বাবা, এদিকে আসুন, এখানে এই সিট দুটো আমাদের। মেয়েটির গলা শুনতে পেলাম। দেখতে পেলামনা। এক বয়স্ক ভদ্রলোক ভেতরে ঢুকে এসে বসলেন । ট্রেনের কামরা বেশ ফাঁকা। আমি কলকাতায় ফিরছি। মাত্র দুদিনের অদর্শনেই আমার গৃহিণী আমায় চোখে হারান। বন্ধুবান্ধব মহলে এ জন্য সকলে আমাকে বেশ হিংসে করে। 'এত যত্ন এত নজর যদি আমাদের বউয়েরা দিত তো বর্তে যেতুম। কোনোদিন যদি অকারনে অফিস কামাই করি তো কি বিপুল বিরক্তি। খবরের কাগজটা সকাল থেকে নেড়ে নেড়ে মুখস্থ হচ্ছে, জায়গায় আর রাখা হলনা। সারাদিন ধরে চা করা সম্ভব নয়। ঘরে বাকি আরও কাজ থাকে। বরকে দেখিয়ে দেখিয়ে ছেলের সাথে আদিখ্যেতা। বাবু কি খাবে সোনা? আহা !' এদের কাউকে গোপন কথাটি ফাঁস করিনি। তা হল গৃহিণী খুবই সন্দেহপরায়ণা। দোষ আমারই। কবে কোন ছেলেবয়সে একটি মেয়েকে ভালো বেসেছিলাম সে কথা তাঁকে খোলা মনে জানিয়ে ছিলাম। তিনিও বেশ মুক্ত মনের পরিচয় দিয়েছিলেন। কিন্তু এই যে যত্ন ও নজরের আধিক্য যা কিনা আমার গলায় ফাঁস হয়ে বসে থাকে তা শুধু যেন সেই সন্দেহের বশবর্তী হয়ে করে চলা কাজ। এরকম মনে হওয়া কি খুব দোষের? যাই হোক, থেকে থেকেই গৃহিণীর ফোন। কদ্দুর পৌঁছলাম, কিছু খাবার সাথে এনেছি কিনা, আজ বাড়িতে পাবদা মাছের ঝাল (আমার নাকি খুব প্রিয়, কোথা থেকে জেনেছে কে জানে) , ইত্যাদি ইত্যাদি। চুপ করে বাইরের দৃশ্য দেখছিলাম। ট্রেনের জানলা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখা আমার খুব প্রিয় শখ। এখন ভদ্রলোক এসে বসতে ওনার দিকে তাকালাম। দেখলাম, বয়েসের তুলনায় যেন একটু আগেই বার্ধক্য ধরেছে। মাথার চুলে তেমন পাক ধরেনি বটে, কিন্তু মুখে যেন গভীর যন্ত্রনার আঁকিবুঁকি। ভদ্রলোক কেমন যেন আনমনা। এবার সঙ্গের মেয়েটি ভেতরে এসে বসল। তার পরনে তাঁতের হালকা রঙের শাড়ি। কালো পাড়। রোদের হলকা থেকে বাঁচতেই মনে হয় মাথায় তুলেছে কাপড়ের আঁচলটা। কালো পাড় তার রোদে রাঙা ফর্সা মুখটিকে ঘিরেছে যেন মধ্যাণ্হের তপ্ত সূর্যকে ঢেকেছে এক কালো মেঘের বৃত্ত। সূর্যের তাপ থেকে সূর্যকে রক্ষা করতে। মেয়েটির বয়স তিরিশের আশেপাশে। সিঁথি সাদা। দেখলাম ভদ্রলোক ডাকছেন - বউমা, একটু জল দেবে? এতক্ষণে বুঝতে পারলাম যে ভদ্রলোক শ্বশুরমশাই আর এটি তাঁর বউমা।
হঠাৎ মেয়েটি ডেকে উঠল তীর্থদা না? আমাকে চিনতে পারলে না? আমি তো বৃষ্টি। প্রথমে অবাক হলাম, বৃষ্টি? সেই বৃষ্টি ! আজ এতদিন পর রেলগাড়ির কামরায় হঠাৎ দেখা!! কিন্তু ওর কপালে সিদুর নেই কেন? কালো পেড়ে শাড়ি কেন? আর এই বৃদ্ধের মুখেই বা কেন এত যন্ত্রণার আঁকিবুঁকি ? প্রশ্নগুলো গলায় আটকে রইল।
বাড়ি ফিরে স্ত্রীর যত্ন করে বেড়ে দেওয়া ভাত খেতে খেতে মনে হল, আজকের কথাটা বলেই ফেলি। দেখিই না কিভাবে নেয়। শুনে প্রথমটা থমকে গেল। তারপর আমার পিঠের কাছে দাঁড়িয়ে পিঠে হাত রেখে বলল আহা রে! স্বামি নেই? কি বা বয়স! স্পষ্ট দেখতে পেলাম স্ত্রীর মুখেও সেই এক রকমের যন্ত্রণার আঁকিবুঁকি।
হঠাৎ মেয়েটি ডেকে উঠল তীর্থদা না? আমাকে চিনতে পারলে না? আমি তো বৃষ্টি। প্রথমে অবাক হলাম, বৃষ্টি? সেই বৃষ্টি ! আজ এতদিন পর রেলগাড়ির কামরায় হঠাৎ দেখা!! কিন্তু ওর কপালে সিদুর নেই কেন? কালো পেড়ে শাড়ি কেন? আর এই বৃদ্ধের মুখেই বা কেন এত যন্ত্রণার আঁকিবুঁকি ? প্রশ্নগুলো গলায় আটকে রইল।
বাড়ি ফিরে স্ত্রীর যত্ন করে বেড়ে দেওয়া ভাত খেতে খেতে মনে হল, আজকের কথাটা বলেই ফেলি। দেখিই না কিভাবে নেয়। শুনে প্রথমটা থমকে গেল। তারপর আমার পিঠের কাছে দাঁড়িয়ে পিঠে হাত রেখে বলল আহা রে! স্বামি নেই? কি বা বয়স! স্পষ্ট দেখতে পেলাম স্ত্রীর মুখেও সেই এক রকমের যন্ত্রণার আঁকিবুঁকি।
নির্বাক পথ চলা
ReplyDelete