খোঁজ

কি যে ফ্যাকড়া হয়েছে l  এই গরমে যেতে হচ্ছে লালমাটির দেশে l  যতই মনোহরণ হোক তার রূপ কিন্তু এই গরম সহ্য করার শক্তি নেই l  আর যাই হোক জংগ্লি জায়গায় থাকা বেশ কষ্টকর l বিশেষ শহরে জন্মাবধি l
ট্রেনের জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিলাম l  junction স্টেশনে নেমে লোকাল ধরেছি l  কড লাইনের ট্রেন l  দুপুরের গরমে লোকজন ও কম l  উল্টোদিকে একটি গেঁয়ো লোক পুঁটলি বোঁচকা নিয়ে দুটি ছেলের সাথে বসে l  আমি যে ওখানে বেশ একটু বেমানান তা বোঝাই যাচ্ছিল l  তাই নিজের তাগিদেই আলাপ জুড়লুম l  বললুম - হ্যাঁ দাদা, বীরমুন্ডি আর কদ্দুর ? একটি ছেলে বলল - হ, সী ইখন আর র দুই ইক ঘণ্টার বেপার l  আপনি সিখানে কুথায় যাবেন বাবু ? বললাম - দেখি, কোথায় জায়গা পাই l  তারা তো অবাক l  তাদের ভাষায় বললে, সে কি বাবু ? ওই বুনো জায়গায় কোথায় থাকবেন ঠিক করেননি ? শখের বাবুদের জন্যে তো এ জায়গা নয় l  বেড়াতে যাচ্ছেন ? ঘাড় নাড়লাম l  সঙ্গের লোকটি কিন্তু চুপ l  অন্য ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম ওরাও ওখানেই নামবে l  বীরমুন্ডি থেকে আমায় যেতে হবে গরুর গাড়ি হলে আরো মাইল আস্টেকের পথ l
        শেষ পর্যন্ত গন্তব্যে নামলাম l  প্রায় সন্ধ্যে l  এখান থেকে গাড়ি ভাড়া করব শুনে এতক্ষণে লোকটি বলল, এই সন্ধ্যে বেলা জঙ্গলের পথে যাওয়া ঠিক হবেনা l  কাল সকালে যান l  আপনি তো বেড়াতেই এসেছেন l   লক্ষ্য করে দেখলাম লোকটি একটু খুঁড়িয়ে হাঁটছে l  বেশি নজর না দিয়ে বললাম তাহলে একটা হোটেলের খোঁজ করতে হয় l  এবার তিন জনেই হেসে ফেলল l  নাহ্ বাবু কোনরকম খবর না নিয়েই এসে পড়েছেন l  এত ভয়ংকর এখন এই জঙ্গল মহল যে হয় জঙ্গি নয় বাহিনী কারোর না কারোর হাতে প্রাণ যাওয়া কোনও ঘটনাই নয় l  আমি ভয়ে বিস্ময়ে মুখটা যত সম্ভব কাঁচুমাচু করে বললাম - যেতে যে হবেই l  এখানে থাকব কোথায় ? লোকটি বলল, আমাদের সাথে চলুন l  রাত্তির টা কাটিয়ে কাল সকালে যাবেন l  ওখানে গিয়েও যে কোথায় থাকবেন কে জানে ? বেশি কথা না বাড়িয়ে বললাম - চলুন, অগত্যা l  এত সন্ধ্যে হয়ে যাবে বুঝিনি যে l
         নিঝুম জঙ্গলে চারদিক থমথমে l  খাওয়া দাওয়ার পর  কুঁড়ের সামনের উঠোন টায় বসে আছি, সামনে আমার আশ্রয় দাতা l  এত ক্ষণে তার নাম জেনেছি l  অর্জুন মাহাতো l  এর খোঁজেই এসেছি l  কুখ্যাত বিপ্লবী l  জঙ্গল মহল একেবারে কাঁপিয়ে রেখেছে l  নিজের পরিচয় গোপন রেখেছি l  বাঘের ঘরে ঢুকেছি l  প্রাণের মায়া করিনা কিন্তু সরকারের কাজ প্রাণ দিয়েও করি l  সত্ অফিসার বলে সুনাম আছে l  তবে এ ধরনের কাজে এই প্রথম l
      রাত কাটিয়ে সকালে বেরোবার তোড়জোড় করছি l  এই একরাতে ই দেখেছি কি ভীষণ গরীব এরা l  খাদ্য নেই আশ্রয় নেই l  বস্ত্র তো দূরের কথা l  শিক্ষা দীক্ষা নির্মম ঠাট্টার মত শোনায় l  লোকটি কিন্তু এত কিছুর মধ্যেও খুব শান্ত l  সকালেই কিছু লোক এসেছে ওর কাছে দেখলাম l  খুব আলোচনা চলছে কি নিয়ে l  আমি গরজ দেখালাম না l  কি দরকার ? জানতে পারলে প্রাণ নিয়ে বেরোতে পারবনা l
       একটা গাড়ি এরাই ঠিক করে দিয়েছে l  আমাকে বিদায় জানাবার আগে লোকটি একান্তে ডাকল l  বলল - বাবু, গাড়ি নিয়ে সোজা বীরমুন্ডির কাছের শহর টায় চলে যাও l  ফিরতি ট্রেনে ঘরে ফের l  তুমি কি কাজে এসেছ সে আমরা সব্বাই জানি, কিন্তু তোমাকে চেনেনা কেউ l  আমি চিনতে পেরেছি l  তোমাকে কেন ছেড়ে দিচ্ছি ? কারণ ঠিক তোমার মত দেখতে আমার বড় পুত টা l  সে দু বছর হল মারা গেছে পুলিশের গুলিতে l  আমার চোখের সামনে l  আমি তখন এসবে ছিলামনা l  তাকে বাঁচাতে গিয়ে গুলি আমার পায়ে লাগে l  সেই থেকে খুঁড়িয়ে হাঁটি l সেই থেকে যুদ্ধ শুরু l  তোমার আসার কথা জানতে পেরে ঠিক করেই ছিলাম যে নিকেশ করে দেব l  হলোনা ! তুমি যে ঠিক আমার পুত টার মত ! ভয় নেই l  একা এসেছ ! মুখটা না দেখলে তোমার বরাতে কি ছিল বলতে পারিনা, তবে এখনও সময় আছে l  আর কেউ জানবার আগে তুমি চলে যাও l
_______________

অফিসে ফিরে জানালুম - অর্জুন মাহাতো বর্ডার ক্রস করে গেছে l  আমাদের আওতায় আর নেই l 

2 comments:

  1. Ani ki sundor tor galper plot ar prekkhapat. Police er khatay Jara markamara bhayonkar, tadero ekta maromi mon thake. Khub bhalo laglo galpota.

    ReplyDelete
  2. বেশ ভালো - সীমানা ছাড়িয়ে

    ReplyDelete