দমকা বাতাসে কেঁপে কেঁপে উঠছে গাছেদের মাথা । মাঝেমাঝে দুয়েকটা ডাল ভেঙে যাচ্ছে বাতাসের তোড়ে । সন্ধ্যে পেরোনো আকাশে ঠিক কতটা মেঘ সে বোঝার অবকাশ নেই । উথাল পাথাল নদী আর উন্মত্ত আকাশ মিলে যেন ডেকে যাচ্ছে শেষের সেই দিনকে । এত দুর্যোগে বিদ্যুত্ সংযোগ নেই । ট্রানজিস্টর চালিয়ে কোনও স্টেশন ধরা যাচ্ছেনা ।
পথে চলার অবস্থা না থাকলেও বাধ্য হয়ে বেরিয়েছি । হাতে একটা টর্চ আর গায়ে রেন কোট । টর্চ জ্বালিয়ে খুঁজতে চেষ্টা করছি বাড়ির পথ । হুঁ । হারিয়ে ফেলেছি । নতুন জায়গা । এসেই এমন দুর্যোগ । ফলে বেশ মুশকিলে পড়েছি । ঠিক এমন সময়ে টর্চ টাও গেলো নিভে । ভিজে গেলে নষ্ট হবে বলে মোবাইল সঙ্গে আনিনি । বেরিয়েছিলাম কিছু রসদ কিনে নিতে । বেকার হলো । একটি দোকান খোলা নেই । এলাকায় যেন অলিখিত হরতাল । জনশূন্য পথে এমন করে হারিয়ে গিয়ে ভয়ে জিভ শুকিয়ে আসছে । বাড়ি খুঁজে না পেলে সমূহ বিপদ । এই ঘোর দুর্যোগে কি বাইরেই রাত্রিবাস ?
ভাবছি এমনটাই , আর তখনই যেন পথ ফুঁড়ে এসে দাঁড়ালেন কেউ । গলাটা অসম্ভব গম্ভীর । ঠোঁটে ঝুলছে একটা পাইপ । অন্ধকারেও ভদ্রলোকের চোখ দুটো দেখতে পাচ্ছি । আমার হৃত্পিণ্ডের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলেন মনে হয় । তীক্ষ্ণ হেসে ভদ্রলোক ফস্ করে তার লাইটার টা জ্বালিয়ে পাইপে লাগালেন । আর সেই তড়িতালোকে দেখতে পেলাম তীক্ষ্ণনাসা , দৃঢ় চোয়াল , আর ফেল্ট পরা দীর্ঘ একহারা চেহারাটা । আমার ততক্ষণে দমবন্ধ হবার যোগাড় । এ কাকে দেখছি !
ওঁর গলা শুনতে পাচ্ছি । কোথায় চলেছেন এই অসময়ে ? বললাম - একটু খাবারদাবার কিনতে গিয়েছিলাম । কিন্তু দোকান খুঁজে পেলামনা । ভদ্রলোক বললেন , বাড়ি ফিরে যান তাড়াতাড়ি । বললাম , খুঁজে পাচ্ছিনা । এবার সশব্দে হেসে উঠলেন । ওহ , আপনি ত দারুণ সাহসী ! এই সাহস নিয়ে কেউ বাসকারভিলে আসে ? জানেন না ? এখানে রাত্রে হাউন্ডগুলো অচেনা মানুষ দেখলেই টুঁটি টিপে ধরে ? আমার হাতপা কাঁপছে । কি করি যে ! ভদ্রলোক এবার কাকে যেন ডাকলেন । দেখি কোথা থেকে একটা ফিটন এসে দাঁড়ালো । হাওয়ার সোঁ সোঁ আওয়াজে সব কথা শোনা গেলোনা । শুধু ফিটনের দরজা থেকে দুটো হাত বেরিয়ে এসে আমাকে ভেতরে টেনে নিল । আমি ভয়ে জ্ঞান হারালাম । জ্ঞান হলে দেখি সেই নদীর ধারের ভাড়াটে বাড়ির ঘরে শুয়ে আছি । আলো এসে গিয়েছে ।
No comments:
Post a Comment