কমলাকান্তের প্রসাদ

                          গৃহিণী  সাপ্তাহিক কিটি পার্টিতে যোগদান করিয়াছেন, গৃহে নাই। অধুনা ভৃত্য দিগের অন্যায় ব্যবহারে আর অন্তরাত্মা কাঁদিয়া উঠে না। গৃহিণী না থাকিলে তাহাদের উপস্থিতি আশা করাও বাতুলতা । এমতাবস্থায় সান্ধ্য জলযোগের কোনরূপ  ব্যাবস্থা দেখিতে না পাইয়া বৈঠক খানা ঘরে নিভন্ত রঙিন বাতি জ্বালাইয়া নিজ হস্তে প্রস্তুত জল-যোগে ব্যাপৃত হইলাম । প্রতি সন্ধ্যায় একই পানীয় সেবনে এক প্রকার মনোবিকার দেখা দিয়াছে । এই পানপর্বটি আনন্দ প্রদান করিতে অক্ষম হইয়া পড়িয়াছে । চিন্তা করিয়া এই সিদ্ধান্তে উপনীত হইলাম যে, ইহার ও বয়স বাড়িয়াছে । অনন্তর নিজের প্রতি অশেষ ও অকৃত্রিম করুণায় দ্রবীভুত হইলাম। এ পৃথিবীতে আসার কারণ কি? এই প্রকার দার্শনিক চিন্তা যখন মন পরিপূর্ণ ভাবে অধিকার করিয়াছে, তখন ভাবিয়া দেখিলাম পরের চিত্তাপহরনই এক্ মাত্র কর্তব্য । শুধু এই কারণেই পৃথিবীতে আগমন । পুত্র জন্মিয়াছে - এই বাক্যের মধ্য দিয়াই পরিবারস্থ বয়োজ্যেষ্ঠ গনের মনোহরণ হইয়াছিল কল্পনা করিতে পারি । বাল্যে ও কৈশোরে বিদ্যাসাগর মহাশয় বর্ণিত সুশীল বালকের পদাঙ্ক অনুসরণ করিয়া পিতামাতা ও গুরুদিগের চিত্তাপহরন করিতে সমর্থ হইয়াছিলাম। কিন্তু এ পর্যন্তই। ইহার পর যার চিত্ত অজস্র ছিদ্র লইয়া আমার প্রতিটি উদ্যোগ কে প্রতিহত করিতে থাকে ও এক্ষনেও করিয়া চলিয়াছে সেই চিত্ত আমি অপহরন করিতে পারি নাই । বরং বলিয়া কৃতার্থ হইব যে এইটি আমার অকৃতকার্যতার পরিচয় বহন করে । যে দুইটি পদ্ধতি অনুসরণ করিয়া ইঁহার চিত্তসুখ আনয়ন করিব ভাবিয়াছিলাম তাহার দুইটিই এক্ষনে তাঁহার হস্তগত । প্রথমটি হইল স্ত্রীস্বাধীনতা । এইটি অধুনা প্রাচীন বঙ্গীয় শব্দ কোষে শোভা পাইতেছে। কারণ ইহা এখন নিঃশ্বাস প্রশ্বাস এর মতই অদৃশ্য অথচ বর্তমান । দ্বিতীয়টি হইল অর্থের প্রাচুর্য। ইহা যে যে উপায়ে ঘটিয়াছে তাহার সব কটি বলিলে শূলে যাইবার সম্ভাবনা আছে । যদিচ বর্তমান অবস্থায় তাহা কাম্যই হইবে ।
                     এ সকল দার্শনিক বিলাপে যখন অন্তরাত্মা কালব্যায় করিতেছে সেই সময়ে একটি শব্দ কর্ণগোচর হইল - মেও । মনে হইল আমার এই প্রকার দুর্দশা দেখিয়া স্বয়ং বিধাতা পুরুষ উপহাস করিতেছেন । হৃদয়ের তাপ চৌগুণ বৃদ্ধি পাইল । অর্ধনিমীলিত চক্ষু দ্বয় তুলিয়া দেখিতে প্রয়াস পাইলাম, কিন্তু নজরে পড়িল না। একটি সূক্ষ্ম হাসির রেখা অধরে খেলিয়া গেল । বিধাতাকে কেই বা কবে দর্শন করিয়াছেন । পুনর্বার শব্দ উঠিল - মেও । মনে মনে বলিলাম - কি পিতা? কি  নিমিত্ত অধমের নিকট আগমন? তন্মুহুর্তে হস্তে একটি পুরিয়া পড়িল । যৎপরোনাস্তি আহ্লাদিত হইলাম। নিশ্চয় অমৃতই হইবে । বিধাতা অমৃত ব্যতীত গরল দিতে পারেন না। পুরিয়াটি খুলিয়া মুখে ঢালিলাম । আঃ, কি তৃপ্তি। সকল দুঃখ ভুলিলাম ।


---------------------------------------------




               সকাল্ বেলায় গিন্নির মুখ তোলো হাঁড়ি । ছি ছি ! বাড়ি না থাকলেই এইসব । বোঝানো অসাধ্য যে কাল ফাঁকা বাড়ি দেখে কমলাকান্ত স্বয়ং ভর করেছিলেন । প্ল্যানচেট ছাড়াই । 

No comments:

Post a Comment