমার মনে হচ্ছে সকালে ওটা আবার আফ্রিকা হয়ে যাবে।
খানিকক্ষণ পর আর্তনাদ ভেসে এলো। নীচ থেকে দুটো মানুষের মরণ চিৎকার ভেসে এলো। আর তারপরই সিংহের ক্রুদ্ধ গর্জন।                                                                                   
      -ওয়েন্ডি আর পিটার ওদের ঘরে নেই। লিডিয়া বললেন।                                   
       -না। জর্জের বুক কাঁপছে । -ওরা দরজা ভেঙে নার্সারিতে ঢুকেছে।                                   
      -ওই আর্তনাদ—বড্ড চেনা গলাগুলো।                                                         
     -তাই?                                                                                      
    -হ্যাঁ। ভীষণ রকম চেনা...
আপ্রাণ চেষ্টায়ও পরের একঘণ্টায় জর্জ ও লিডিয়া ঘুমোতে পারলেন না। বাতাসে সিংহের বুনো গন্ধ ভেসে রইল।
***


-বাবা? পিটারের গলা।                                                                       
 -বলো।
পিটার নিজের জুতোর দিকে চেয়ে আছে। সে তার বাবা মায়ের মুখের দিকে আর তাকায় না।        
 -তুমি নিশ্চয় নার্সারিটা বরাবরের মতো বন্ধ রাখছ না?                                        
 -ওটা নির্ভর করছে                                                                         
 -কিসের ওপর? পিটারের গলা রুক্ষ।                                                          
 -তোমার আর তোমার বোনের ওপর। যদি তোমরা ওকে সুইডেন ডেনমার্ক বা ধরো চীন দিয়েও বদলে দিতে পারো--                                                                                
     -আমরা জানতাম ওখানে আমরা ইচ্ছেমতো থাকতে পারি।                                                            -নিশ্চয়! তবে মাত্রা ছাড়া ইচ্ছেতে নয়।                                                       
   -আফ্রিকায় অসুবিধে কি?                                                                                                -আচ্ছা! তাহলে স্বীকার করছ যে তুমিই ওখানে আফ্রিকাকে তৈরি করেছ?                       
একথার উত্তর না দিয়ে পিটার বলল -আমি নার্সারিটা বন্ধ দেখতে চাইনা। কখনই নয়।                                 -সত্যি বলতে আমরা গোটা বাড়িটা বন্ধ রেখে মাসখানেকের জন্য কোথাও বেরিয়ে পড়তে চাইছি। একবার অবাধে বেঁচে নেওয়া যাক। জর্জ ঘোষণা করলেন।                                                  
-ভয়ংকর শোনাচ্ছে! তার মানে আমাকে নিজে জুতো বাঁধতে হবে? দাঁত নিজে ব্রাশ করতে হবে? এমনকি চানটাও নিজে করে নিতে হবে?                                                               
    -তোমার মনে হয়না এই চেঞ্জটা মজার হবে?                                                  
   -না! এটা ভয়ংকর! আগের মাসে তুমি যখন আমার ছবি আঁকার মেশিনটা নিয়ে নিয়েছিলে, আমার ভালো লাগেনি!                                                                                    
      -আমি চেয়েছিলাম তুমি নিজে নিজে আঁকতে শেখো।                                                                -আমি দেখা শোনা আর শোঁকা ছাড়া আর কিছুই করতে চাইনা। আর করবার আছেটাই বা কি?             

    -যাও তবে। আফ্রিকায় গিয়ে খেলো।                                                      
    -তুমি কি সত্যিই বাড়িটা বন্ধ করে কোথাও যাবে?                                                                    -ভেবে দেখবো।                                                                                               -আমার মনে হয় এটা নিয়ে আর না ভাবাই উচিত।                                                                    -নিজের ছেলের থেকে আমি হুমকি শুনবো না।                                                   
   -ঠিক আছে।
পিটার নার্সারির দিকে হাঁটা লাগালো।
***

        “কী? ঠিক সময় মতন এসেছি তো?” ডেভিড ম্যাক্লিন এসে পড়েছেন।                                                 -ব্রেকফাস্ট? জর্জ জিজ্ঞেস করলেন।                                                        
       -খেয়ে এসেছি। তুমি সমস্যাটা বলো।                                                                
        -ডেভিড, তুমি তো সাইকোলজিস্ট।                                                           
        -তাই তো জানতাম।                                                                        
      -একবার চলো তো। নার্সারিটা দেখবে। বছর খানেক আগে যখন এসেছিলে তখন কি তুমি ওর মধ্যে কোনো অস্বাভাবিকত্ব লক্ষ করেছিলে?                                                           
      -নাঃ। তেমন কিছু নয়। খুব স্বাভাবিক হিংসের প্রবৃত্তি কিছু। এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কিছু অস্বাভাবিক ঘটনা, যা বাচ্চাদের জন্য খুবই স্বাভাবিক। বিশেষত সেই সব বাচ্চা যারা বাবা মায়ের কঠোর শাসনে থাকে। শাস্তি পায় প্রায়ই। কিন্তু সত্যিই তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়।
        খেতে খেতে জর্জ বলছিলেন -আমি নার্সারিটা তালা দিয়ে দিয়েছিলাম। বাচ্চারা রাতে সেই তালা ভেঙে নার্সারিতে ঢুকেছে। আমি ওদের ওখানে থাকতে দিয়েছি যাতে তুমি ওদের তৈরি পরিবেশটা দেখতে পাও।

নার্সারি থেকে প্রচণ্ড চিৎকার ভেসে আসছিল।

        -দেখো। শোনো। কি মনে হচ্ছে তোমার? জর্জ জানতে চাইলেন।
ওরা ছেলেমেয়েদের না জানতে দিয়েই এসে পড়লেন নার্সারিতে। চিৎকার নিস্তেজ হয়ে আসছে। সিংহগুলো তখন খাচ্ছে।

        -বাচ্চারা একটু বাইরে যাও তো। জর্জ বললেন -না, দেওয়ালের ছবিগুলো বদলে দিও না। ওগুলো ওরকমই থাক।
ওরা চলে যাওয়ার পর জর্জ আর ডেভিড লক্ষ করলেন সিংহগুলো পরম সুখে খাচ্ছে।
        -ওরা কী শিকার করেছে বুঝতে পারলে ভালো হতো। কখনও কখনও আমি পরিষ্কার দেখতে পাই। কি মনে হয় তোমার? যদি ভালো বাইনোকিউলারটা আনতাম…। জর্জ বললেন।
        ডেভিড শুকনো হাসলেন -দেখতে পেতে না।                                              
  তারপর চারিদিকের দেওয়ালগুলো দেখতে দেখতে জিজ্ঞেস করলেন -কতদিন চলছে এমন?                                    -মাসখানেকের কিছু বেশি।                                                                   
     -এটা সত্যিই ভালো লাগছেনা জর্জ।                                                          
      -আমি তথ্য চাই। তথ্য প্রমাণ। তুমি কেমন বোধ করছ তা জানতে চাইনি।                           
      -জর্জ, একজন সাইকোলজিস্ট সারাটা জীবনে কখনও তথ্য যাচাই করেনা। সে শুধু অনুভূতির কথাই শোনে। জানি, আবছা বিষয়। আমি শুধু এটুকুই বলতে পারি—ভালো লাগছেনা। আমার অনুভূতির বিশ্লেষণে ভরসা রাখো জর্জ। খারাপ কিছু বুঝতে পারি। এখানে যেমন ভীষণ ভীষণ খারাপ লাগছে। আমার নিদান এই, যে, বাড়িটা এই মুহূর্তে ভেঙে গুঁড়িয়ে দাও আর ছেলেমেয়েদের প্রতিদিন আমার কাছে নিয়ে এসো। ওদের চিকিৎসার দরকার।
        -অবস্থাটা কি এতটাই খারাপ ডেভিড?                                                      
        -হ্যাঁ জর্জ। খুব খারাপ। নার্সারিটা তৈরি করার আসল উদ্দেশ্য ছিল যে বাচ্চাদের ভাবনার জগতের প্রতিফলনটা এখানে থেকে যাবে। অবসরে এসে সেসব দেখে আমরা বাচ্চাদের সঠিক সাহায্য করতে পারব। এখন তো এ ঘর ধ্বংসাত্মক চিন্তাভাবনার যন্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে! বাচ্চাদের আজেবাজে চিন্তাগুলোর আর মুক্তি ঘটছে না!                                                                                         
       -তুমি আগে এটা অনুভব করোনি?                                                         
        -আমি শুধু বুঝেছি যে তুমি ছেলেমেয়েদের মাত্রার অতিরিক্ত নষ্ট করেছ। আর এখন তুমি তাদের কন্ট্রোল করতে চাইছ। কি ভাবে হবে জর্জ?                                                   
      -আমি ওদের নিউ ইয়র্ক যেতে দিইনি।                                                      
       -আর?                                                                                     
     -আর বাড়ি থেকে কয়েকটা মেশিন সরিয়ে দিয়েছিলাম। হোম ওয়ার্ক শেষ না হলে নার্সারির দরজা বন্ধ থাকবে, এই বলে দরজাটা বন্ধ করে রেখেছিলাম। আমি বোঝাতে চেয়েছিলাম যে কোনোমতেই অবাধ্য হওয়া যাবেনা।                                                                                            
     -আঃ হা!!                                                                                    
     -কি হলো ডেভিড?                                                                         
      -কি আর? আগে ওদের একজন সান্টা ক্লজ ছিল, আর এখন স্কুর্জ। বাচ্চারা সান্টাকে ভালোবাসে। এই বাড়িটা দিয়ে তুমি ওদের বাবামায়ের ভালোবাসার একটা বিকল্প দিয়েছিলে। এখন এটাই ওদের বাবা মা। তোমার আর লিডিয়ার চেয়ে অনেক বেশি আপন। আর এখন তুমি এসেছ এটা বন্ধ করে দিতে? কোনো ভুল নেই এই ঘরের আনাচে কানাচে এত ঘৃণা ছড়িয়ে আছে। দেখো? আকাশটা কী ভীষণ উত্তপ্ত! রোদটা গনগনে! জর্জ, তোমাকে এবার জীবনের ধারাটা বদলাতে হবে। অনেকের মতোই তুমিও শুধু আরাম খুঁজেছ জীবনে। কাল যদি তোমার রান্নাঘরে কিছু বিকল হয় তবে তো না খেয়ে মরবে! তুমি একটা ডিম পর্যন্ত নিজে ভাজতে জানো না! বন্ধ করো সব! এখনই! নতুন করে শুরু করো। সময় লাগবে। কিন্তু বছর খানেকের তোমার বাচ্চারা স্বাভাবিক হয়ে উঠবে।                                                                            
      -কিন্তু হঠাৎ করে নার্সারিটা বন্ধ করে দিলে বাচ্চারা বড্ড আঘাত পাবেনা?                        
      -আমি চাইনা ওরা এখানে আর ঢুকুক। ব্যাস।

সিংহরা রক্তলাল মাংসের আহার শেষ করেছে। এখন অদূরে দাঁড়ানো মানুষগুলোকে দেখছিল।                

    ডেভিড অস্বস্তি অনুভব করছেন বেশ। বলে উঠলেন -চলো, এখান থেকে বেরোই। এবার মনে হচ্ছে আমিই যেন শাস্তি পাচ্ছি। কখনও এই ঘরের কথা এমন করে ভাবিনি।                            
     -সিংহগুলোকে একেবারে জ্যান্ত মনে হচ্ছে না? জর্জ জিজ্ঞেস করলেন। আচ্ছা ওরা কি--?           
     -কি?                                                                                       
     -সত্যিই জ্যান্ত হয়ে উঠতে পারে?                                                             
     -জানিনা। মনে হয়না।                                                                        
     -ধরো মেশিনে যদি কোনো কারসাজি বা ত্রুটি থাকে?                                     
     -না।
    ওরা দরজার দিকে এগোলেন। হঠাৎ জর্জ বলে উঠলেন -আমার কেমন মনে হচ্ছে এই বন্ধ থাকাটা ঘরটা নিজেও পছন্দ না করতে পারে।                                                                      
     -কোনো কিছুই মরতে চায় না। ঘরটাও নয়। ডেভিড উত্তর দিলেন।                                  
     -কি জানি? এটা কি তবে সুইচ অফ করে দিলে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠবে?                            
      -ঘরটার চারিদিকে একটা ক্ষিপ্ত আবহাওয়া। তুমি তাকে একটা জান্তব হিংস্র গন্ধের মতোই অনুভব করতে পারো। কিন্তু এটা কি? ডেভিড কথা বলতে বলতে নীচু হয়ে একটা রক্তাক্ত স্কার্ফ তুললেন। এটা তোমার? 
                                                                                             
     -না। জর্জের মুখটা শক্ত। এটা লিডিয়ার।
ওরা বেরিয়ে এসে নার্সারির সুইচটা অফ করে দিলেন। ঘরটা মরে গেলো।
***

বাচ্চারা দারুন ক্ষেপে গেছে। চিৎকার চেঁচামেচি লাফালাফি জুড়ে দিলো। জিনিসপত্র ছুঁড়তে লাগল। রেগে গিয়ে কেঁদেকেটে শাপ শাপান্ত করতে লাগল। আসবাবপত্রের ওপরে চড়ে লাফাতে লাগল।                       
     -তুমি এটা করতে পারো না! নার্সারিটা বন্ধ করে দিতে পারো না!                                   
     -পারি।                                                                              
    বাচ্চারা একটা সোফায় লাফ দিয়ে পড়ে মুখ গুঁজে কাঁদতে লাগল।
লিডিয়া দেখছিলেন সব। এবার বললেন -জর্জ, নার্সারিটা সুইচ অন করে দাও প্লিজ। অন্তত কিছুক্ষণের জন্য। এভাবে হঠকারিতা কোরো না।                                                                         
     -না।                                                                                        
    -আঃ! এত নিষ্ঠুর হচ্ছ কেন?                                                                 
     -লিডিয়া। ওটা বন্ধই থাকবে। এই গোটা বাড়িটাই এরপর মাটিতে মিশিয়ে যাবে। আমি যত দেখছি তত ভয় পাচ্ছি। কী অবস্থায় এনেছি নিজেদের! আমরা বহুদিন মেশিনের আরাম উপভোগ করেছি। এবার একটু নির্মল বাতাস দরকার।
       
    জর্জ সারা বাড়ি জুড়ে কথা বলা ঘড়ি, উনুন, কাটাকুটির মেশিন, হিটার, জুতো পালিশ, লেস বাঁধার যন্ত্র, শরীর ঘষা, ইত্যাদি যাবতীয় মেশিন, যেখানে যা চোখের সামনে পড়ল সমস্ত অকেজো করতে থাকলেন।
        
    এখন বাড়িটা মৃতদেহে ভরা। যন্ত্রের কবরখানা। নিস্তব্ধ বাড়ি। কোনো যন্ত্রের ভেতরের সেই গুনগুনানি আর অপেক্ষায় বসে নেই। একটি মাত্র সুইচে যা কাজ করতে শুরু করবে।
       
    পিটার যেন বাড়িটার সঙ্গে কথা বলছে, এইভাবে ছাদের দিকে চেয়ে বলতে লাগল -ওদের এটা করতে দিও না। নার্সারিটাকে মারতে দিও না। তারপর বাবার দিকে ফিরে বলল -ওঃ! আমি তোমাকে ভীষণ ঘেন্না করি!                                                                                                  
     -যা খুশি বলে অপমান করতে পারো আমায়। লাভ নেই। জর্জ কঠোর।                            
   -ওঃ! এর চেয়ে তুমি মরে যাওয়াই ভালো!                                                     
     -হ্যাঁ। অনেকদিন মরেই আছি। এবার বাঁচব। মেশিন বড্ড বেশিদিন ধরে আমাদের কন্ট্রোল করেছে।

ওয়েন্ডি কেঁদেই যাচ্ছিল। পিটার তার সঙ্গে আবার যোগ দিলো।  
        -একবার, শুধু একবার নার্সারিতে যেতে দাও! ওরা কেঁদে উঠল।       
     লিডিয়া আর সহ্য করতে না পেরে বলে উঠলেন -ওঃ জর্জ! ক্ষতি তো নেই কিছু!               
     -ঠিক আছে। ওরা যদি চুপ করে তবে একবার, এক মিনিটের জন্য যেতে পারে। কিন্তু ওই এক মিনিট। তারপর ওটা বন্ধ হয়ে যাবে। মনে রেখো।                                                          
     -বাবা! বাবা! বাবা!

বাচ্চাদের কান্নাভেজা মুখে হাসি।
     
       -তারপর আমরা ছুটি কাটাতে যাবো। ডেভিড আধ ঘণ্টার মধ্যে ফিরছে। ও আমাদের এয়ারপোর্টে পৌঁছে দেবে। আমি যাই জামাকাপড় চেঞ্জ করি। লিডিয়া, নার্সারিটা একমিনিটের জন্যই সুইচ অন কোরো কিন্তু।

তিনজনে চঞ্চল পায়ে নার্সারির দিকে এগিয়ে গেলো। জর্জ এয়ার ফ্লু দিয়ে সোজা ওপরে উঠে গেলেন। 

    একমিনিট পরেই লিডিয়া এলেন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন -চলে যেতে পারলে বাঁচি। উঃ!                               -তুমি কি ওদের নার্সারিতে রেখে এলে?                                                                             -আমাকেও তো চেঞ্জ করতে হবে। আর ওঃ! ওই ভয়ানক আফ্রিকা! কী যে দ্যাখে ওরা! লিডিয়ার গলায় অস্বস্তি।                                                                                             
    -যাক, আর পাঁচ মিনিটের মধ্যেই আমরা পৌঁছে যাবো আইওয়া। ওঃ ভগবান! কেন যে বাড়িটা করেছিলাম!                                                                                         
     -অহংকার, টাকা, আর বোকামি।                                                                
     -চলো নীচে যাই। ওই হিংস্র জন্তুগুলোকে নিয়ে বাচ্চারা বেশি মেতে ওঠার আগেই নীচে যাই।

ঠিক তখনই বাচ্চাদের গলা পাওয়া গেল।
        -বাবা, মা! এক্ষুণি এসো! এক্ষুণি!

ওরা হলওয়ে ধরে ছুটতে শুরু করলেন। বাচ্চাদের দেখা যাচ্ছে না। -ওয়েন্ডি? পিটার?
ওরা দৌড়ে নার্সারিতে ঢুকলেন।

ভেলট এখন সম্পূর্ণ ফাঁকা। কেউ নেই। শুধু সিংহরা ছাড়া। ওরা তাদের দিকে চেয়ে চিৎকার করলেন        
     -পিটার? ওয়েন্ডি?
ওদের পেছনে দরজাটা দড়াম করে বন্ধ হয়ে গেলো। জর্জ আর লিডিয়া ঘুরে দরজার দিকে দৌড়তে লাগলেন।
        -দরজা খোলো! জর্জ আর্তনাদ করে উঠলেন। নব ঘুরিয়ে বৃথা চেষ্টা করলেন।
         -ওরা আমাদের বাইরে থেকে বন্ধ করে দিয়েছে! কেন? পিটার! দরজাটা খোলো!  

বাইরে দরজার ওপিঠে পিটারের গলা শোনা গেলো।                                                    
      -ওদের নার্সারি আর বাড়িটাকে সুইচ অফ করতে দিও না।

স্বামী স্ত্রী সমানে দরজা ধাক্কাতে লাগলেন।
        -অনেক হয়েছে। দরজা খোলো। এখনই ডেভিড এসে পড়বেন। আমাদের যেতে হবে।

আর তখনই তারা শব্দটা শুনতে পেলেন। তাদেরকে তিনদিক থেকে ঘিরে ধরছে ওরা। শুকনো হলুদ ঘাসের ওপর থাবা ফেলে গরগর করতে করতে এগিয়ে আসছে।
        সিংহগুলো।
জর্জ স্ত্রীর দিকে একবার তাকালেন আর তারপর আবার দেখলেন। লেজ শক্ত করে জানোয়ারগুলো তীব্র স্থির চোখে ওদের দিকে এগিয়ে আসছে।
        ওরা আর্তনাদ করে উঠলেন। এবার স্পষ্ট মনে পড়ল। চিৎকারগুলো আগে কেন এত চেনা লেগেছিল।
***


“আমি এসে গেছি”। ডেভিড নার্সারির দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে। তিনি দেখতে পাচ্ছেন বাচ্চারা ঘাসের ওপরে একটা ফাঁকা জায়গায় বসে পিকনিক করছে। ওদের পেছনে জলা। আর হলুদ ভেলট। মাথার ওপর আগুন ঝরানো সূর্য। তিনি ঘামতে শুরু করলেন।                                                               
     -বাবা মা কই?                                                                              
     বাচ্চারা তার দিকে চেয়ে হাসল -ওরা এখানেই আসবে।
        -ভালো। আমাদের এবার যেতে হবে।

ডেভিডের চোখে পড়ল একটু দূরে লম্বা গাছের ছায়ায় সিংহগুলো শিকার নিয়ে মারামারি করছে, এবং অবশেষে শিকার থেকে মাংস ছিঁড়ে খাচ্ছে। চোখের ওপরে হাত রেখে তিনি সিংহগুলোকে দেখতে চেষ্টা করলেন।
এবার খাওয়া শেষ করে ওরা জল খেতে চলেছে।

        ডেভিডের তেতে ওঠা মুখের ওপরে একটা ছায়া সরে গেলো। আকাশে শকুনের দল।
-চা খাবেন? নিস্তব্ধতা ভেঙে ওয়েন্ডি জিজ্ঞেস করল।                                                
  

No comments:

Post a Comment