মার্গ সন্ধান

         আশ্রমের একচ্ছত্র অধিপতি। পরম শ্রদ্ধেয় সন্ন্যাসী। এত দায়িত্ব, এত রকমের কর্মসূচী, অথচ তার মাঝেও শিশুর সরলতা। শিশু দেখলেই খেলায় মেতে ওঠেন। কখনও একদল বালক আশ্রম প্রাঙ্গণে খেলে বেড়াচ্ছে, তাদের সবচেয়ে ছোটটির হাতে একটি আপেল। গম্ভীর আলোচনার মাঝেই সেই আপেলটি আর সকলের চোখের আড়ালে লুকিয়ে রাখছেন। যাতে শিশুটি খেলা শেষে সেটি হাতে পায় আবার। উপস্থিত আশ্রমিকরা ঘটনাটি দেখছেন। কিন্তু মুখে কিছুই বলছেন না। ত্রিকালদর্শী মহামানবের শিশুর মত আচরণে হয়ত মনে কৌতুকের সঞ্চার হচ্ছে। বাইরে তার প্রকাশ নেই।
            এ হেন সন্ন্যাসীর দর্শনপ্রার্থী হয়ে এলেন একদিন একটি বছর বিংশতির যুবক। উন্নত ললাট, উজ্জ্বল চোখ, দীপ্তিময় চেহারা। দেখেই সম্ভ্রম জাগে। এত অল্প বয়সেও বেশ গম্ভীর। সন্নাসী তখন একদৃষ্টে সুরধুনীর দিকে চেয়ে বসেছিলেন। যুবক অবাক হলেন। তিনি মনে মনে ভেবেছিলেন যে সন্নাসী হয়ত সারা দিনমান জপে তপে, তপস্যায়, আরাধনায় মগ্ন থাকেন। কিন্তু হতাশ হলেননা। মহামানবের চিন্তার গতিপ্রকৃতি সাধারণ সংসারী জীবের বুদ্ধিবৃত্তির আওতায় পড়েনা।
            সন্ন্যাসী চোখ মেলে দেখলেন যুবককে। কাছে ডাকলেন। যুবক ভূমিষ্ঠ প্রণাম সেরে উঠে বসতেই চিবুকে, মাথায় হাত রেখে আদর করলেন। সস্নেহে দেখে চলেছেন যুবককে। কিছু পরে জানতে চাইলেন - কি চাও? কেন এসেছ আমার কাছে? তুমি নিজেই অমিত শক্তিধর!   যুবক জানালেন, শ্রীমদ্ভাগবত গীতা পড়ে তিনি নিস্কাম কর্মের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। তাই তাঁর মনে জেগেছে সন্ন্যাস নেবার বাসনা। একমাত্র এই পথেই তিনি নিজের জীবনের প্রকৃত অর্থ খুঁজে পাবেন। ত্রিকালদর্শী সন্ন্যাসী খানিক মৌন রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে, যেন সুপ্তোত্থিতের মত, বললেন - বাছা, তোমার প্রকৃত স্থান দেশমাতৃকার সেবায়। সেই হবে তোমার নিস্কাম কর্মের ক্ষেত্র। আমি পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি, তোমার অন্তসন্ন্যাস। তুমি সন্ন্যাসী হয়ে দেশমাতৃকার পূজা করবে, ঠিক যেমন আমি সন্ন্যাসী হয়ে মাতৃ সাধনায় নিরত। যুবক দীক্ষা যাচ্ঞা করলেন। পুনরায় সন্ন্যাসী জানালেন তিনি দীক্ষা দিতে অপারগ। দীক্ষার প্রয়োজন নেই। সাধনায় জয়লাভ অবধারিত। যুবক পথের দিশা পেয়ে ফিরে এলেন। সমস্ত শক্তি দিয়ে দেশ্ মাতার দুঃখ মোচনে আত্ম নিয়োগ করলেন।

--------------------------------------------------------------


সন্নাসী হলেন তৎকালীন রামকৃষ্ণ মিশনের অধ্যক্ষ শ্রীব্রহ্মানন্দ ওরফে রাখাল মহারাজ এবং যুবক হলেন নেতাজী সুভাষচন্দ্র বোস ।

4 comments: