লোকাল ট্রেনের ভিড়টা
আমাকে কোনোদিনই সইতে হয়না। দুপুরের ফাঁকা ট্রেনে চড়ে বসে বাড়ি ফিরি। ফিরতি পথে
বহুদুরের গন্তব্যে যেতে যেতে ট্রেন একেবারেই নিঝুম হয়ে যায়। দু পাঁচজন ছড়িয়ে
ছিটিয়ে বসে থাকে। লেডিস কামরা। কেউ কেউ চেতরে বসে ঘুমোতে থাকে। বেশির ভাগ হাটুরে,
কুলি কামিন, ঠিকে লোকের ভিড়। মাঝে মাঝে দু একটি হকার। শৌখিন জিনিসের পসরা নয়।
চানাচুর, লেবু, শশা এইসব। আমি ভোরবেলাকার ট্রেনে কাজে যাই আর দুপুরের ট্রেনে ফিরি।
চুপ করে জানলা দিয়ে চেয়েছিলাম। বেশ ভালো লাগে দেখতে। রোজ দেখি, তাও। আকাশটা যেখানে
সবুজ খেতের ওপর চুপ করে নেমে এসেছে সেদিকে তাকিয়ে কেমন উদাস হয়ে যাই। কিন্তু সবসময়
এমন ধু ধু প্রান্তর নয়। শেষ জংশন স্টেশন ছাড়বার পর কিছুটা যেতেই শুরু হয় একেবারে
নির্জন স্টেশন। এরকমই জায়গায় দুটো স্টেশনের মাঝে পরে দুদিকে ঘন ঝোপ। একেবারে জঙ্গল
বলা চলে। আশশেওড়া, ফণী মনসা, লতাপাতা, আগাছা। বোঝাই যায় কোনও মানুষের যত্ন পায়না।
নিতান্তই পরজীবী, আগাছা। রেল লাইন ও এখানে দুদিকে বেশি জায়গা পায়নি। সরু গলির মত
ট্র্যাক দিয়ে ছুটে গেছে। এখানে আমি জানলা থেকে একটু সরে বসি। ভয় করে। কি জানি,
কোনও বিষাক্ত আগাছা যদি গাঁয়ে ঠেকে। চোখে মুখে ঢুকে যায়। কোনও কারণ ছাড়াই এ
জায়গাটায় আমার কেমন গা ছমছম করে। যেন একটা সবুজ অন্ধকার ভিড় করে আসে।
টাউনের একটা বেসরকারী নার্সিংহোমে
সকালের শিফটে কাজ করি। মা প্রথমে ভয় পেয়েছিল। কিন্তু ভয় পেলে তো আর পেট চলবে না।
তাই কাজটা নিয়েই ফেলেছি। কাজের নানা চাপ থাকলেও এই ট্রেন জার্নিটা আমার খুব ভালো
লাগে।
সেদিন ছিল বড় দুর্যোগ। আকাশ ভেঙে
বৃষ্টি শুরু হয়েছিল সকাল থেকে। বাড়ি ফিরব। স্টেশনে এসে ট্রেন ধরতে গিয়ে দেখলাম
কামরায় খুব ভিড়। দুর্যোগে আগের ট্রেন বাতিল হয়েছে। ভাগ্যিস এটা বাতিল হয়নি। একটু
বিরক্ত লাগলেও মনে মনে জানতাম কিছুদূর গেলেই ট্রেন ফাঁকা হয়ে যাবে। জানলার ধারে
বসতেও পারব। ট্রেনে আজ হকারের বিরাম নেই। আগের ট্রেনগুলো বাতিল হওয়ায় বেচারাদের
বিকিকিনি আজ তেমন হয়নি। ঠেলাঠেলি, ঝগড়া, কথা ছোঁড়াছুঁড়ি, এর মধ্যেই একটি বুড়ী
তীব্র চিৎকারে কামরা ছেয়ে ফেলল। ওরে বাবা গ, মর্যা গ্যেলাম গ। বেশ হুড়োহুড়ি পরে
গেল। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মাথাটা পেছনে ঘোরালাম। গেটের মুখেই হুড়োহুড়ি। বুড়ী ওখানেই
বসেছিল। আসতে আসতে তামাশাটা ভেতরে ঢুকতে লাগল। এ ওর গায়ে ঢলে পড়ছে। মুখে সবারই
স্পষ্ট আতঙ্কের চিন্হ। মাঝখানে একফালি জায়গা হয়েছে, কারণ ভিড় দুদিকের বসার সিটের
ওপর উপছে গেছে। আর সেখানেই একটা বেশ বড় শঙ্খচূড় সাপ। গায়ে অপরূপ চিত্র। মুগ্ধ হয়ে যেতে হয়। কিন্তু
আপাতত আতঙ্কে সামনে বসা মহিলার কোলের ওপর দাঁড়িয়ে পড়ি আর কি! সাপটা এঁকে বেঁকে
এগিয়েছে সামান্যই, এমন সময়ে একটা ন’ দশ বছরের রোগা, কালোপানা ছেলে এসে নিমেষে
ল্যাজ ধরে সাপটাকে পাকিয়ে হাতে তুলে নিল। সাপটা ঘাড় ঘুড়িয়ে ফোঁস করছে, কিন্তু
ছেলের তাতে ভ্রূক্ষেপ নেই। সে আর একটা হাত দিয়ে সাপটার গলার কাছে টিপে ধরল। সাপটার
সে কী মাথা ঝাঁকানি। যেন বলতে চাইছে, ছেড়ে দাও, আর করবনা। ওইটুকু ছেলের চোখের
চাউনি কি শীতল কি কঠিন! সকলে যখন মন্ত্রমুগ্ধের মত দেখছে, তখন ছেলেটা আসতে আসতে
সাপটাকে একটা মুখবন্ধ টুকরির মধ্যে পুরে বন্ধ করে দিল। তারপর শুরু করল চাঁচাছোলা
গলায় – দিদিমনি, মাসিমনি, পিসিমনি, যে যা পারো দুটি করে কিছু দাও গো। একই কথা বলে
চলেছে। এতক্ষণের নিস্তব্ধতা, মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়ার বিপদ কাটিয়ে এখন সকলে একটু
আশ্বস্ত। কেউ কেউ টাকাটা সিকেটা দিচ্ছে। একজন খনখনে গলায় বলে উঠল – এ্যাই ছেলে। খেটে
খেতে পারিস না? সাপের ভয় দেখিয়ে খাস। ছেলেটা দাঁত বের করে হাসল।
আসতে আসতে ভিড় পাতলা হয়ে এল। জানলার ধারে বসতে পেলাম। বৃষ্টিও ধরে এসেছে। কিন্তু
আকাশের মুখ ভার। প্রতিদিনের মত এ ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে ঘুমোচ্ছে। ছেলেটাও বসে
আছে টুকরিটা পাশে নিয়ে। মাঝে মাঝে সাপটার ফোঁস ফোঁস শুনতে পাচ্ছি। আমি ভয়ে ভয়ে
জিজ্ঞেস করলাম- ও টুকরি খুলে বেড়িয়ে পরবেনা তো? ছেলেটা হাসল। বললাম – সাপ নিয়ে
খেলা কর কেন? যদি কিছু করে? তোমার বাবা মা বারণ করেনা? ছেলেটা নির্বিকার ভাবে দেখল
একবার। তারপর বলতে শুরু করল – বাবা মা তো নেই আমার। সেই যে বারে বন্যে হল খুব,
আমাদের কাঁচা ঘর ভেঙে গেল। আমি আর বাবা স্রোতের জল ঠেলে একটা পাকুড় গাছে উঠতে পেরেছিলাম।
কিন্তু মা আর কোলের বোনটা চোখের সামনে জলের তোড়ে ভেসে গেল। বাবা আর আমি জল নামতে
ঘরকে গেলাম। কোনরকমে আবার পাতা ছেয়ে মাটি লেপে ঘর দাঁড় করান গেল। বাবা ভোরবেলা
খালে বিলে, জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে কচু, শাপলা এসব তুলে আনত। আর বেলায় বাজারে বেচে আসত।
ওই করেই চলত আমাদের। তারপর গেল বছরে এরকম বাদলায়, বাবা একদিন শাপলা তুলতে বিলে
যাবে, আমিও বায়না ধরলাম যাব। এই বিলটায় মাছ ওঠে খুব। যদিও বাবা কক্ষনও মাছ ধরত না।
মাছ ধরে বেচলে জেলেদের হাতে ঠেঙানি খেতে হবে খুব, এই ভয়ে। সেদিন আমার খুব মাছ ধরে
খেতে ইচ্ছে গেছিল। বাদলা বলে বাবা কেবল বলছিল, নাই গেলি, অত ঝোপে, সাপখোপের বাসা।
তুই র, আমি যাব আর আসব। কিন্তু আমি, কি জানি কেন, খুব জেদ করতে লাগলাম। দুজনে
বেড়িয়ে পরলাম। ঝোপে, জলে, মেঘলায়, বাবা
নীচু হয়ে শাপলা তুলছে আর আমি মাছ খুঁজছি। হঠাৎ বাবা উঃ বলে উঠল। দেখলাম সড়সড় করে
কি একটা বাবার পেছন দিয়ে চলে যাচ্ছে। লাফ দিয়ে পরলাম। হাতের মধ্যে শক্ত করে ধরে
টেনে আনলাম। দেখি একটা সাপ। জাত সাপ। বাবা ততক্ষণে জলে কাদায় মাখামাখি হয়ে শোওয়া। কাতরানির শব্দটা দু এক মিনিটের বেশি শোনা গেল না।
আমি তারপর থেকে এটাকে ঘরে এনে রেখেছি। এটাই
এখন আমায় খাওয়ায়। মাঝে মাঝে ছেড়ে দি। আবার নিজেই ফিরে আসে। টুকরি খুলে দি। ঢুকে
পড়ে। আমি ভাবছিলাম, সাপের অপরাধ বোধ? তাই হয়? ছেলেটা বলল – দেখবে? বলে টুকরির
মুখটা খুলে দিল। সাপটা মাথা তুলে একবার দেখে আবার গুটিয়ে শুয়ে পরল। আমার কেমন মনে
হল মানুষ মারার অপরাধে সাপটা নিজেই বন্দী জীবন স্বীকার করে নিয়েছে।
আবার আসছে সেই আশশেওড়া ফণী মনসার ঝোপ।
একে মেঘলা তায় আবার জাতসাপ সঙ্গে। মনে মনে ভগবানকে দাকছি। হে মা কালী পার করে দাও।
হে মা মনসা তোমার বাহন কে সামলে রাখো মা। কিন্তু আমাকে চমকে দিয়ে ঘটাং করে ট্রেনটা
দাঁড়িয়ে গেল। কি হল? তাকিয়ে দেখি ছেলেটা টুকরি হাতে উঠে দাঁড়িয়েছে। এইখানে নামবি
নাকি? সে ঘাড় নাড়ল। আর তারপরে টুকরি নিয়ে দিল এক লাফ। আমি তখন খোলা জানলা দিয়ে
দেখি টুকরির মুখটা খুলে দিল ছেলেটা। আর সাপটা বেড়িয়ে এল তা থেকে। ছেলেটা সামনে বসতেই সাপটা সড়াৎ করে ছোট্ট
একটা লাফ দিল। আর কি অদ্ভুত! সে মুখ নিচু করতেই সাপটা তার জিভ ছোঁয়াল ওর মুখে। যেন
চুমু খাচ্ছে। আর তারপর চলে গেল ঝোপের মধ্যে। ছেলেটাও চলে গেল অন্য দিকে। আমি
স্থাণু হয়ে বসে রইলাম। ট্রেন চলতে শুরু করেছে ততক্ষণে।