গঙ্গার পার ধরে হাঁটতে শুরু করলে
শহরতলির শেষ সীমানায় এক খণ্ড জমির ওপর একটা এক টেরে তেতলা বাড়ি আছে । সে বড্ড পোড়ো
। তার যে কত বয়স কেউ জানেনা । সেই বাড়িতে ঐ বাড়িরই প্রায় সমান বয়সী এক বুড়ো থাকে ।
নিখিল বাবু । কেউ জানেনা তিনি আগে কি করতেন । তাঁর আর কেউ আছে কি না । এক ‘পুরাতন
ভৃত্য’ কেষ্ট তাঁকে দেখাশুনো করে । পাড়ার কিছু পুরনো লোক বলে নিখিল বাবুর এক মাত্র
ছেলে ও স্ত্রী কাঁচা বয়সে হিমালয় ভ্রমণে গিয়ে আর ফিরে আসেনি । হয়ত মারা গিয়ে থাকতে
পারে । পাহাড়ে চড়ার শখ ছিল ওঁর স্ত্রীর । ছেলেটি নাকি দুঃসাহসিক অভিযানের স্বপ্ন
দেখত । কিন্তু নিখিল বাবু বলেন ওরা
হিমালয়ের বরফ ঢাকা দুর্গম প্রদেশে বাসা বেঁধেছে । তাঁর সাথে ওদের কথা হয় । নিশুতি
রাতে, কেষ্ট যখন ঘুমিয়ে পড়ে, তখন নিখিল বাবু একা ছাতে ওঠেন । তারায় ভরা আকাশ আর
নীচে গঙ্গা । অপেক্ষা করতে থাকেন । যখন গভীর রাতে চাঁদ পশ্চিম আকাশে ঝুলে পড়ে ঠিক
তখনই গঙ্গার জল যেন ফুলে ফেঁপে সমুদ্র হয়ে ওঠে । আর সেই সমুদ্রে পাড়ি দেয় কত নাম
না জানা বড় বড় পাল তোলা জাহাজ । নিখিল বাবু অনায়াসে বলে দিতে পারেন কোনটা জলদস্যুর
জাহাজ, কোনটা বা সুদূর চীন থেকে ভারত মহাসাগর হয়ে দক্ষিণে পাড়ি দেবে । কোনও
জাহাজের পাল কালো । এ কিন্তু কালো মনের লোকে দের জাহাজ নয় । কালো হল অজানা । সব
এখনও জানা যায়নি । এর মধ্যে লাল সোনালী ড্রাগন আঁকা চীনে জাহাজ, যার মুখটা ও
ড্রাগনের মত, তারা শুধু পণ্যবাহী নয় । তারা এদেশ থেকে নিয়ে যাবে আরও অনেক কিছু ।
সে সব জাহাজে ধরেনা । নিখিল বাবু কখনও
কোনও জাহাজ ডুবতে দেখেননি । যখনই কোনও জাহাজ ডুবে যাবার মত হয়, জাহাজের তলা থেকে
এক পাল শুশুক এসে তাকে ঠেকনো দেয় । এ যেন তাদের প্রিয় খেলা । তারা যেন অপেক্ষা করে
থাকে এর জন্য । এরই মাঝে পূর্ণিমা রাত হলে চাঁদের আলোয় গড়া পাল তুলে ছোট্ট এক খানি
বরফ নীল জাহাজ ভেসে আসে । নিখিল বাবু দেখেন তাঁর হারানো ছেলে আর স্ত্রী তাতে
সওয়ারী । আবেগে রেলিঙ ধরে দাঁড়িয়ে পরেন তিনি । দেখতে পান তারা তাঁর উদ্দেশ্যে কত
কথা বলছে । তিনি শুনতে পান না । বয়স হয়েছে, কানে কম শোনেন ।
সেদিন
তারা কোনও কথা বলল না । শুধু হাত নেড়ে ডাকতে থাকল তাঁকে । নিখিল বাবু আবেগে
থরথরিয়ে উঠলেন ।
সকালে
কেষ্ট ঘরে নিখিল বাবু কে দেখতে না পেয়ে ছাতে এসে দাঁড়াল । দেখল নিখিল বাবু অন্তিম
শয়নে । হাতে তখনও এক খণ্ড সাদা নীল রুমাল ।
No comments:
Post a Comment