অজো নিত্য



এই নতুন ফ্ল্যাট বাড়িটায় সদ্য এসেছে  অপুরা । বেশ বড় একটা জমিতে অনেকটা করে জায়গা ছেড়ে লম্বা লম্বা উঠেছে কটি বহুতল । আবাসনটি কলকাতা বলে পরিচয় দিলেও আদতে সুন্দরবন বোধ হয় ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে । অপুর বাবা হরিহর কাশীতে বিএইচইউতে ভাষাতত্ত্বের অধ্যাপক । মা সর্বজয়া আর অপু মানে শ্রীমান অপূর্ব কুমার রায় আপাতত এই ফ্ল্যাটের নতুন বাসিন্দা । সাত সকালে ইস্কুলের হলদে বাস এসে তাকে নিয়ে যায় । ইস্কুল শেষ হলে এক্সট্রা টুইশন , সাঁতার , ড্রয়িং ইত্যাদি সেরে বাড়ি ফিরিয়ে দেয় সেই হলদে বাস সন্ধ্যের মুখে । সারাটা দিন সর্বজয়া একা বিরল বাস করে । তার একলা দুপুর বই পড়ে গান শুনে কাটে । কখনও নির্জন দুপুরে দশতলার ব্যালকনি দিয়ে দূরে তাকিয়ে থাকে । কত সবুজ নীচটা ! কেমন ঝিলমিল পুকুর ! কোনও পুরনো বাড়ির দোতলার ছাদ । কে যেন শাড়ি মেলে দেয় । সবুজের ফাঁকে লাল টালির ছাদ । একটুকরো লকলকে লাউডগা । একটা ঝাঁকড়া মাথা কদম গাছ । ফুল ফোটার সময়ে নিশ্চয় গন্ধ বাতাসে ভেসে আসবে । ওই যে ছোট্ট ছেলেটা দুপুরের খর রোদে ঝাঁটার কাঠির তীর ধনুক নিয়ে গাছ তলায় ঘুরপাক খাচ্ছে । এইই ওর দিদি এসে দিল ঘা কতক বসিয়ে । এত দূর থেকে শব্দ শোনা যায়না । ছেলের কান্না বুঝতে পারা যায় । তাই শুনেই নিশ্চয় , মা হবে হয়ত , বাপরে , কি জোরে মেয়ের চুল ধরে নাড়া দিল ! আহা রে ! সর্বজয়ার কান্না পেয়ে গেল । ও ত ভাইকে রোদ থেকে সরাতেই শাসন করেছিলো । ঘরে ফিরে এসে দ্রুত মোবাইলে মেসেজ করল হরিহরকে । "এমাসে দুর্গার জন্য একটা বাসন্তী রঙের বেনারসী কিনবে । ওর কনভোকেশন আছে । পরবে ।" ।

দুপুরে টিচার্স রুমে সেই মেসেজ দেখে নির্বাক হয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকেন হরিহর । মেয়েটা সেই কবে ছেড়ে চলে গিয়েছে !! দিল্লি শহরে পড়তে গিয়ে একদল হায়নার হাতে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল । ব্যাধি । সামাজিক ব্যাধি । একটু ক্ষণ পর ফিরতি মেসেজে লিখলেন , " গোছগাছ সেরে রেখো । তোমাদের কাশীতে আনব এবার "।

ঘনঘোর



দমকা বাতাসে কেঁপে কেঁপে উঠছে গাছেদের মাথা । মাঝেমাঝে দুয়েকটা ডাল ভেঙে যাচ্ছে বাতাসের তোড়ে । সন্ধ্যে পেরোনো আকাশে ঠিক কতটা মেঘ সে বোঝার অবকাশ নেই । উথাল পাথাল নদী আর উন্মত্ত আকাশ মিলে যেন ডেকে যাচ্ছে শেষের সেই দিনকে । এত দুর্যোগে বিদ্যুত্ সংযোগ নেই । ট্রানজিস্টর চালিয়ে কোনও স্টেশন ধরা যাচ্ছেনা ।
পথে চলার অবস্থা না থাকলেও বাধ্য হয়ে বেরিয়েছি । হাতে একটা টর্চ আর গায়ে রেন কোট । টর্চ জ্বালিয়ে খুঁজতে চেষ্টা করছি বাড়ির পথ । হুঁ । হারিয়ে ফেলেছি । নতুন জায়গা । এসেই এমন দুর্যোগ । ফলে বেশ মুশকিলে পড়েছি । ঠিক এমন সময়ে টর্চ টাও গেলো নিভে । ভিজে গেলে নষ্ট হবে বলে মোবাইল সঙ্গে আনিনি । বেরিয়েছিলাম কিছু রসদ কিনে নিতে । বেকার হলো । একটি দোকান খোলা নেই । এলাকায় যেন অলিখিত হরতাল । জনশূন্য পথে এমন করে হারিয়ে গিয়ে ভয়ে জিভ শুকিয়ে আসছে । বাড়ি খুঁজে না পেলে সমূহ বিপদ । এই ঘোর দুর্যোগে কি বাইরেই রাত্রিবাস ?
ভাবছি এমনটাই , আর তখনই যেন পথ ফুঁড়ে এসে দাঁড়ালেন কেউ । গলাটা অসম্ভব গম্ভীর । ঠোঁটে ঝুলছে একটা পাইপ । অন্ধকারেও ভদ্রলোকের চোখ দুটো দেখতে পাচ্ছি । আমার হৃত্পিণ্ডের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলেন মনে হয় । তীক্ষ্ণ হেসে ভদ্রলোক ফস্ করে তার লাইটার টা জ্বালিয়ে পাইপে লাগালেন । আর সেই তড়িতালোকে দেখতে পেলাম তীক্ষ্ণনাসা , দৃঢ় চোয়াল , আর ফেল্ট পরা দীর্ঘ একহারা চেহারাটা । আমার ততক্ষণে দমবন্ধ হবার যোগাড় । এ কাকে দেখছি !
ওঁর গলা শুনতে পাচ্ছি । কোথায় চলেছেন এই অসময়ে ? বললাম - একটু খাবারদাবার কিনতে গিয়েছিলাম । কিন্তু দোকান খুঁজে পেলামনা । ভদ্রলোক বললেন , বাড়ি ফিরে যান তাড়াতাড়ি । বললাম , খুঁজে পাচ্ছিনা । এবার সশব্দে হেসে উঠলেন । ওহ , আপনি ত দারুণ সাহসী ! এই সাহস নিয়ে কেউ বাসকারভিলে আসে ? জানেন না ? এখানে রাত্রে হাউন্ডগুলো অচেনা মানুষ দেখলেই টুঁটি টিপে ধরে ? আমার হাতপা কাঁপছে । কি করি যে ! ভদ্রলোক এবার কাকে যেন ডাকলেন । দেখি কোথা থেকে একটা ফিটন এসে দাঁড়ালো । হাওয়ার সোঁ সোঁ আওয়াজে সব কথা শোনা গেলোনা । শুধু ফিটনের দরজা থেকে দুটো হাত বেরিয়ে এসে আমাকে ভেতরে টেনে নিল । আমি ভয়ে জ্ঞান হারালাম । জ্ঞান হলে দেখি সেই নদীর ধারের ভাড়াটে বাড়ির ঘরে শুয়ে আছি । আলো এসে গিয়েছে ।

চন্দ্রাহত


গঙ্গার পার ধরে হাঁটতে শুরু করলে শহরতলির শেষ সীমানায় এক খণ্ড জমির ওপর একটা এক টেরে তেতলা বাড়ি আছে । সে বড্ড পোড়ো । তার যে কত বয়স কেউ জানেনা । সেই বাড়িতে ঐ বাড়িরই প্রায় সমান বয়সী এক বুড়ো থাকে । নিখিল বাবু । কেউ জানেনা তিনি আগে কি করতেন । তাঁর আর কেউ আছে কি না । এক ‘পুরাতন ভৃত্য’ কেষ্ট তাঁকে দেখাশুনো করে । পাড়ার কিছু পুরনো লোক বলে নিখিল বাবুর এক মাত্র ছেলে ও স্ত্রী কাঁচা বয়সে হিমালয় ভ্রমণে গিয়ে আর ফিরে আসেনি । হয়ত মারা গিয়ে থাকতে পারে । পাহাড়ে চড়ার শখ ছিল ওঁর স্ত্রীর । ছেলেটি নাকি দুঃসাহসিক অভিযানের স্বপ্ন দেখত ।  কিন্তু নিখিল বাবু বলেন ওরা হিমালয়ের বরফ ঢাকা দুর্গম প্রদেশে বাসা বেঁধেছে । তাঁর সাথে ওদের কথা হয় । নিশুতি রাতে, কেষ্ট যখন ঘুমিয়ে পড়ে, তখন নিখিল বাবু একা ছাতে ওঠেন । তারায় ভরা আকাশ আর নীচে গঙ্গা । অপেক্ষা করতে থাকেন । যখন গভীর রাতে চাঁদ পশ্চিম আকাশে ঝুলে পড়ে ঠিক তখনই গঙ্গার জল যেন ফুলে ফেঁপে সমুদ্র হয়ে ওঠে । আর সেই সমুদ্রে পাড়ি দেয় কত নাম না জানা বড় বড় পাল তোলা জাহাজ । নিখিল বাবু অনায়াসে বলে দিতে পারেন কোনটা জলদস্যুর জাহাজ, কোনটা বা সুদূর চীন থেকে ভারত মহাসাগর হয়ে দক্ষিণে পাড়ি দেবে । কোনও জাহাজের পাল কালো । এ কিন্তু কালো মনের লোকে দের জাহাজ নয় । কালো হল অজানা । সব এখনও জানা যায়নি । এর মধ্যে লাল সোনালী ড্রাগন আঁকা চীনে জাহাজ, যার মুখটা ও ড্রাগনের মত, তারা শুধু পণ্যবাহী নয় । তারা এদেশ থেকে নিয়ে যাবে আরও অনেক কিছু । সে সব জাহাজে  ধরেনা । নিখিল বাবু কখনও কোনও জাহাজ ডুবতে দেখেননি । যখনই কোনও জাহাজ ডুবে যাবার মত হয়, জাহাজের তলা থেকে এক পাল শুশুক এসে তাকে ঠেকনো দেয় । এ যেন তাদের প্রিয় খেলা । তারা যেন অপেক্ষা করে থাকে এর জন্য । এরই মাঝে পূর্ণিমা রাত হলে চাঁদের আলোয় গড়া পাল তুলে ছোট্ট এক খানি বরফ নীল জাহাজ ভেসে আসে । নিখিল বাবু দেখেন তাঁর হারানো ছেলে আর স্ত্রী তাতে সওয়ারী । আবেগে রেলিঙ ধরে দাঁড়িয়ে পরেন তিনি । দেখতে পান তারা তাঁর উদ্দেশ্যে কত কথা বলছে । তিনি শুনতে পান না । বয়স হয়েছে, কানে কম শোনেন ।
           সেদিন তারা কোনও কথা বলল না । শুধু হাত নেড়ে ডাকতে থাকল তাঁকে । নিখিল বাবু আবেগে থরথরিয়ে উঠলেন ।

           সকালে কেষ্ট ঘরে নিখিল বাবু কে দেখতে না পেয়ে ছাতে এসে দাঁড়াল । দেখল নিখিল বাবু অন্তিম শয়নে । হাতে তখনও এক খণ্ড সাদা নীল রুমাল । 

আগাছা


লোকাল ট্রেনের ভিড়টা আমাকে কোনোদিনই সইতে হয়না। দুপুরের ফাঁকা ট্রেনে চড়ে বসে বাড়ি ফিরি। ফিরতি পথে বহুদুরের গন্তব্যে যেতে যেতে ট্রেন একেবারেই নিঝুম হয়ে যায়। দু পাঁচজন ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে থাকে। লেডিস কামরা। কেউ কেউ চেতরে বসে ঘুমোতে থাকে। বেশির ভাগ হাটুরে, কুলি কামিন, ঠিকে লোকের ভিড়। মাঝে মাঝে দু একটি হকার। শৌখিন জিনিসের পসরা নয়। চানাচুর, লেবু, শশা এইসব। আমি ভোরবেলাকার ট্রেনে কাজে যাই আর দুপুরের ট্রেনে ফিরি। চুপ করে জানলা দিয়ে চেয়েছিলাম। বেশ ভালো লাগে দেখতে। রোজ দেখি, তাও। আকাশটা যেখানে সবুজ খেতের ওপর চুপ করে নেমে এসেছে সেদিকে তাকিয়ে কেমন উদাস হয়ে যাই। কিন্তু সবসময় এমন ধু ধু প্রান্তর নয়। শেষ জংশন স্টেশন ছাড়বার পর কিছুটা যেতেই শুরু হয় একেবারে নির্জন স্টেশন। এরকমই জায়গায় দুটো স্টেশনের মাঝে পরে দুদিকে ঘন ঝোপ। একেবারে জঙ্গল বলা চলে। আশশেওড়া, ফণী মনসা, লতাপাতা, আগাছা। বোঝাই যায় কোনও মানুষের যত্ন পায়না। নিতান্তই পরজীবী, আগাছা। রেল লাইন ও এখানে দুদিকে বেশি জায়গা পায়নি। সরু গলির মত ট্র্যাক দিয়ে ছুটে গেছে। এখানে আমি জানলা থেকে একটু সরে বসি। ভয় করে। কি জানি, কোনও বিষাক্ত আগাছা যদি গাঁয়ে ঠেকে। চোখে মুখে ঢুকে যায়। কোনও কারণ ছাড়াই এ জায়গাটায় আমার কেমন গা ছমছম করে। যেন একটা সবুজ অন্ধকার ভিড় করে আসে।
          টাউনের একটা বেসরকারী নার্সিংহোমে সকালের শিফটে কাজ করি। মা প্রথমে ভয় পেয়েছিল। কিন্তু ভয় পেলে তো আর পেট চলবে না। তাই কাজটা নিয়েই ফেলেছি। কাজের নানা চাপ থাকলেও এই ট্রেন জার্নিটা আমার খুব ভালো লাগে।
          সেদিন ছিল বড় দুর্যোগ। আকাশ ভেঙে বৃষ্টি শুরু হয়েছিল সকাল থেকে। বাড়ি ফিরব। স্টেশনে এসে ট্রেন ধরতে গিয়ে দেখলাম কামরায় খুব ভিড়। দুর্যোগে আগের ট্রেন বাতিল হয়েছে। ভাগ্যিস এটা বাতিল হয়নি। একটু বিরক্ত লাগলেও মনে মনে জানতাম কিছুদূর গেলেই ট্রেন ফাঁকা হয়ে যাবে। জানলার ধারে বসতেও পারব। ট্রেনে আজ হকারের বিরাম নেই। আগের ট্রেনগুলো বাতিল হওয়ায় বেচারাদের বিকিকিনি আজ তেমন হয়নি। ঠেলাঠেলি, ঝগড়া, কথা ছোঁড়াছুঁড়ি, এর মধ্যেই একটি বুড়ী তীব্র চিৎকারে কামরা ছেয়ে ফেলল। ওরে বাবা গ, মর‍্যা গ্যেলাম গ। বেশ হুড়োহুড়ি পরে গেল। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মাথাটা পেছনে ঘোরালাম। গেটের মুখেই হুড়োহুড়ি। বুড়ী ওখানেই বসেছিল। আসতে আসতে তামাশাটা ভেতরে ঢুকতে লাগল। এ ওর গায়ে ঢলে পড়ছে। মুখে সবারই স্পষ্ট আতঙ্কের চিন্হ। মাঝখানে একফালি জায়গা হয়েছে, কারণ ভিড় দুদিকের বসার সিটের ওপর উপছে গেছে। আর সেখানেই একটা বেশ বড় শঙ্খচূড় সাপ।  গায়ে অপরূপ চিত্র। মুগ্ধ হয়ে যেতে হয়। কিন্তু আপাতত আতঙ্কে সামনে বসা মহিলার কোলের ওপর দাঁড়িয়ে পড়ি আর কি! সাপটা এঁকে বেঁকে এগিয়েছে সামান্যই, এমন সময়ে একটা ন’ দশ বছরের রোগা, কালোপানা ছেলে এসে নিমেষে ল্যাজ ধরে সাপটাকে পাকিয়ে হাতে তুলে নিল। সাপটা ঘাড় ঘুড়িয়ে ফোঁস করছে, কিন্তু ছেলের তাতে ভ্রূক্ষেপ নেই। সে আর একটা হাত দিয়ে সাপটার গলার কাছে টিপে ধরল। সাপটার সে কী মাথা ঝাঁকানি। যেন বলতে চাইছে, ছেড়ে দাও, আর করবনা। ওইটুকু ছেলের চোখের চাউনি কি শীতল কি কঠিন! সকলে যখন মন্ত্রমুগ্ধের মত দেখছে, তখন ছেলেটা আসতে আসতে সাপটাকে একটা মুখবন্ধ টুকরির মধ্যে পুরে বন্ধ করে দিল। তারপর শুরু করল চাঁচাছোলা গলায় – দিদিমনি, মাসিমনি, পিসিমনি, যে যা পারো দুটি করে কিছু দাও গো। একই কথা বলে চলেছে। এতক্ষণের নিস্তব্ধতা, মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়ার বিপদ কাটিয়ে এখন সকলে একটু আশ্বস্ত। কেউ কেউ টাকাটা সিকেটা দিচ্ছে। একজন খনখনে গলায় বলে উঠল – এ্যাই ছেলে। খেটে খেতে পারিস না? সাপের ভয় দেখিয়ে খাস। ছেলেটা দাঁত বের করে হাসল।
         আসতে আসতে ভিড় পাতলা হয়ে এল। জানলার ধারে বসতে পেলাম। বৃষ্টিও ধরে এসেছে। কিন্তু আকাশের মুখ ভার। প্রতিদিনের মত এ ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে ঘুমোচ্ছে। ছেলেটাও বসে আছে টুকরিটা পাশে নিয়ে। মাঝে মাঝে সাপটার ফোঁস ফোঁস শুনতে পাচ্ছি। আমি ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলাম- ও টুকরি খুলে বেড়িয়ে পরবেনা তো? ছেলেটা হাসল। বললাম – সাপ নিয়ে খেলা কর কেন? যদি কিছু করে? তোমার বাবা মা বারণ করেনা? ছেলেটা নির্বিকার ভাবে দেখল একবার। তারপর বলতে শুরু করল – বাবা মা তো নেই আমার। সেই যে বারে বন্যে হল খুব, আমাদের কাঁচা ঘর ভেঙে গেল। আমি আর বাবা স্রোতের জল ঠেলে একটা পাকুড় গাছে উঠতে পেরেছিলাম। কিন্তু মা আর কোলের বোনটা চোখের সামনে জলের তোড়ে ভেসে গেল। বাবা আর আমি জল নামতে ঘরকে গেলাম। কোনরকমে আবার পাতা ছেয়ে মাটি লেপে ঘর দাঁড় করান গেল। বাবা ভোরবেলা খালে বিলে, জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে কচু, শাপলা এসব তুলে আনত। আর বেলায় বাজারে বেচে আসত। ওই করেই চলত আমাদের। তারপর গেল বছরে এরকম বাদলায়, বাবা একদিন শাপলা তুলতে বিলে যাবে, আমিও বায়না ধরলাম যাব। এই বিলটায় মাছ ওঠে খুব। যদিও বাবা কক্ষনও মাছ ধরত না। মাছ ধরে বেচলে জেলেদের হাতে ঠেঙানি খেতে হবে খুব, এই ভয়ে। সেদিন আমার খুব মাছ ধরে খেতে ইচ্ছে গেছিল। বাদলা বলে বাবা কেবল বলছিল, নাই গেলি, অত ঝোপে, সাপখোপের বাসা। তুই র, আমি যাব আর আসব। কিন্তু আমি, কি জানি কেন, খুব জেদ করতে লাগলাম। দুজনে বেড়িয়ে পরলাম।  ঝোপে, জলে, মেঘলায়, বাবা নীচু হয়ে শাপলা তুলছে আর আমি মাছ খুঁজছি। হঠাৎ বাবা উঃ বলে উঠল। দেখলাম সড়সড় করে কি একটা বাবার পেছন দিয়ে চলে যাচ্ছে। লাফ দিয়ে পরলাম। হাতের মধ্যে শক্ত করে ধরে টেনে আনলাম। দেখি একটা সাপ। জাত সাপ। বাবা ততক্ষণে জলে কাদায় মাখামাখি হয়ে শোওয়াকাতরানির শব্দটা দু এক মিনিটের বেশি শোনা গেল না।
            আমি তারপর থেকে এটাকে ঘরে এনে রেখেছি। এটাই এখন আমায় খাওয়ায়। মাঝে মাঝে ছেড়ে দি। আবার নিজেই ফিরে আসে। টুকরি খুলে দি। ঢুকে পড়ে। আমি ভাবছিলাম, সাপের অপরাধ বোধ? তাই হয়? ছেলেটা বলল – দেখবে? বলে টুকরির মুখটা খুলে দিল। সাপটা মাথা তুলে একবার দেখে আবার গুটিয়ে শুয়ে পরল। আমার কেমন মনে হল মানুষ মারার অপরাধে সাপটা নিজেই বন্দী জীবন স্বীকার করে নিয়েছে।

          আবার আসছে সেই আশশেওড়া ফণী মনসার ঝোপ। একে মেঘলা তায় আবার জাতসাপ সঙ্গে। মনে মনে ভগবানকে দাকছি। হে মা কালী পার করে দাও। হে মা মনসা তোমার বাহন কে সামলে রাখো মা। কিন্তু আমাকে চমকে দিয়ে ঘটাং করে ট্রেনটা দাঁড়িয়ে গেল। কি হল? তাকিয়ে দেখি ছেলেটা টুকরি হাতে উঠে দাঁড়িয়েছে। এইখানে নামবি নাকি? সে ঘাড় নাড়ল। আর তারপরে টুকরি নিয়ে দিল এক লাফ। আমি তখন খোলা জানলা দিয়ে দেখি টুকরির মুখটা খুলে দিল ছেলেটা। আর সাপটা বেড়িয়ে এল তা  থেকে। ছেলেটা সামনে বসতেই সাপটা সড়াৎ করে ছোট্ট একটা লাফ দিল। আর কি অদ্ভুত! সে মুখ নিচু করতেই সাপটা তার জিভ ছোঁয়াল ওর মুখে। যেন চুমু খাচ্ছে। আর তারপর চলে গেল ঝোপের মধ্যে। ছেলেটাও চলে গেল অন্য দিকে। আমি স্থাণু হয়ে বসে রইলাম। ট্রেন চলতে শুরু করেছে ততক্ষণে।              

প্রলাপ


উপকূলবর্তী এই শহরে আজ কদিন হলো নাগাড়ে বৃষ্টি হয়ে চলেছে । এবার বর্ষা শুকনো গিয়েছে । এখন তীব্র শীত । কিছুদিন আগেও শীতে পাতা হারানো বৃক্ষ গুলো রাজপথে তাদের শুকনো ডালপালা আর শুকিয়ে যাওয়া কাণ্ড নিয়ে পাগলা বুড়োর মত আকাশপানে চেয়ে থাকত । পথে ঘাটে আলোচনা চলত , এবার বর্ষা হলোনা । শীতের শুকনো ধুলো , সাগর পার থেকে উড়ে আসা বালি বাড়িঘর পথ ঘাট ঢেকে ফেলছে । কি যে বিশ্রী ব্যপার ! এ এক আবহাওয়া বিভ্রাট ।
এমনই সময়ে হঠাত্ একদিন বৃষ্টি এলো । সাগরের পার থেকে এক খণ্ড মেঘ উড়ে এসে আকাশ জুড়ে বসল । শহরবাসীরা প্রথমে খুবই খুশি হলো । কি আর হবে ? নয় শীত বাড়বে কদিন । কিন্তু এই শুকনো রুক্ষ পরিবেশ ত সজল হবে ! গাছপালার খয়েরি ডালে দু একটা সবুজ পাতার কুঁড়ি ত দেখা যাবে !
কিন্তু বৃষ্টি থামার তেমন লক্ষণ ত দেখা যাচ্ছেনা । উল্টে সরকার আপতকালীন পরিস্থিতি ঘোষণা করেছে । রাস্তায় জনমনিষ্যি নেই । একটা পশুপাখি পর্যন্ত নেই । প্রবল বৃষ্টির মাঝে সেনা বাহিনীর একটা জিপ মাঝে মাঝে টহল দিচ্ছে । কেউ যদি সাহায্য চায় ।
রাজপথ দিয়ে হেঁটে চলেছেন এক দীর্ঘদেহী মানুষ । তাঁর পরণে একটি ধূসর বর্ষাতি । তিনি উদ্দেশ্যহীন হাঁটছেন বলেই মনে হচ্ছে । জিপে বসে থাকা সবচেয়ে ছোট জওয়ানটি বলে উঠল - অফিসার , ওই সেই লোকটি । ওকেই আমি দেখছি , বৃষ্টি উপেক্ষা করে সমানে হেঁটে চলেছেন পথে । কী উদ্দেশ্য কে জানে ! অফিসার একটু অবাক হলেন । তারপর অত বৃষ্টিতে যতটা সম্ভব তাড়াতাড়িতে এগিয়ে গেলেন লোকটির কাছে ।
হ্যালো স্যার , আপনি এই দুর্যোগে বাইরে কেন ? আমাদের একটি ছেলে বলছে আপনাকে ও প্রায়ই রাস্তায় দেখছে ! একটি প্রাণী রাস্তায় নেই স্যার ! কিসের খোঁজে এসেছেন স্যার ? আপনার খাবার দাবারের রেশন পর্যাপ্ত ভাবে আছে ত ?
পরপর এতগুলো প্রশ্নেও বিচলিত না হয়ে পাশ ফিরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি মাথা নাড়ল । না । সব ঠিক আছে ।
তাহলে স্যার আপনাকে পৌঁছে দিই চলুন । আপনি কোথায় থাকেন ?
লোকটির ভাসাভাসা উত্তর শোনা গেলো । আমার বাড়িটা ওই সাগরের ধারে পুরনো লাইটহাউসের পাশে ।
তবে চলুন স্যার !
না অফিসার । আমার কষ্ট হচ্ছেনা । আমি চলে যাবো । কিন্তু আপনি সত্যিই চাইছেন যে আমি ফিরে যাই ?
অফিসার জানেন বৃদ্ধ হলে মানুষ এমন অদ্ভুত অদ্ভুত কথা বলে । তিনি হেসে বললেন - হ্যাঁ স্যার । আমি চাই এই বৃষ্টিতে আপনি কোনও ভারী অসুখে না পড়েন । চাই যে আপনি বাড়িতে থাকুন ।
লোকটি ফিরে যাচ্ছে । সেই জওয়ান গাড়িতে ফিরে আসা অফিসারকে বলল - স্যার , এবার দেখবেন বৃষ্টি কমে যাবে । দুর্যোগ থাকবে না । অফিসার একবার পেছন ফিরে দেখলেন । বৃষ্টির একঘেয়েমি কাটাতে গুলগল্পের জুড়ি নেই । বললেন - কিরকম ? ছেলেটি বলল - স্যার । ও লোকটা থাকে লাইট হাউসের পেছনে । পোড়ো বাড়িটায় । আমি দেখেছি । যেদিন প্রথম ও রাস্তায় বেরিয়েছিল সেদিন ঝলমলে দিন ছিল । তবু ওর গায়ে ওই বর্ষাতিটা ছিল । ও যখন আসছিল তখন আমি দেখেছিলাম ওর পেছন পেছন আসছে এক টুকরো কালো মেঘ । আর তখুনি শুরু হলো বৃষ্টি ।
অফিসার চুপিচুপি হাসলেন । ছেলেটা সিয়াচেনে থাকতে এরকম ভুল বকছিল । তাই বরফ থেকে ওকে নামিয়ে আনা হয়েছে । প্রলাপ হলেও শুনতে মন্দ লাগছেনা ।

সভ্যতার সংকট ৬

সীতার কাছ থেকে সব শুনে মন্দোদরী স্বামীকে বললেন বৈদেহীকে আপাতত রেখে আসা হোক তাদের বনকুটীরে। কিন্তু মহাবীর জানালেন তা আর হওয়ার নয়। রাম লক্ষ্মন দু ভাই এক সোনায় গড়া মৃগ দেখতে পেয়েছেন বনের মাঝে। সম্ভবত কোনো আরণ্যক রাজার বনদেবতাকে উপঢৌকন। এরকম হয়। বনের মাঝে দেবতার তুষ্টির জন্য অনেকে এমন পূজা করেন। গোল বেঁধেছে মূর্তি নিয়ে। রাম বা তস্য অনুজ ওই সোনার হরিণের লোভে পড়েছেন। দেবতার জন্য উৎসর্গ করা বস্তুতে নজর দিয়ে তার পিছে ছুটেছেন। আরণ্যক প্রজারা ধাওয়া করতেই অপবাদ দিয়েছেন সীতার নামে। তিনি নাকি চেয়েছেন ওই হরিণ।
প্রাণে বাঁচতে দুজনেই এখন তমিড় দেশে। সেখান থেকেই মহাবীরকে প্রেরণ করেছেন। 

সভ্যতার সংকট ৫


রাজ্যের কাজ সেরে আড্ডায় জমেছেন দশানন মন্দোদরী ও সীতা। মহাবীর ও আছেন। তবে তিনি কেমন যেন বিমর্ষ। সীতা ওঁকে আগে থেকেই চেনেন। ভালো সম্পর্ক। তাই তিনিই জিজ্ঞেস করলেন বিষাদের কারণ। মহাবীর যা বললেন তার অর্থ রামচন্দ্র তাঁকে সীতা সম্পর্কে খোঁজ নিতে বলেছেন। পতিব্রতা নারী কিভাবে পতিকে ছেড়ে এই বিজন বনে পরপুরুষের সান্নিধ্যে দিন কাটাচ্ছেন ? তিনি তো অযোধ্যাময় এই বার্তাই রটিয়েছেন, যে দশানন সীতাকে অপহরণ করেছেন। মন্দোদরী হতবাক। সে আবার কি ! দশানন অপহরণ করতে যাবেন কেন ? আর যদি সে ইচ্ছেই থাকত তবে তো তিনি অন্য কাউকে দিয়েই কাজটা করাতে পারতেন ! নিজে একাজ করতে যাবেন কেন ? বিশেষ শিবব্রত উদযাপনের সময়ে এরকম বালখিল্য অনাচার কি তাঁর পক্ষে সম্ভব ? যত অন্যায় অপবাদ ! আর এধরণের স্বভাব তো রাজার নয় ! সীতা অধোবদন। বললেন - ভুল তো বিদেহ রাজেরই হয়েছে। আমরাও পুরুষ নারী অনুক্রমে শিবের পূজারী। সেই মত বংশানুক্রমিক প্রথা ছিল যে, যিনি হরধনুতে গুণ পরাতে পারবেন তিনিই বৃত হবেন পতিত্বে। সেখানে রামচন্দ্র গিয়ে সে ধনু গায়ের জোরে ভেঙেই ফেললেন ! কথা তো ভেঙে ফেলবার ছিলনা। পিতা সম্মতি দিলেন বিবাহের। আসলে আমরাও যে ভূখণ্ডের আদি অধিবাসী, এবং আমাদেরও ধর্ম মতে শিব মহাকাল আমাদের আরাধ্য, এইটি আত্মসাৎ করার জন্যেই রামচন্দ্রের মিথিলায় আগমন। এঁরা বিষ্ণু বলে এক দেবতার পূজা করেন। শিবকে তো মানেনই না, উপরন্তু তাঁকে দুর্নাম করেন। তিনি শ্মশানবাসী। তিনি নেশাতুর। জীবনধারণে তাঁর কোনও রুটিন নেই। এই বাউন্ডুলে নেশাচ্ছন্ন ইমেজটা তাঁর দেবত্বকে যথেষ্ট খর্ব করেছে। অথচ মহাকাল সমাহিত আত্মমগ্ন যোগী। তিনি নেশাচ্ছন্ন নন। শ্মশানে বাস অর্থে তিনি জাগতিক ভোগ সুখের কারবারী নন। সুতরাং যে কেউ তাঁকে পূজা করবে সে সম্পূর্ণ নির্বাসনা হয়ে তাঁর পূজা করবে। তিনি ইচ্ছেপুরন করবার জন্যে বসে নেই। উল্টে ওরা বোঝালেন  বিষ্ণু জগতের পালনকর্তা। তাঁর পূজা করলে জাগতিক সুখ সমৃদ্ধির ইচ্ছে পূর্ণ হবে। আর শিব হলেন ধ্বংসের দেবতা। তিনি তোমার সংসারের প্রলয় করে ছাড়বেন। ঠিক যেমন দশাননের নাশ হতে চলেছে। উত্তরাপথে রামচন্দ্র ভালোই সমর্থক জোগাড় করে ফেলেছেন।
    মন্দোদরী এমন কথা কখনও শোনেননি। বললেন। সখী থেমোনা। আরও বলো। আমার কৌতূহল হচ্ছে।
অতঃপর...।  

সভ্যতার সংকট ৪

তামিল  বিজ্ঞানী হনুমান মহাবীর এসেছেন সিংহলে। তিনি ভেষজবিজ্ঞানে দিকপাল। অধুনা এর সংগে যোগ হয়েছে রসায়ন। সে আবার উদ্ভট বস্তু। রাজা রাম নাকি সময় সময় খুব ভীত হয়ে পড়েন। শত্রুসৈন্য আক্রমণ করলে কিভাবে তার মোকাবেলা করবেন। মহাবীর তাই রাজার নির্দেশে এসেছেন সিংহল। সিংহলে আসার তাঁর কোনও মানা নেই। সিংহল রাজ্যে হরদমই আসাযাওয়া করে থাকেন দাক্ষিণাত্যের এইসব রাজ্যের অধিবাসীরা। রাজপুরীতে অতিথিসেবার সাজ সাজ রব। রাজা খুব বিদ্যাবৎসল। তিনি বিদ্বানের আদর করেন। উপরন্তু মহাবীর অসামান্য প্রতিভাধর।  রাজপুরীর সুমুখে সিংহদুয়ার সেজে উঠল নানা পত্রেপুস্পে। মহাবীর এলেন এবং যারপরনাই প্রীত হলেন। সিংহলের সম্পদ একবার যে চোখে দেখেছে সে আর ভুলতে পারেনা। রাজ দরবারে পরম সাদরে আনা হোল তাঁকে। রানী মন্দোদরী ও সেসময় দরবারে বসে আছেন।  দশানন সবিনয়ে জিজ্ঞেস করলেন - বলুন মহামতি, কি হেতু আগমন? রাজা আঁচ করতে পারছিলেন যে অশোক কাননের বিরল ভেষজ সম্ভারের আকর্ষণেই মহাবীরের এখানে আসা। তবুও একবার জেনে নিতে হয়। গবেষণার জন্য তিনি কি চান। হনুমান ও অশোক কাননের কথাই ভাবছিলেন। কিন্তু হঠাৎ চোখ পড়ল স্ফটিক স্তম্ভে। রাজার দরবার কক্ষটি দাঁড়িয়ে আছে অগুন্তি স্ফটিক স্তম্ভের উপর। মহাবীর আগে কখনও দেখেননি এইরকম। তাঁর রাজ্যের অধিকাংশই ঘন অরন্য ও শস্যক্ষেত্র । সেখানে নাগরিক সভ্যতার এরকম বিকাশ ঘটেনি। ফলে স্ফটিক স্তম্ভের অদ্ভুত আলো বিচ্ছুরণ দেখে তাঁর মনে হোল এ নিশ্চয়ই অমূল্য কোনও মণি মাণিক্য। তিনি ভেষজ ভুলে রাসায়নিক অস্ত্রের কথা চিন্তা করতে লাগলেন। আচ্ছা, যদি এই স্ফটিকের মধ্যে লুকিয়ে রাখা যায় আণবিক বোমা ? তিনি কৌতূহলের বশে লাফ দিয়ে পড়লেন একটি স্তম্ভে । ভুললে চলবেনা যে মহাবীর উচ্চমানের অ্যাথলিট ছিলেন। আরণ্যক রাজ্যে উচ্চ বৃক্ষশাখায় হেলায় এক তরু থেকে অন্য তরুতে বিচরণ করতে পারতেন। এই আরজ গুলো মরুশ্ন দেশের লোক ! ব্যাটারা অরণ্যের বোঝে কি ? মন্দোদরী সেই স্তম্ভের কিনারেই বসেছিলেন । বিপদ বুঝে বললেন - করেন কি মহামতি ? স্তম্ভ ভেঙে পড়লে যে দরবারের ছাদ ভেঙে পড়বে !  হনুমান অপ্রস্তুত হলেন । নতুন আণবিক বোমাটি তবে কি করে পরখ করা যায় ? দশানন অভয় দিলেন । আপনি এই রাজ্যের যে কোনও স্থানে সেটি প্রয়োগ করতে পারেন । হনুমান অবাক । কিন্তু তাতে যে সিংহলের প্রভুত ক্ষতি ! দশানন প্রশ্রয়ের হাসি হাসলেন । মহাবীর আমার পুত্র মেঘনাদ এখন স্পেস রিসার্চে ব্যাস্ত । জানেন তো ? তবু সে বলেছে এমন কোনও বিপদ এলে তাকে একবার জানাতে  । রাম যে এধরণের পদক্ষেপ নিতে পারেন সে আমি আঁচ করেছিলুম । হনুমান নিশ্চিন্ত হলেন । হুম । সে অনেক বড় বিজ্ঞানী । ক্লাইমেট কন্ট্রোল থেকে শুরু করে সাবস্টিটিউট পাওয়ার প্রোডাক্শান সবেতেই অনায়াস বিচরণ । 

সভ্যতার সংকট ৩

           সীতা ও মন্দোদরী, দুই সখী মহানন্দে দিন কাটাচ্ছেন অশোক কাননে। চিরদিনই উদ্ভিদ তাঁকে আকর্ষণ করে। তাই সীতা নাম না জানা সব লতাগুল্ম বৃক্ষরাজি ও ফুলফলের জগতে মগ্ন হয়ে আছেন। বেশ ক'টি সিংহলী সুন্দরী তাঁকে দেখাশুনো করে। এদের রাম ও লক্ষণ চেরী সম্বোধন করেন। চেরী হোল চের শব্দটির স্ত্রীলিঙ্গ। দ্রাবিড় সভ্যতার নয়নতারা, সিংহলকে আর্য রাজারা চের রাজ্য নামে ডাকে। চের অর্থ রাক্ষস, পিশাচ। সীতার এদের সম্পর্কে কোনও বিরূপ মনোবৃত্তিই নেই। তিনি নিজে অনার্য  রাজকন্যা। বিদেহ তখন মগধ বা বগধ রাজ্যের মধ্যে পড়ে।
              এরকম করে যখন দিন কাটছে তখন রাজা দশানন গুপ্ত মন্ত্রণালয়ে মিলিত হয়েছেন বাকি দুই ভ্রাতার সঙ্গে। দ্বিতীয় কুম্ভকর্ণ মহাযোগী। তিনি বৎসরের ছ মাস সময়ে সমাহিত থাকেন। সমাধি থেকে বুত্থিত হলে, বাকি ছ মাস নগরীর আত্মিক জ্ঞানলোভী মানুষদের সঙ্গে আধ্যাত্মিক আলোচনায় অতিবাহিত করেন। এসময়ে অশোক কাননের বিভিন্ন স্বাদিষ্ঠ ফলমূল খান তিনি। তাঁর মত জ্ঞানী ধীর ও স্থির ব্যক্তি এরাজ্যে আর নেই। তৃতীয় বিভীষণ। কূটনৈতিক বুদ্ধিতে অগ্রজদের থেকে অনেক এগিয়ে। রাজার প্রতি অসীম শ্রদ্ধা। যেন তেন প্রকারেন সিংহলকে সর্বরকমে বিপদমুক্ত রাখার দায়িত্ব যেন তাঁর। মোটামুটি এক্সটারনাল এফেয়ারস মানে বিদেশ সংক্রান্ত প্রতিরক্ষার বিষয়টি তাঁর হেফাজতে। দশানন এরকম কুটিল চিন্তাভাবনা করতে ভালোবাসেননা।
           আজ বিভীষণ এক মহা দুশ্চিন্তার সংবাদ এনেছেন। রাজা রাম নাকি সিংহলে প্রেরন করেছেন তাঁর বিশ্বস্ত,  তামিল বিজ্ঞানী মহাবীর হনুমানকে। সে এসে দেখে যাবে সীতা কেমন ভাবে বন্দিনী জীবন কাটাচ্ছেন। দশানন যারপরনাই বিস্মিত ! সেকি ! তিনি বন্দী হবেন কেন ? তিনি মাননীয়া অতিথি ! বিভীষণ জানালেন - এই রাজাগুলো কিচ্ছু বোঝেনা। রাজ পরিবারের আতিথ্য কি বস্তু সে এরা কি করে জানবে? দশানন জিজ্ঞেস করলেন - সীতা কি স্বাধীন নন? তাঁর স্বামি কি নিজের স্ত্রীকে ক্রীতদাসী হিসেবে রেখেছেন ? বিভীষণ মাথা নাড়লেন। জানিনা। এরা তো দাসপ্রথাকে সর্বক্ষেত্রে প্রয়োগ করছেন। স্ত্রী, আত্মীয়স্বজন, রাজকর্মচারী, সেনাবাহিনী। এমনকি সদ্যপ্রাপ্ত বন্ধুদেরও দাস বানিয়ে নিচ্ছেন। দশানন হতবাক - কেমন করে ? বিভীষণ বিষণ্ণ হাসলেন। কেমন করে আবার ? দেখছেন না তামিলদের কেমন ক্রয় করে ফেলেছেন আগাম রাজ্যের লোভ দেখিয়ে ? ধরার শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীরাও এখন ওদের দাস।