একটি বিকেল বেলার গল্প

চাটুজ্যেদের রোয়াকে আর হয়ত কিছুদিন পর থেকে বসা চলবেনা।  কানাঘুষো শোনা যাচ্ছে যে বাড়িটা প্রমোটার কে দেওয়া হবে।  এ খবরে আমাদের মন অতি বিষন্ন।  বিশেষত টেনিদার।  এখানে ও এখনও যেভাবে রাজা উজির মারে আর আমাদের গ্যাঁট কাটে সেটা অন্য কোথাও অসম্ভব।  আর আমি তো মনে মনে স্থির করেই নিয়েছি একবার রক হাতছাড়া হলে আর টেনি মুকুজ্জের সাথে একেবারে no relation . ওর হাতে যা হেনস্থা হওয়ার আমিই বেশি হয়েছি।  তবুও এতদিনের আড্ডাস্থল , মন কি মানে ! কাল বিকেলে সেই রকেই তো যা একখানা কান্ড হল কি বলব।  সেই কথাটা বলতেই এই ঠাঠা পোড়া রোদ্দুরে আমি এলাম।
                              হলো কি , গতকাল টেনিদা যথারীতি বাড়ির নিচে থেকে প্যালা প্যালা are you dead ? বলে চীৎকার শুরু করল।  মেজদার কানমলার ভয়ে দৌড়ে নেমে এসে বললাম একটু কি ভলিউম কন্ট্রোল হয়না ? কি বলছ তাড়াতাড়ি বল।  আমি joint এর প্রিপারেসন নিচ্ছি।  টেনিদা বিশ্রী ভাবে ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ করে হেসে বলল এখন তো আয়।  আগে পাড়ার মান সম্মান তারপর নয় পড়ার মান।  কোনো উপায় নেই দেখে ওর সাথে রোয়াকে গিয়ে বসলাম।. দুজনে বসে গুলতানি শুরু করব ঠিক তখনি এক বয়স্ক অবাঙ্গালী লোক এসে রকে বসলেন।  টেনিদা মুখ খিচিয়ে বলল - ভ্যালা জ্বালা।  ভদ্রলোক কিন্তু ততক্ষণে হাসি হাসি মুখ নিয়ে কাছে চলে এসেছেন।  আমাদের দিকে তাকিয়ে কথাও শুরু করে দিলেন।  টেনিদা  ওর পক্ষে যতটা সম্ভব ফিসফিস করে বলল - এই এটা দালাল।  প্রোমোটার  এর।  পাত্তা দিসনা। কথা শুরু হল।
        ভদ্রলোক জানালেন ওঁর নাম রামরতন ঝুনঝুনওলা।  উনি শুনেছেন এ বাড়িটা বিক্রি আছে তাই খোঁজ নিতে এসেছেন। বললেন - সুনেলম কি এ মাকান ঠো বিচবে তো ও বেপারে একটু কোথা করতাম।  টেনিদা বলল - ভুল শুনেছেন। এ বাড়িটা ভুতের বাড়ি।  খুব শিগগির এটা কর্পরেসান থেকে পুরোপুরি ভূতেদের বাসস্থান বলে ডিক্রি দেবে।  কিনলে বেদম ঠকা হবে।  ঝুনঝুনওলা বললেন - ই কোথা আপুনি বিশোয়াস কোরেন ? ভূত উত কুছু আছে না কি ভাজারি বাবু ? কর্পরেসান থিকে একটু ঝামেলা হচ্ছে তো সে হামি বুঝে নেবে।  টেনিদা ওর নামের এরকম দুরবস্থায় বিপুল চটল।  কিন্তু মুখে কিছু বলছেনা।  ঠিক এই মোক্ষম সময়ে ওপরের বারান্দা  থেকে চাটুজ্যে গিন্নী এক বালতি জল ফেলল।  গরমে জলে ভিজতে মন্দ লাগলনা। আর এই ফাঁকে টেনিদার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হলো।  ঝুনঝুনওলা কিন্তু খুব একটা কাবু হলেননা।  বললেন - হামি পান্ডিত কে লিয়ে আসব।  পূজা উজা দিতে হোবে।  হাবান করাইতে হোবে।  বাস।  ঔর কি।  ভদ্রলোক ফাইন ধুতি পরে আছেন।  পা গুটিয়ে বাবু হয়ে গুছিয়ে বসলেন।  যাবার কোনো নামই করছেন না।  বেগতিক দেখে আমি বললাম রবিবার দেখে আসুন।  আমি কাকাবাবুর সাথে কথা বলিয়ে দেব।  আজ তো কেউ নেই।  টেনিদা ওর কনুই দিয়ে এক গোত্তা মারল আমার পাজরে।  খুব জোরে লাগলেও আমি পাত্তা না দিয়্রে ওকে বললাম - আরে বাবা এখনকার মত তো রেহাই পাই।  এঁকে ভাগ দিতে হবে বলে টেনিদা আজ কিছু খাওয়ার ও নাম করছেনা।  ভদ্রলোক গুনগুন করে ভজন গাইছেন।  মনে হল খুব ধার্মিক গোছের।
           হঠাত একটা লালবাতি ওয়ালা পুলিশের গাড়ি এসে রকের সামনে থামল।  টেনিদার তো ভয়ে মুখ শুকিয়ে গেছে।  ও যে কিরকম সাহসী সে তো সব্বাই জানে।  ঝুনঝুনওলা কিন্তু এক ভাবে বসে।  চোখ বন্ধ করে গেয়ে চলেছেন।  গাড়ির দরজা খুলে ততক্ষণে এক অফিসার , খুব স্মার্ট একেবারে ঝকঝকে যাকে বলে , সামনে এসে দাঁড়ালেন। বিশুদ্ধ হিন্দিতে বললেন বাবুজি ঘর চলিয়ে।  বিনয়ের সাথে অনুযোগ করলেন যে কেন উনি এভাবে একা একা এসেছেন।  তাও এতদুরে।  আমরা তো অবাক।  টেনিদা নাক টাক চুলকে বলতে চাইল যে এ ব্যাপারে আমাদের কোনো ভুমিকা নেই।  আমরাও জানিনা যে উনি বাড়িটা কেন কিনতে চান।  বিশেষ করে ওঁর ছেলে যখন এত বড় একজন পুলিশ অফিসার।  আমি হাসি চাপলাম।  পুলিশের যেন ঘর বাড়ি লাগেনা।  অফিসার আরো বিনয়ের সঙ্গে আমাদের ধন্যবাদ জানালেন ওঁর বাবাকে বসিয়ে রাখার জন্যে।  বললেন পিতাজি কি কারণে একটু মানসিক অসুস্থতায় ভুগছেন।  ডাক্তার হাসপাতালে দিতে বলেছিলেন কিন্তু পিতাজিকে এ অবস্থায় চোখের বাইরে করতে পারবেননা।
টেনিদা শেষবারের মত বলতে চাইল - উনি যে বাড়িটা কিনবেন বলছিলেন ? অফিসার হেসে বললেন ওই তো ওঁর অসুবিধে।  অসুখ।  তারপর  হাতজোড়  করে বিদায় চাইলেন।  ঝুনঝুনওলা কিন্তু খুব একটা রাজি ছিলেননা।  সঙ্গের লোকেরা অনুনয় বিনয় করে নিয়ে গেলেন।
         টেনিদা উদাস সুরে বলল - দেখ কি সুসন্তান।  কেমন বুঝিয়ে নিয়ে গেলেন। আমি নিঃশাস ফেলে বললাম - যাক আর একজন প্রোমোটার কে সরানো গেল।  তারপর দুজনে রোযাকটার গায়ে হাত বুলিয়ে বাড়ি ফিরে এলাম।   


No comments:

Post a Comment