সভ্যতার সংকট ২

অশোক কানন সিংহল রাজ্যের সবচেয়ে সুন্দর এলাকা।  রাজা দেশ বিদেশ থেকে নানা ফুল ফল লতা গুল্ম সব এনে রোপন করিয়েছেন।  সুশোভিত কানন সুগন্ধে আমোদিত সারাক্ষণ।  আপাতত জানকী এই বাগানে অবসর জীবন যাপন করছেন।  রানি মন্দোদরী আজ এসেছেন বাগানের শিবদেউলে পুজা দিতে।  স্বামী দশানন শিবের ভক্ত।  আজ একমাস তিনি সন্ন্যাসী সেজে পথে পথে ভিক্ষা করেছেন।  নিজ রাজ্যের সীমানা ছাড়িয়ে অরন্যে ঘেরা পার্বতভুমিতেও গিয়েছেন।  প্রজারা তাকে চিনে ফেললে অযাচিত ভিক্ষা দিয়ে ফ্যালে ।  সন্ন্যসীর ঈপ্সিত নয় তা।  এভাবেই ঘুরতে ঘুরতে তিনি অরন্যে এক বনচারীর কুটিরে গিয়ে পড়েন । গিয়ে দেখেন সেই অসভ্য রাজা এখন বনবাসে। এ তারই কুটীর । তখন জানকী একা।  দশাননকে দেখে স্মিত হাসিতে মুখ ভরিয়ে ফেললেন।  পরাক্রমশালী রাজা হলে কি হয়,  দশানন যে জগত বিখ্যাত!  তার ওপর শিব ভক্ত।  তার ও যে বাপের বাড়ি শিবের ভক্ত।  দশানন কথায় কথায় জানতে চাইলেন এই অসভ্য রাজার খপ্পরে কি করে পড়লেন জানকী ?  উত্তরে জানকী বললেন সবই কপাল।  নয়ত বিদেহ রাজ কেনই বা হরধনুতে জ্যা রোপণ করলেই জানকীর পতি হতে পারা যাবে,  এইকথা ঘোষনা করবেন!  ফলে ভূমিকন্যা হয়েও তাকে রামের ঘরণী হতে হল। বহুদিন পর দশাননের মত সহমর্মি কাউকে পেয়ে জানকীর আনন্দ ধরেনা।  সেকথা বুঝতে পেরে রাজা প্রস্তাব দিলেন - চলো ভগ্নী আমার প্রাসাদে চলো।  এই অবসরে রাজা জানালেন কিভাবে লক্ষণ তার ছোট বোনের সম্মানহানির চেষ্টা করেছিল।  তবে সে যুদ্ধ বিশারদ।  তাই পেরে ওঠেনি।  এই কথা শুনে জানকী বললেন তবে চলুন যাই আপনার সাথে।  শিব পুজা উদযাপন ও হবে,  আবার আত্মীয় সাথে কিছুদিন অতিবাহিত ও হবে।
        গভীর অরন্যে দিক ভুল যাতে না হয় তাই প্লেন থেকে সীতা নিজের ছোটখাট গহনাপাতি ফেলতে ফেলতে এসেছেন।  রাম তো তার ভাষা পড়তেই পারেন্ না।  চিঠি লিখে লাভ নেই।  লক্ষণকে আর বিশ্বাস করা চলেনা।  রাজা দেখলেন সীতা গহনা ফেলছেন।  তাই দেখে দশানন বললেন জানকী স্বর্ণ রাজ্যে চলেছ ভগিনী। এ গহনা তুমি আবার ফিরে পাবে।  সীতা হাসলেন।  অশোক কানন প্লেন থেকে দেখে সীতার মনে হল স্বর্গের নন্দন কাননও এর কাছে নিষ্প্রভ।  দশানন লক্ষ করলেন জানকীর মুগ্ধভাব। বললেন - ভগিনী,  আগামী চাঁদে শিবব্রত উদযাপন করব।  তুমি কাননের লতা কুটিরে এ কদিন বাস করো।  এর সৌন্দর্য উপভোগ করো।   অশোক কাননে কোনো শোক কষ্ট অসুখ প্রবেশ করতে পারেনা।  শিবের বর। আর যখন আমরা শিবের অনুগ্রহীত তখন এই কাননে আমরা সুরক্ষিত।

রানি মন্দোদরী জানকীর গলা জড়িয়ে ধরে বললেন - পিয় সহি,  আমার স্বামী তোমার অগ্রজ। বলো আজ এই উৎসব দিনে তোমার কিভাবে প্রীতিবিধান করতে পারি?  জানকী হাসলেন।  আপাতত ওই তামিল মহাবীর,  হনুমানকে এখানে ঢুকতে দেওয়া চলবেনা। সে ব্যাটা কিস্যু বোঝেনা , খামোখা মহা উত্পাত শুরু করবে । রানী হাসলেন । তাহলে রাম খবর পাবেন কিকরে ? সীতা মুখ নামিয়ে বললেন - উনি একটু বুঝুন যে অবাধ্য সহোদরকে এমন অন্যায়ে সায় দিতে নেই ।

সভ্যতার সংকট

দরবার ঘরে মন্ত্রী পরিবেষ্টিত হয়ে বসে আছেন দশানন । স্বর্ণ মানিক্যে মোড়া তাঁর দরবার ঘর । সিংহল রাজ্যে এখন মধ্যাহ্ন কাল । যশসূর্য মধ্যগগনে । দশানন তাঁর ক্ষুরধার মেধার সাহায্যে এই রাজ্যকে এক সমৃদ্ধ সভ্যতায় পরিণত করেছেন । তাঁর পূর্বপুরুষ তামিল রাজ্য থেকে বিতাড়িত হয়েছিলেন । এই দ্বীপরাজ্যের গরিমা এখন বিশ্বজোড়া ।
        তামিল রাজ্যে এখন দুই ভাইয়ের দ্বন্দ চলছে । ফল পোহাতে হচ্ছে প্রজাদের । বালী ও সুগ্রীব সমানে দ্বন্দ করছেন নিজেদের মধ্যে । অন্যদিকে কর্ণাট । তারাও সিংহলকে সমঝে চলে ।
      কিছুদিন হলো দশানন খবর পেয়েছেন তামিলদের এই দ্বন্দের সমাধানে এক আর্য্য নৃপতি এগিয়ে এসেছে । এই আর্য্যদের দেশ দখলের একটা প্রবণতা আছে । তিনি এদের মোটেই পছন্দ করেন না । কিন্তু তামিল সুগ্রীব নিজের স্বার্থে এই রাজাকে মিত্র পাতিয়েছেন ।
অথচ দশানন শুনেছেন আর্য্যরা তামিলদের বানর বলে ডাকে । কর্ণাটদের ভালুক । আর সিংহলিদের রাক্ষস । সিংহলিদের পরাক্রমকে ভয় পায় অথচ ব্যঙ্গ করতেও ছাড়েনা । আর কিইবা বলবেন দশানন ! তামিল সুগ্রীবই বা কিকরে এই রাজার সহায়তা নেয় ? তিনি তো জানেন কি ভীষণ বিজ্ঞানবুদ্ধি ধরে এই তামিল গুলো । শুধু ঝগড়া বিবাদ করেই নিজেদের দুর্বল করে ফেলেছে ।
         আজ মন্ত্রীসভায় বিশেষ আলোচনা ছিল কিভাবে আর্য্যদের সাম্রাজ্যবাদী গতিকে রোধ করা যায় । কারণ সিংহলের ধনসম্পদ তাদের লোভের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে । হঠাত ঝড়ের বেগে ঘরে প্রবেশ করল শুর্পনখা । এই ছোট বোনটির প্রতি রাজার অশেষ দুর্বলতা । রানী মন্দদোরী ও তাই নিয়ে রাজাকে মধুর ঠাট্টায় বিদ্ধ করেন । রাজা মুখ তুলে যথাসম্ভব গম্ভীর স্বরে জানতে চাইলেন কি ব্যাপার ? একটা জরুরি মিটিংএ এভাবে কেন ঢুকে আসা ? শুর্পনখা তার সুন্দর ভুরু তুলে নাকের পাটা ফুলিয়ে জানতে চাইল তারা ছ জন বন্ধু একটু সাগর পেরিয়ে ওপারে গিয়ে জঙ্গল সাফারি করতে চায় । রাজা স্তব্ধ । মানে ? ছটি দুগ্ধপোষ্য বালিকা ? কী প্রস্তাব !! অসম্ভব । ওই ভীষণ শ্বাপদসংকুল অরণ্যে মাত্র ছটি মেয়ে । অনুমতি মিলবেনা । শুর্পনখা মুখ লাল করে মাথা নীচু করে বলল - দাদা তুমি ভুল করছ । আমি বেশ কয়েকটা ক্ষেপণাস্ত্রতে ট্রেনিং নিয়েছি । বন্দুক চালানোর প্রশিক্ষণ তুমিই দিয়েছ । আর , ইয়ে , মানে তুমি নিজেই স্বীকার করেছ যে ও ব্যাপারটায় আমি নাকি তোমাকেও ছাড়িয়ে গিয়েছি । আমার বন্ধুরাও সব ট্রেইনড  । সো ? যাচ্ছি তো ? রাজা ইতিমধ্যেই রাঙা মুখে মাথা নত করেছেন । যাও , সাবধানে । বোন ঘর ছেড়ে যাওয়ার পর তলব করলেন সেনাপতিকে । সে ভদ্রলোক আবার শুর্পনখার গুণমুগ্ধ । সে তো এই অ্যাসাইনমেন্ট পেয়ে মহা খুশী । রাজা রাজকার্যে মন দিলেন ।

     গহীন বনে একটা বাঘের পেছনে ক্যমেরা বাগিয়ে দৌড়তে দৌড়তে শুর্পনখা দলছুট হয়ে পড়ল । এত ঘন বন যে পথ খুঁজে পেতে বেগ পেতে হচ্ছে । একটা ঝাঁকড়া গাছের তলায় বসে সে মাথা ঠান্ডা করে ভাবতে বসল । কিংকর্তব্যম অতঃপরম । এমন সময়ে গাছের পেছন থেকে সাদা রঙের এক অদ্ভুত দর্শন মানুষ বেরিয়ে এলো । শুর্প একটু ভয় পেলেও নাগরিক সভ্যতায় শিক্ষিত বলে জিজ্ঞেস করল আপনি কে ? কিন্তু ওই শ্বেত দৈত্য মনে হয় তার ভাষা বুঝলনা । আর অসভ্যও বটে । সে এগিয়ে এসেই হামলে পড়ল শুর্পর ওপর । কিন্তু শুর্পনখা আধুনিক অস্ত্রেশাস্ত্রে সুপণ্ডিত । এই শ্বেত দৈত্যকে পরাস্ত করতে বেশি সময় লাগল না ।
 
     ভরা দরবারে ক্রুদ্ধ দশানন বসে । এত বড় স্পর্ধা যে তাঁর ভগ্নীর বলাতকারের চেষ্টা ? এতো সেই অসভ্য আর্য্য রাজার ভাইটা । সেরকমই তো বলল সেনাপতি । সে নাকি নিজেদের এলাকায় বলে বেড়িয়েছে শুর্পনখার নাক কেটেছে । মানে তার সম্মানহানি করেছে । এখনো দশাননের ক্ষমতা তারা জানতে পারেনি ।

   মন্দদোরীর শত বাধা সত্ত্বেও রাজা ওই অসভ্য আর্য্য রাজার স্ত্রীকে বন্দী করে এনেছেন । দাসী করে প্রাসাদসংলগ্ন বাগানে বন্দী করে রেখেছেন ।
   মর্মে মর্মে বুঝুক তারা , পরিবারের মেয়েদের শ্লীলতাহানির আশঙ্কা থাকলে কেমন বোধ হয় ।

দীপাবলী

কালো রাত্রির অসীম সম্ভাবনা থাকে l  অন্ধকার গহ্বরের মত l  শক্তি জমাট বেঁধে লুকিয়ে থাকে রাতের বুকে l  সেই শক্তিকে বোধে আনতে যবনিকা সরাতে হয় l তার জন্যেও শক্তি চাই l শক্তির আরাধনা সেই কালো রাত্রির বুক থেকে পর্দা সরিয়ে দেখতে চাওয়া l  জ্ঞানের আলোয় আসলেই তা আর কালো নয়, অন্ধকার নয় l  দীপাবলীর আলোয় অন্ধকার সরে গিয়ে দেখতে পাওয়া যাবে সেই আলোকময় রূপ l  এমনটাই বিশ্বাস আমাদের l
তমসো মা জ্যোতির্গময 

উপহার

ভারী আয়োজন l  হবু বর বরযাত্রীদের নিয়ে সাজগোজ সেরে নিচ্ছে l  দলে যারা কমবয়সী বন্ধু ও ভাই, তাদের সাজের উত্সাহ তুঙ্গে l  হবেনা কেন ? বোন দিদি বৌদিদের মুখে শুনেছে যে কনের বাড়ীর মারকাটারি সব নারীরত্নের কথা ! জেল্লা কম হলে চলবেনা তো l  ওদিকে কন্যাপক্ষ ও কম যায়না l  তাদের একটি তুরুপের তাস আছে l  যথাসময়ে বেরোবে l  চোখ ঝলসানো রূপ যে সেই পরীর !
       বরযাত্রী চলে এসেছে l  গান বাজনা শুরু l  আলোর রোশনাই চারিদিকে l  কনে প্রিয় সখীকে কানে কানে বলল - যা হিনাকে এইবার ছেলের বাড়ির সামনে ডেকে নিয়ে আয় l  ওরাও তো দেখুক বেহেস্তের হুরী কাকে বলে !
    সত্যিই চোখ ঝলসে দেওয়া l  সঙ্গে শব্দও বাজনাকে স্তব্ধ করে দিয়ে l  কয়েকটি মুহূর্ত মাত্র l

   সব আলো নিভে গেছে l বেহেস্তের হুরী চোখ ঝলসে দিয়েই প্রায় অর্ধেক অতিথিকে সঙ্গে করে বেহেস্তে নিয়ে গেছে l  বিয়ের এর থেকে পরম উপহার আর কি বা হতে পারে ?

সন্ত্রাস

বৃষ্টি ধোয়া সন্ধ্যে l মিঠে হাওয়ায় ঝিরঝিরে আরামে রোম কূপে স্নিগ্ধতা l  বিজন পথে হাঁটছি l  দৃষ্টি মেলে রেখেছি আকাশে l  কোথাও কেউ নেই l  এই নির্জন পৃথিবী একা আমার l  পৃথিবীর সঙ্গে এই নিরিবিলি নিরালায় মুখোমুখি অদ্ভুত বোধ ছড়িয়ে দিচ্ছে প্রাণে l  হাঁটতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছি না l  কি নরম মাটি ! রাস্তায় যেন কোনও পাথর কাঁকর নেই l  পিচ ঢালা কঠিন শহুরে রাস্তা ও নয় l  মনের আনন্দে হাঁটছি l  হঠাত্ পায়ের গোড়ালি তে সুড়সুড় করল কি যেন l  নীচের দিকে তাকাতেই দেখি কত নতুন নতুন চারা গাছ ! খুব ভালো লাগল l  কিন্তু জায়গাটা অনুর্বর বন্ধ্যা ছিল না ? ছিলই তো l  মৃতদেহের ওপর হাঁটতে হাঁটতে বুঝতে পারলাম মানুষের লাশের থেকে শক্তিশালী সার আর হয়না l  বন্ধ্যা পৃথিবীতে মরে যাওয়া অরণ্য ফিরছে l মানুষ নয় l 

লেখকের সন্ধানে দুটি চরিত্র

ইদানীং শশী ডাক্তার গাঁয়ের বাইরে একটা আলাদা ডিসপেনসারি করিয়াছে । সেখানে চিকিৎসার জন্যে সে পূর্বের মতই নিজে কলিকাতায় আসিয়া প্রয়োজন মত ঔষধ ক্রয় করিয়া লইয়া যায় । তবে যাদব পণ্ডিতের হাসপাতালে আধুনিক শিক্ষিত ডাক্তার থাকিবার ফলে গরীব গুর্বো ছাড়া তাহার কাছে রোগী বড় একটা হয়না । কিন্তু শশী মান্য মানুষ । আশেপাশের দু দশটা গাঁয়ে তাহার সুনাম এখন অটুট । প্রাচীন যে কজন এখনও  বাঁচিয়া তাহারা শশীর নিকটেই চিকিৎসার কারনে আসেন । শশী কলিকাতায় যাইলে রোগীদের সাবধানে থাকিতে বলিয়া যান । দেরী হইতে পারে কোনও কারনে । তখন মুস্কিল হইবে ।
                            এবার কলিকাতায় আসিয়া শিয়ালদহ স্টেশনের সন্নিকটে হ্যারিসন রোড স্থিত বেঙ্গল বোর্ডিং এ একখানি ঘর সে ভাড়া লইল । কিছুদিন থাকিয়া যাওয়ার ইচ্ছা । সংসারে তাহার জন্য অপেক্ষায় থাকে এমন কেহ নাই । মাঝে মাঝে তাহার মনে হয় কুসুম অনর্থক তাহাকে স্বার্থপর প্রতিপন্ন করিয়াছে । কই ? সে তো সুখেই স্বামী লইয়া বাপের বাড়িতে জমিয়া বসিয়াছে । শশীই বরং একা । ইহজগতে তাহার আর কেহ নাই ।
                            আজ সকালে উল্টোদিকের মিষ্টান্ন ভাণ্ডার হইতে হিঙের কচুরী আনিয়া প্রাতরাশ সম্পন্ন করিয়া সে বই পাড়ায় যাইবে বলিয়া বাহির হইল । পথে নামিয়া হাঁটিতে হাঁটিতে লক্ষ্য করিল সম্মুখে একটি পরিচিত  সৌম্যকান্তি যুবক যেন হাঁটিতেছে ! আগাইয়া গিয়া তাহাকে ধরিয়া ফেলিতেই দেখিল , হেরম্ব । দুজনেই একে অপরকে পাইয়া খুব আনন্দিত হইল । চল ওই চায়ের দোকানটায় বসি । তারপর কি খবর বল ? শশী বলিল । হেরম্ব মাথা নীচু করিয়া রইল । দোকানের বেঞ্চিতে বসিয়া পুনর্বার তাগাদা পাইয়া সে চোখ দুটি তুলিল । এখনও তাহার চোখ দুটি সেইরকম মায়াময় । বলিল মরে বেঁচে আছি শশীদা । শশী হাসিল । অর্থপূর্ণ হাসি । সে তোমার নিজের দোষে । আরও ভালো মেয়ে পাবে বলেই কি সুপ্রিয়ার আত্মসমর্পণ তুচ্ছ করেছিলে ? হেরম্ব বলিল না শশীদা । তুমি ভুল বুঝেছ । আমি নিজের মন চিনতে পারিনি । অভিভাবক হবার ঝোঁকে  তাকে গ্রহন করিনি । কিন্তু তুমি কেন একটি বিয়ে করলেনা বলত ? শশী নিদারুন হাসিল । কি যে বল ? স্বয়ং স্রষ্টা তাঁর কলমের জোরে এক পরস্ত্রীর প্রতি প্রেমের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে গেলেন । সে কি সোজা বোঝা ? হেরম্ব ও বিষণ্ণ হাসিল । ঠিক কথা । স্রস্টার সঙ্গে একটি সাক্ষাৎকার কেউ যদি স্থির করে দিত তবে জানতে চাইতাম পরিণতি  কী ভেবে রেখেছিলেন । এই যে আমি আর তুমি এমন ছন্নছাড়া হয়ে পথে পথে ঘুরছি সে নিশ্চয় উনি ভাবেননি ।   

জলপরী

হেই জোর সে দাঁড় টান রে বাপ l  ঈষানে মেঘ l  এখনি দেখতে দেখতে ছেয়ে ফেলবে l  রোগা হারু তার ততোধিক রোগা ছেলেটাকে তাড়া দেয় l  খোকার মাত্র বারো l  পান্তার জোরে দূহাতের শির ফুলিয়ে সে আর কত সামলাতে পারে ! ঝড় উঠল বলে l  সাঁ সাঁ করে হাওয়ার সাথে নিকষ কালো মেঘ ছুটে আসছে আকাশ ময় l  নিমেষে নৌকো খানা মোচার খোলার মত পালটি খেলো l  হারু দুহাত দিয়ে নৌকো সিধে করতে গিয়ে ভেসে গেল খোকা l

রাতে খোকার মা ভাত বেড়ে দিতে দিতে মাছ ভাজা খানা খোকার পাতে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করল হ্যাঁ রে এত বড় মাছটা পেলি কি করে ? খোকা বলল - মা ! জলে উল্টি পালটি খেতেই এক জলপরী পেটের তলা দিয়ে আমায় জলে ভাসিয়ে দিল l  আমি মাছের জন্য ডুবছিলুম বলে সে এই মাছ খানা আমার হাতে দিল l  

প্রতিভার উপহাস

ভদ্রলোক একভাবে মাথা নীচু করে লিখে চলেছেন l  সামনে টেবিলে রাখা টেবিল ল্যাম্পের আলোয় l  তাঁর কপালের ভাঁজ ঢেকে উড়ে চলেছে কিছু চূর্ণ কুন্তল l  চোখে মোটা কাঁচের চশমা l  হলদেটে কাগজে ঝরনা কলমে লিখে চলেছেন l সামনে রাখা একটা হাতল ভাঙ্গা চেয়ার l  সন্ধ্যে বহুক্ষণ নেমে গেছে l  খোলা দরজা দিয়ে ঢুকে চেয়ার খানায় বসলাম l  নিজের মনেই বুঝতে পারলাম এ বাড়িতে চোর ও ঢুকতে চায়না l  আমার আসা ও বসা তিনি কিছুই নজর করলেন না l  বাধ্য হয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে নিজের উপস্থিতি জানালাম l  মুখ তুললেন l  চেয়ে আছেন আমার দিকেই অথচ দৃষ্টি আমাকে ছাপিয়ে চলে গেছে সুদূরে l  অগত্যা মৃদু কণ্ঠে বললাম - আপনার একটি লেখার জন্যে এসেছি l  কি জানেন, এখনকার লেখকদের বড় বেশি এক্সপেরিমেন্ট l  খুব সচেতন ভাবে লেখা l  স্পনটেনিটি নেই l  কিছুতেই সেই অদ্ভুত কালজয়ী ব্যপারটা আসছেনা l  খুব টেম্পরারি l  অনেকটা সন্দেশের মত l  গলা দিয়ে নামলেই শেষ l  ভদ্রলোক অবাক হয়ে শুনছিলেন l  বললেন - সে কি ? আমি তো জানতাম সাহিত্যে বিপ্লব ঘটে গেছে l  দারুণ সব গবেষণা চলছে l  বললাম - হুঁ, সে ঠিক l  তবে ওই মন কে একেবারে জিয়ন কাঠির ছোঁয়ায় অমরাবতী তে তুলে নেবে সেই সৃষ্টি কই ? ওই বাহ্ বেশ l  খুব ভালো l  এই পর্যন্ত l  এতক্ষণে ভদ্রলোকের মুখে হাসি ফুটল l  বললেন - ওহ্ এবার বুঝেছি l  আপনি এই আমাদের মত অনাহার ক্লিষ্ট লেখক দের লেখা চান l  পেটে ভাত না পড়লে মরিয়া হয়ে যে লেখা বের হয় তা হল সাধকের সিদ্ধি l  আপনার কথায় মনে হচ্ছে এখন আর লিখে কেউ অনাহারে মরে না l  হাসলাম - ঠিক ই ধরেছেন l  এখন বইয়ের প্রমোশন হয় l  তাতে বিক্রি ঠিক মত হয় l  চশমা টা নামিয়ে চোখ দুটো মুছলেন l  বললেন - বেশ কথা l  অন্তত আমার মত নিশ্চিন্তে লেখার জন্যে মরা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়না l

বেরিয়ে আসার সময়ে দেখলাম একটা ছেঁড়া পাতা উড়ে এল কাছে l  কুড়িয়ে নিয়ে চোখ রাখতেই দেখলুম - দিবারাত্রির কাব্য l  রচনা মাণিক বন্দোপাধ্যায় l 

মাতৃকা

সেদিন বাজার থেকে ফিরে বিনয় রাই কে খুঁজে পেলেন না l  কোথায় যে যায় থেকে থেকে l  অনেক ডাকাডাকি করেও সাড়া না পেয়ে নিজেই ডাইনিং টেবিলে বসে এক গেলাস জল নিয়ে খেলেন l  অবসরের পর যেন চট্ করে বুড়ো হয়ে গেছেন l  দৌড়াদৌড়ি করে কিছু আর করতে পারেন না l  একটু পরে শোনা গেল রাইয়ের গলা l  মুখ মুছতে মুছতে ঢুকে এলেন l  বিনয় কে দেখে বললেন, কখন এলে ? খুব তাড়াতাড়ি হয়ে গেল তো ? বিনয় হাসলেন l  তোমার অনেক কাজ, তাই বুঝতে পারোনা l  আমি ঘন্টা দুয়েক ছিলাম না l  তোমার কদ্দুর ? রাই বললেন, মোটামুটি শেষ l একদম ছোটটা খুব নিরবিরে l  মাথা তুলতেই চায়না l  কত করে আকাশ দেখিয়ে পাখি দেখিয়ে তবে খাওয়ালাম l  বিনয় প্রশ্রয়ের হাসি হাসলেন l  বেশ করেছ l  এখন বলত জলখাবার টা রাখা ছিল খেয়েছ কি ? রাই চোখ বড় বড় করে তাকালেন l  যাহ্, ভুলে গেছি l  আর এতগুলোকে সামলান কি আর মুখের কথা ? মাথার ঠিক থাকে কারো ? তুমিই বল l  বিনয় হাসলেন আবার l  না না তুমিই বলো l  দীর্ঘশ্বাস টা ঠেলে বেরোল বুক থেকে l  রাই ডাকলেন, চল তো একবার দেখবে ছোটটা কে l  চল যাই l  দুজনে উঠে এলেন দোতলার অপরিসর বারান্দায় l  সেখানে কতগুলি ফুল গাছের টব l  মাঝে একটি টবে সদ্য জন্মানো জুঁই চারা l  রাই ছুটটে গিয়ে আলতো হাতে চারাটা কে টব সমেত তুলে গ্রিলের কাছে নিয়ে এলেন l  বললেন, নে নে আলো খা l  যত পারিস খা l
নীচে পাশের বাড়ির ঝি বাসনের পাঁজা নিয়ে বসেছিল l  বলে উঠল, ওই রে পাগলের কাণ্ড দেখ, গাছ কে আলো খাওয়াচ্ছে l 

হরিপদ কেরানী

বিলাস বাবু নিজের পুরনো ঘুণ ধরা কাঠের টেবিলে বসে বসে জাবেদা খাতা খানা খুলে দেখছিলেন l  বেশি এন্ট্রি নেই l  এক সময়ে এতে এন্ট্রি তুলতে তুলতে দিন কাবার হয়ে যেত l এখন সে সময় আর নেই l  হায় পুরাতন তোমার দিন গিয়াছে l  তাঁর ও অবসরের আর দেরি নেই l  বছর দুয়েক বড় জোর l  তাও বয়স কমানো ছিল বলে l  ছেলে ছোকরা গুলো খেপায l  দাদু, কত কমানো ছিল ? No idea ? বাস রে l
        সরকার বাহাদুর এবার এমন যন্ত্র এনেছেন যে হাতে করে লেখালিখির দিন শেষ l  সব এখন যন্ত্রে হবে l  কম্পুটার l  বিলাস বাবুর মোটা ফ্রেমের মোটা কাঁচের চশমা দিয়ে চোখ দুটো বোঝা যায়না l  তিনি তো যন্ত্রে কাজ করতে পারবেন না l  তাই বড় সাহেব ওই পুরনো জাবেদা খাতা খানা উল্টে পাল্টে দেখতে বলেছেন l  কোনও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চোখ এড়িয়ে না যায় l  বিলাস বাবু দেখলেন, খাতার মাঝে একটা ছবি l  সবুজ ধানখেতের মধ্যে দিয়ে ছুটে চলেছে এক বালক l  পরনে আধময়লা কাপড় l  খালি গা l  পাতা ওল্টালেন l  দেখলেন মাটির দাওয়া l  একটি বৌ মাথায় কাপড় দিয়ে চুলোয় ফুঁ দিচ্ছে l  ধোঁয়ায় চোখ দিয়ে জল পড়ছে l  পাতা ওল্টালেন l  রেলগাড়ি ছুটছে l  ধোঁয়া উড়িয়ে l  একটি কিশোর অবাক চোখে দেখছে l  জানলায় একজন মাঝবয়সী লোক l  হাত নাড়ছেন l  তাঁর চোখে জল l  পাতা ওল্টালেন l রেলগাড়ির ভেতরে বসে একটি তরুণ l  চোখে খুশি l  ট্রেন ছুটছে l  সামনে এক গলা ঘোমটা দিয়ে একটি গাঁয়ের বধূ l  পাতা ওল্টালেন l  চুনকাম করা সাদা একটি দপ্তর খানা l  নতুন একটি আম কাঠের টেবিল l ওপরে দিস্তে করে রাখা লাল শালুতে মোড়া হিসেবের খাতা l বিলাস বাবু উঠে পড়লেন l  ছোকরা অ্যাসিস্ট্যান্ট তাড়াতাড়ি এসে জিজ্ঞেস করল - এনি প্রবলেম ? বিলাস বাবু দুঃখী হাসিতে মুখ ভরিয়ে বললেন - এই খাতায় যা আছে তা তোমাদের যন্ত্রে ধরবে না l  ছোকরা ভুরু কুঁচকে কি ভাবল l তবে ওটা আপনি আপনার জিম্মায় রাখুন l 

প্রাক্তন

      বাবা, এদিকে আসুন, এখানে এই সিট দুটো আমাদের। মেয়েটির গলা শুনতে পেলাম। দেখতে পেলামনা। এক বয়স্ক ভদ্রলোক ভেতরে ঢুকে এসে বসলেন । ট্রেনের কামরা বেশ ফাঁকা। আমি কলকাতায় ফিরছি। মাত্র দুদিনের অদর্শনেই আমার গৃহিণী আমায় চোখে হারান। বন্ধুবান্ধব মহলে এ জন্য সকলে আমাকে বেশ হিংসে করে। 'এত যত্ন এত নজর যদি আমাদের বউয়েরা দিত তো বর্তে যেতুম। কোনোদিন যদি অকারনে অফিস কামাই করি তো কি বিপুল বিরক্তি। খবরের কাগজটা সকাল থেকে নেড়ে নেড়ে মুখস্থ হচ্ছে, জায়গায় আর রাখা হলনা। সারাদিন ধরে চা করা সম্ভব নয়। ঘরে বাকি আরও কাজ থাকে। বরকে দেখিয়ে দেখিয়ে ছেলের সাথে আদিখ্যেতা। বাবু কি খাবে সোনা? আহা !' এদের কাউকে গোপন কথাটি ফাঁস করিনি। তা হল গৃহিণী খুবই সন্দেহপরায়ণা। দোষ আমারই। কবে কোন ছেলেবয়সে একটি মেয়েকে ভালো বেসেছিলাম সে কথা তাঁকে খোলা মনে জানিয়ে ছিলাম। তিনিও বেশ মুক্ত মনের পরিচয় দিয়েছিলেন। কিন্তু এই যে যত্ন ও নজরের আধিক্য যা কিনা আমার গলায় ফাঁস হয়ে বসে থাকে তা শুধু যেন সেই সন্দেহের বশবর্তী হয়ে করে চলা কাজ। এরকম মনে হওয়া কি খুব দোষের? যাই হোক, থেকে থেকেই গৃহিণীর ফোন। কদ্দুর পৌঁছলাম, কিছু খাবার সাথে এনেছি কিনা, আজ বাড়িতে পাবদা মাছের ঝাল (আমার নাকি খুব প্রিয়, কোথা থেকে জেনেছে কে জানে) , ইত্যাদি ইত্যাদি। চুপ করে বাইরের দৃশ্য দেখছিলাম। ট্রেনের জানলা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখা আমার খুব প্রিয় শখ। এখন ভদ্রলোক এসে বসতে ওনার দিকে তাকালাম। দেখলাম, বয়েসের তুলনায় যেন একটু আগেই বার্ধক্য ধরেছে। মাথার চুলে তেমন পাক ধরেনি বটে, কিন্তু মুখে যেন গভীর যন্ত্রনার আঁকিবুঁকি। ভদ্রলোক কেমন যেন আনমনা। এবার সঙ্গের মেয়েটি ভেতরে এসে বসল। তার পরনে তাঁতের হালকা রঙের শাড়ি। কালো পাড়। রোদের হলকা থেকে বাঁচতেই মনে হয় মাথায় তুলেছে কাপড়ের আঁচলটা। কালো পাড় তার রোদে রাঙা ফর্সা মুখটিকে ঘিরেছে যেন মধ্যাণ্হের তপ্ত সূর্যকে ঢেকেছে এক কালো মেঘের বৃত্ত। সূর্যের তাপ থেকে সূর্যকে রক্ষা করতে। মেয়েটির বয়স তিরিশের আশেপাশে। সিঁথি সাদা। দেখলাম ভদ্রলোক ডাকছেন - বউমা, একটু জল দেবে? এতক্ষণে বুঝতে পারলাম যে ভদ্রলোক শ্বশুরমশাই আর এটি তাঁর বউমা।
   হঠাৎ মেয়েটি ডেকে উঠল তীর্থদা না? আমাকে চিনতে পারলে না? আমি তো বৃষ্টি।  প্রথমে অবাক হলাম, বৃষ্টি? সেই বৃষ্টি ! আজ এতদিন পর রেলগাড়ির কামরায় হঠাৎ দেখা!! কিন্তু ওর কপালে সিদুর নেই কেন? কালো পেড়ে শাড়ি কেন? আর এই বৃদ্ধের মুখেই বা কেন এত যন্ত্রণার আঁকিবুঁকি ? প্রশ্নগুলো গলায় আটকে রইল।
       বাড়ি ফিরে স্ত্রীর যত্ন করে বেড়ে দেওয়া ভাত খেতে খেতে মনে হল, আজকের কথাটা বলেই ফেলি। দেখিই না কিভাবে নেয়। শুনে প্রথমটা থমকে গেল। তারপর আমার পিঠের কাছে দাঁড়িয়ে পিঠে হাত রেখে বলল আহা রে! স্বামি নেই? কি বা বয়স! স্পষ্ট দেখতে পেলাম স্ত্রীর মুখেও সেই এক রকমের যন্ত্রণার আঁকিবুঁকি। 

মার্গ সন্ধান

         আশ্রমের একচ্ছত্র অধিপতি। পরম শ্রদ্ধেয় সন্ন্যাসী। এত দায়িত্ব, এত রকমের কর্মসূচী, অথচ তার মাঝেও শিশুর সরলতা। শিশু দেখলেই খেলায় মেতে ওঠেন। কখনও একদল বালক আশ্রম প্রাঙ্গণে খেলে বেড়াচ্ছে, তাদের সবচেয়ে ছোটটির হাতে একটি আপেল। গম্ভীর আলোচনার মাঝেই সেই আপেলটি আর সকলের চোখের আড়ালে লুকিয়ে রাখছেন। যাতে শিশুটি খেলা শেষে সেটি হাতে পায় আবার। উপস্থিত আশ্রমিকরা ঘটনাটি দেখছেন। কিন্তু মুখে কিছুই বলছেন না। ত্রিকালদর্শী মহামানবের শিশুর মত আচরণে হয়ত মনে কৌতুকের সঞ্চার হচ্ছে। বাইরে তার প্রকাশ নেই।
            এ হেন সন্ন্যাসীর দর্শনপ্রার্থী হয়ে এলেন একদিন একটি বছর বিংশতির যুবক। উন্নত ললাট, উজ্জ্বল চোখ, দীপ্তিময় চেহারা। দেখেই সম্ভ্রম জাগে। এত অল্প বয়সেও বেশ গম্ভীর। সন্নাসী তখন একদৃষ্টে সুরধুনীর দিকে চেয়ে বসেছিলেন। যুবক অবাক হলেন। তিনি মনে মনে ভেবেছিলেন যে সন্নাসী হয়ত সারা দিনমান জপে তপে, তপস্যায়, আরাধনায় মগ্ন থাকেন। কিন্তু হতাশ হলেননা। মহামানবের চিন্তার গতিপ্রকৃতি সাধারণ সংসারী জীবের বুদ্ধিবৃত্তির আওতায় পড়েনা।
            সন্ন্যাসী চোখ মেলে দেখলেন যুবককে। কাছে ডাকলেন। যুবক ভূমিষ্ঠ প্রণাম সেরে উঠে বসতেই চিবুকে, মাথায় হাত রেখে আদর করলেন। সস্নেহে দেখে চলেছেন যুবককে। কিছু পরে জানতে চাইলেন - কি চাও? কেন এসেছ আমার কাছে? তুমি নিজেই অমিত শক্তিধর!   যুবক জানালেন, শ্রীমদ্ভাগবত গীতা পড়ে তিনি নিস্কাম কর্মের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। তাই তাঁর মনে জেগেছে সন্ন্যাস নেবার বাসনা। একমাত্র এই পথেই তিনি নিজের জীবনের প্রকৃত অর্থ খুঁজে পাবেন। ত্রিকালদর্শী সন্ন্যাসী খানিক মৌন রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে, যেন সুপ্তোত্থিতের মত, বললেন - বাছা, তোমার প্রকৃত স্থান দেশমাতৃকার সেবায়। সেই হবে তোমার নিস্কাম কর্মের ক্ষেত্র। আমি পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি, তোমার অন্তসন্ন্যাস। তুমি সন্ন্যাসী হয়ে দেশমাতৃকার পূজা করবে, ঠিক যেমন আমি সন্ন্যাসী হয়ে মাতৃ সাধনায় নিরত। যুবক দীক্ষা যাচ্ঞা করলেন। পুনরায় সন্ন্যাসী জানালেন তিনি দীক্ষা দিতে অপারগ। দীক্ষার প্রয়োজন নেই। সাধনায় জয়লাভ অবধারিত। যুবক পথের দিশা পেয়ে ফিরে এলেন। সমস্ত শক্তি দিয়ে দেশ্ মাতার দুঃখ মোচনে আত্ম নিয়োগ করলেন।

--------------------------------------------------------------


সন্নাসী হলেন তৎকালীন রামকৃষ্ণ মিশনের অধ্যক্ষ শ্রীব্রহ্মানন্দ ওরফে রাখাল মহারাজ এবং যুবক হলেন নেতাজী সুভাষচন্দ্র বোস ।

সাব অল্টারন রামায়ণ

জঙ্গলে একটু ফাঁকা জায়গা পেয়ে শুঁড়ি পথে অলস পায়ে হাঁটছিল রঘু l  হাতে একটা ভেরেন্ডার ডাল l  সেটা দিয়ে চারপাশে ঝোপে বাড়ি মারতে মারতে সে এগিয়ে চলছিল l খামোখা বৌ টার সাথে খিটি মিটি হয়ে গেল l  মাত্র চৌদ্দ বছর বয়েস অথচ স্বামি কে একটু মান্য করেনা ! কি বায়না কি বায়না ! একটা নধর বন মোরগ দেখে সেই বায়না জুড়েছে যে ওটাই ধরে আনতে হবে l  তবে রাঁধা বাড়া হবে, নয়ত নয় l  রঘু রেগে মেগে চলে যাচ্ছিল কিংকির ঘরে l  ব্যাধের বৌ ঠিক কোনও মাংস খাইয়ে দেবে খন l  এই দেমাকি মেয়েটাকে খোশামোদ করতে হবেনা l  কোথায় খুঁজবে সে এখন বন মোরগ ? কিন্তু ঝামেলা পাকাল লখিয়া টা l  বলে অরেব্বাস বন মোরগ দেখলি ? চল রে দাদা ধরে আনি l  খেয়ে মজা এসে যাবে l  রঘু গাইগুই করছিল বলে বোউটা সেই যে কাঁথা মুড়ি দিয়েছে যে মোরগ না পেলে আজ আর উঠবে না সে বোঝাই যাচ্ছে l 

সাদামাটা

আপনারা এখানে নতুন ? বৈদেহী তাড়াতাড়ি আঁচল টা গায়ে জড়িয়ে নেয় l  আরে এ ভদ্রলোক জানা নেই শোনা নেই একেবারে বাড়ির ভেতরে ঢুকে এসেছে ? বুড়ি ঝি টাও একেবারে গদগদ l  বাবু বসেন বলে পাখা চালিয়ে, এক গেলাস ঠান্ডা জল এনে দিল l  ভদ্রলোক গুছিয়ে বসলেন l  বৈদেহী লক্ষ করল যে লোকটির চেহারায় অদ্ভুত একটা আভিজাত্য আছে l  আর আছে বুদ্ধির প্রাখর্য l অদ্ভুত !! এরকম গাঁ ঘেঁষা মফস্বলে এত আধুনিক লোক দেখে সে বেশ অবাক হচ্ছিল l  তবে গাঁয়ের লোকের মতই সহজাত ভব্যতাজ্ঞান খুব একটা নেই l  নইলে কেউ এমন করে ঢুকে আসে ? ভদ্রলোক বললেন - যাবেন না একদিন আমাদের বাড়ি l  আমার গৃহিণী খুব খুশি হবে l  সমবয়সী কাউকে পায়না l  আপনার কর্তাটি কই ? আলাপ করতে ইচ্ছে রইল l  বৈদেহী জানাল কর্তা কাজের খাতিরে একটু বাইরে আছেন l  আসল কথাটা হল, কর্তা খুব ধনী বংশের ছেলে l  সত্, মেধাবী, নীতি বাগীশ l  বাপের অগাধ সম্পত্তি l  শহরে বিরাট দালান কোঠা l  কিন্তু বৈদেহীর কারণে মায়ের সাথে মতের অমিল l  কিন্তু বাপ মা কে যে ছেলে এত ভক্তি করে সে কি আর মুখের ওপরে কোনও কথা বলতে পারে ? অগত্যা তার চুপ করে থাকার সুযোগে শ্বাশুড়ী কান ভাঙ্গলেন বাপের l  ফল স্বরূপ গৃহত্যাগী হল বৈদেহী রা l  কর্তার গোঁ, নিজের পায়ে দাঁড়াবে l  এখনও উল্লেখযোগ্য কিছুই হয়নি l  ভাড়া বাড়ির ভাড়া জোটানো বেশ কষ্টসাধ্য বলে এই ছোট মফস্বলে বাড়ি ভাড়া করা হয়েছে l  ভাগ্যিস ছেলেপুলে হয়নি ! কি যে হত l

___________________

সেদিন সকালে ভদ্রলোক এসে আর কিছুতেই ছাড়লেন না l  চলুন, আজ যেতেই হবে l  কোনও কথা শুনব না l  কর্তা সেই থেকে ফেরেননি আর একা একা আপনি এই ভাবে, নাহ্ আর শুনব না l  বৈদেহী নিতান্ত অনিচ্ছা সত্বেও গাড়িতে উঠল l  বুড়ি ঝি কে বলে গেল - দাদা বাবু এলে বলিস আমি ওঁর সঙ্গে গেছি l

___________________

কি বিশাল বাড়ি ! কত্ত বড় বাগান ! কত দাশ দাসী ! ঘরে ঘরে দামী দামী আসবাব ! ভদ্রলোকের বোউটি খুব মিশুকে l  দুজনা প্রায় সমবয়সী l  খুব জমে গেল l  বোউটি বৈদেহী কে ছাড়তেই চায়না l  শেষে সেদিন রাত্রিতে বৈদেহী রয়ে গেল নতুন সই য়ের বাড়ি l

___________

কর্তা বাড়ি ফিরেছেন l  বুড়ি ঝি সংবাদ দিল বৌউমৌনি গেছে এ অঞ্চলের সব চেয়ে ধনী লোকটির বাড়িতে l  কাল গিয়েছে আর ফেরেনি l  কর্তার মুখ কালো হয়ে গেল l  পয়সাওয়ালা লোক গুলো নিজেদের বিত্ত প্রদর্শন না করে সুখ পায়না l  বৈদেহী অত কিছু দেখে না হিংসে করতে শুরু করে l  মেয়েরা যা অবুঝ !

__________________

আসুন আসুন ! আপনি যে আমার বাড়িতে এসেছেন আমার কি ভাগ্য !! কর্তা ইতিউতি চাইছেন, গিন্নি কই ? ভদ্রলোক বললেন সে এখন দুজনে খুব জমে গেছে l  বলি কি, কদিন এখানেই রেখে যান l  চেঞ্জ হবে একটু l  কর্তার মাথায় আগুন জ্বলে উঠল - বৈদেহী, বলে হেঁকে উঠলেন l

__________

গল্প টা খুব সাদামাটা ? উঁহু, নয় l  পাত্র পাত্রী দের নাম প্রকাশ করছি l  কর্তা - শ্রীরামচন্দ্র l  বৈদেহী - সীতা দেবী l  ভদ্রলোক - দশানন রাবণ l  আর ভদ্রলোকের স্ত্রী - মণ্দদোরী l

শার্লক

শুনশান রাজপথ l  ভোরের আলো ফুটতে দেরি l  দু চারটে শান্তি রক্ষক দের গাড়ি হুশ হুশ করে চলে যাচ্ছে l  ভারী কাঠের দরজাটা ঠেলে বন্ধ করে রাস্তায় নেমে পড়লেন ভদ্রলোক l  চোখে শ্যেন দৃষ্টি l  পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে ঢুকবে কিছু কোকেন l  তাঁর লং কোটের প্রান্ত তীব্র শীতের হাওয়ায় উড়ছে l  মাথার হেলিয়ে রাখা টুপি চোখ দুটোকে ঢেকে দিয়েছে l  ঠোঁটের ডগায় ঝুলতে থাকা পাইপের আগুন তুষারে নিভে গেছে l  একটু দাঁড়ালেন l  ওটা জ্বালাতে হবে l  হঠাত মাটি ফুঁড়ে উঠে এল মগন লাল মেঘরাজ l বলল - তো মিস্টার হোম্স ! আগুন টা হামি জ্বালিয়ে দি ?

ডাইনী

মাথাটা তুলতে পারছিল না শিবু l  কান্না টান্না তো কখন থেমে গেছে, বরং এক ধরনের বিমূঢ় অবস্থা চেপে বসেছে l  মাথা ভার l কোনও চিন্তা আসছেনা l  শুধু থেকে থেকে শূন্য হয়ে যাচ্ছে মন l 
      তাড়া দিল মালতী l  হেই উঠ l  তুর বৌ টা তো মানুস ছিল না l  এত্ত করেও বুঝার পারলি না l শিবুর কোনও প্রতিক্রিয়া হলোনা l  বসেই রইল চুপ করে l 

________________________


কাল সন্ধ্যের পর জঙ্গলের গভীর ঝোপে সীমা আবার গিয়েছিল l  সেখানে তাকে দেখতে পেয়েছিল শেষ বিকেলে কাঠ কুড়োতে যাওয়া কটি মেয়ে বৌ l  দূর থেকে দেখেছিল সীমা সেখানে মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে, দুহাত মাথার ওপর তুলে মাঝে মাঝে ঊন্মত্তের মত চীত্কার করছে l  তারা শিউরে উঠছিল l  নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছিল - মেইযা টার মাতথ টো ইক্কে বারে খারাপ হইচে l  পুত টা রে হারায়ে আর বশে লাই রে l  বেশি রাতে শিবু খুঁজতে খুঁজতে সীমাকে দেখতে পায় l  জোর করে ঘরে আনে l 
           সকাল থেকে বড় শোরগোল l  ঠিক সীমার ছেলেটার মতই গাঁয়ের আর ও শিশু জ্বরে মরেছে l  হঠাত জ্বর l  কোথাও কিছু নেই ধুম জ্বর l  আর তাইতে ই মরণ l  সীমা ঘরে শুয়ে ছিল l  শুনতে পেল কুমারি টার মেইযা টাও মরেছে l  আরে কি হলো - বলে সে আবার কান্না জুড়ে দিল l  শিবু সেই সময়ে জঙ্গলে গেছিল l  সমস্ত গাঁ হঠাত ভিড় করল ওর ঘরের আঙিনায় l 

________________________

  কিছু আগে সীমা মরে গিয়েছে  l  গাঁয়ের সবাই এক বাক্যে বিচার দিয়ে দিল l  সীমা আসলে ডাইনী l  রাত বিরেতে জঙ্গলে মন্তর পড়ে, তন্তর করে l  নিজের পুত টা কেও খেয়েছে l  ওর নিঃশ্বাসে গাঁয়ে আর কোনও বাচ্ছা বাঁচবে না l  সীমাকে ওর আঙিনায় বুড়ো বট গাছটা তে বেঁধে গাঁয়ের সবাই মারধোর করেছে l  যখন প্রায় আধমরা তখন দিয়েছে গায়ে আগুন লাগিয়ে l  শিবু যখন ফিরেছে তখন সীমা আর বেঁচে নেই l 

_______________________

শিবু যখন মোড়লের কাছে জানতে চাইল যে কি হল, কেন সীমা ডাইনী, মোড়ল বলল - তু জানিস নি ! উ ডাইনী ছিল ! জঙ্গলে ধুল কুড়াইছিল সকল কে মারবে বলে ! এত্ত গুলান প্রাণ !! শিবু মাথা হেঁট করে দাঁড়িয়ে রইল l কি করে বলবে যে ওই ধুলো টুকু সেই গাছতলার যেখানে ওদের ছেলেটা কে শুইয়ে এসেছে আজ মাত্র পাঁচ দিন আগে l 

রাজনীতি

-দাদা ! প্লিস ! তুমি অন্তত veto দিয়ে দাও
- কেন ? (বিধুশেখর চশমা টা ঠিক করে নিলেন )
- না, মানে তুমি যদি না রাজি হও তবে তো ব্যপারটা আটকে যাবে, তাই বলছি, প্লিস ভেবে দেখ
- কিন্তু সিধু, এই লোকগুলো কে তুমিই তো এনেছিলে
- হুঁ, তখন বুঝিনি যে মেজদা সেজদা রাজি হয়ে যাবে l  বাপ ঠাকুরদার ভিটে, বেচে দিতে রাজি হবে
- তবে তুমি তো চেয়েছিলে বেচে দিতে, নাহলে ক্রেতা খুঁজে আনলে কি করে ?
- দাদা তুমি কি চাও ? তুমি চাও যে এতবড় প্রপার্টি টা বিক্রি হয়ে যাক ?
- আমি কি চাই তা ভেবে কি কাজটা করেছিলে ? এখন যখন সকলে রাজি তখন আমি যদি পিছিয়ে আসি তবে সকলে মনে মনে আমাকে দুষবে l  আমার জন্যে এমন লোভনীয় ব্যপার হাতছাড়া হয়ে গেল l
- দাদা প্লিস একবার ভাবো l  আমার ভুলটা কে ক্ষমা কোর

__________________________

- মেজদা, সেজদা কে বলো দাদা খুব মন খারাপ করছে l  ব্যপারটা মানতে পারছেনা l  খুব অভিমান l
- সে কি রে ! তোর বৌদি যে নিউ টাউনের ফ্ল্যাট টা পাকা করে ফেলেছে l  ইউরোপ ট্যুর টাও !
- দেখি, কি করে ম্যানেজ করব বুঝতে পারছিনা l
- তুই বায়ার ভদ্রলোকের সাথে একটু কথা বল্

___________________

- সেজদা, মিস্টার সাহা বললেন আপনাদের খুব গোলমেলে ব্যাপার l  নিজেদের মধ্যে ঝামেলা l  কেস টা কেঁচে গেল মনে হয় l
- না না কেঁচে গেলে হবে না l  যেমন করে হোক রাজি করা, একটু কমবেশি হোক ক্ষতি নেই l

______________________

- দাদা, কাল মিস্টার সাহা আসছেন l  অনেক বলে কয়ে রাজি হয়েছেন l  তোমার portion টা একটু বেশি l  কাউকে বলোনা l  উনি তোমার সেন্টিমেন্ট বোঝেন l

________________________

- মিস্টার মুখার্জী কি বলে আপনাকে ধন্যবাদ দেব যে l  এই কাজটার জন্য আপনি প্রচুর এফোর্ট দিলেন l  ফাইভ পার্সেন্ট আপনার আলাদা রইল l  কথা কথা মশাই l

সিদ্ধার্থ মুখার্জী তৃপ্তির হাসি হাসলেন

কমলাকান্তের প্রসাদ

                          গৃহিণী  সাপ্তাহিক কিটি পার্টিতে যোগদান করিয়াছেন, গৃহে নাই। অধুনা ভৃত্য দিগের অন্যায় ব্যবহারে আর অন্তরাত্মা কাঁদিয়া উঠে না। গৃহিণী না থাকিলে তাহাদের উপস্থিতি আশা করাও বাতুলতা । এমতাবস্থায় সান্ধ্য জলযোগের কোনরূপ  ব্যাবস্থা দেখিতে না পাইয়া বৈঠক খানা ঘরে নিভন্ত রঙিন বাতি জ্বালাইয়া নিজ হস্তে প্রস্তুত জল-যোগে ব্যাপৃত হইলাম । প্রতি সন্ধ্যায় একই পানীয় সেবনে এক প্রকার মনোবিকার দেখা দিয়াছে । এই পানপর্বটি আনন্দ প্রদান করিতে অক্ষম হইয়া পড়িয়াছে । চিন্তা করিয়া এই সিদ্ধান্তে উপনীত হইলাম যে, ইহার ও বয়স বাড়িয়াছে । অনন্তর নিজের প্রতি অশেষ ও অকৃত্রিম করুণায় দ্রবীভুত হইলাম। এ পৃথিবীতে আসার কারণ কি? এই প্রকার দার্শনিক চিন্তা যখন মন পরিপূর্ণ ভাবে অধিকার করিয়াছে, তখন ভাবিয়া দেখিলাম পরের চিত্তাপহরনই এক্ মাত্র কর্তব্য । শুধু এই কারণেই পৃথিবীতে আগমন । পুত্র জন্মিয়াছে - এই বাক্যের মধ্য দিয়াই পরিবারস্থ বয়োজ্যেষ্ঠ গনের মনোহরণ হইয়াছিল কল্পনা করিতে পারি । বাল্যে ও কৈশোরে বিদ্যাসাগর মহাশয় বর্ণিত সুশীল বালকের পদাঙ্ক অনুসরণ করিয়া পিতামাতা ও গুরুদিগের চিত্তাপহরন করিতে সমর্থ হইয়াছিলাম। কিন্তু এ পর্যন্তই। ইহার পর যার চিত্ত অজস্র ছিদ্র লইয়া আমার প্রতিটি উদ্যোগ কে প্রতিহত করিতে থাকে ও এক্ষনেও করিয়া চলিয়াছে সেই চিত্ত আমি অপহরন করিতে পারি নাই । বরং বলিয়া কৃতার্থ হইব যে এইটি আমার অকৃতকার্যতার পরিচয় বহন করে । যে দুইটি পদ্ধতি অনুসরণ করিয়া ইঁহার চিত্তসুখ আনয়ন করিব ভাবিয়াছিলাম তাহার দুইটিই এক্ষনে তাঁহার হস্তগত । প্রথমটি হইল স্ত্রীস্বাধীনতা । এইটি অধুনা প্রাচীন বঙ্গীয় শব্দ কোষে শোভা পাইতেছে। কারণ ইহা এখন নিঃশ্বাস প্রশ্বাস এর মতই অদৃশ্য অথচ বর্তমান । দ্বিতীয়টি হইল অর্থের প্রাচুর্য। ইহা যে যে উপায়ে ঘটিয়াছে তাহার সব কটি বলিলে শূলে যাইবার সম্ভাবনা আছে । যদিচ বর্তমান অবস্থায় তাহা কাম্যই হইবে ।
                     এ সকল দার্শনিক বিলাপে যখন অন্তরাত্মা কালব্যায় করিতেছে সেই সময়ে একটি শব্দ কর্ণগোচর হইল - মেও । মনে হইল আমার এই প্রকার দুর্দশা দেখিয়া স্বয়ং বিধাতা পুরুষ উপহাস করিতেছেন । হৃদয়ের তাপ চৌগুণ বৃদ্ধি পাইল । অর্ধনিমীলিত চক্ষু দ্বয় তুলিয়া দেখিতে প্রয়াস পাইলাম, কিন্তু নজরে পড়িল না। একটি সূক্ষ্ম হাসির রেখা অধরে খেলিয়া গেল । বিধাতাকে কেই বা কবে দর্শন করিয়াছেন । পুনর্বার শব্দ উঠিল - মেও । মনে মনে বলিলাম - কি পিতা? কি  নিমিত্ত অধমের নিকট আগমন? তন্মুহুর্তে হস্তে একটি পুরিয়া পড়িল । যৎপরোনাস্তি আহ্লাদিত হইলাম। নিশ্চয় অমৃতই হইবে । বিধাতা অমৃত ব্যতীত গরল দিতে পারেন না। পুরিয়াটি খুলিয়া মুখে ঢালিলাম । আঃ, কি তৃপ্তি। সকল দুঃখ ভুলিলাম ।


---------------------------------------------




               সকাল্ বেলায় গিন্নির মুখ তোলো হাঁড়ি । ছি ছি ! বাড়ি না থাকলেই এইসব । বোঝানো অসাধ্য যে কাল ফাঁকা বাড়ি দেখে কমলাকান্ত স্বয়ং ভর করেছিলেন । প্ল্যানচেট ছাড়াই । 

উন্মাদের কলাম : খোঁজ

উন্মাদের কলাম : খোঁজ

খোঁজ

কি যে ফ্যাকড়া হয়েছে l  এই গরমে যেতে হচ্ছে লালমাটির দেশে l  যতই মনোহরণ হোক তার রূপ কিন্তু এই গরম সহ্য করার শক্তি নেই l  আর যাই হোক জংগ্লি জায়গায় থাকা বেশ কষ্টকর l বিশেষ শহরে জন্মাবধি l
ট্রেনের জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিলাম l  junction স্টেশনে নেমে লোকাল ধরেছি l  কড লাইনের ট্রেন l  দুপুরের গরমে লোকজন ও কম l  উল্টোদিকে একটি গেঁয়ো লোক পুঁটলি বোঁচকা নিয়ে দুটি ছেলের সাথে বসে l  আমি যে ওখানে বেশ একটু বেমানান তা বোঝাই যাচ্ছিল l  তাই নিজের তাগিদেই আলাপ জুড়লুম l  বললুম - হ্যাঁ দাদা, বীরমুন্ডি আর কদ্দুর ? একটি ছেলে বলল - হ, সী ইখন আর র দুই ইক ঘণ্টার বেপার l  আপনি সিখানে কুথায় যাবেন বাবু ? বললাম - দেখি, কোথায় জায়গা পাই l  তারা তো অবাক l  তাদের ভাষায় বললে, সে কি বাবু ? ওই বুনো জায়গায় কোথায় থাকবেন ঠিক করেননি ? শখের বাবুদের জন্যে তো এ জায়গা নয় l  বেড়াতে যাচ্ছেন ? ঘাড় নাড়লাম l  সঙ্গের লোকটি কিন্তু চুপ l  অন্য ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম ওরাও ওখানেই নামবে l  বীরমুন্ডি থেকে আমায় যেতে হবে গরুর গাড়ি হলে আরো মাইল আস্টেকের পথ l
        শেষ পর্যন্ত গন্তব্যে নামলাম l  প্রায় সন্ধ্যে l  এখান থেকে গাড়ি ভাড়া করব শুনে এতক্ষণে লোকটি বলল, এই সন্ধ্যে বেলা জঙ্গলের পথে যাওয়া ঠিক হবেনা l  কাল সকালে যান l  আপনি তো বেড়াতেই এসেছেন l   লক্ষ্য করে দেখলাম লোকটি একটু খুঁড়িয়ে হাঁটছে l  বেশি নজর না দিয়ে বললাম তাহলে একটা হোটেলের খোঁজ করতে হয় l  এবার তিন জনেই হেসে ফেলল l  নাহ্ বাবু কোনরকম খবর না নিয়েই এসে পড়েছেন l  এত ভয়ংকর এখন এই জঙ্গল মহল যে হয় জঙ্গি নয় বাহিনী কারোর না কারোর হাতে প্রাণ যাওয়া কোনও ঘটনাই নয় l  আমি ভয়ে বিস্ময়ে মুখটা যত সম্ভব কাঁচুমাচু করে বললাম - যেতে যে হবেই l  এখানে থাকব কোথায় ? লোকটি বলল, আমাদের সাথে চলুন l  রাত্তির টা কাটিয়ে কাল সকালে যাবেন l  ওখানে গিয়েও যে কোথায় থাকবেন কে জানে ? বেশি কথা না বাড়িয়ে বললাম - চলুন, অগত্যা l  এত সন্ধ্যে হয়ে যাবে বুঝিনি যে l
         নিঝুম জঙ্গলে চারদিক থমথমে l  খাওয়া দাওয়ার পর  কুঁড়ের সামনের উঠোন টায় বসে আছি, সামনে আমার আশ্রয় দাতা l  এত ক্ষণে তার নাম জেনেছি l  অর্জুন মাহাতো l  এর খোঁজেই এসেছি l  কুখ্যাত বিপ্লবী l  জঙ্গল মহল একেবারে কাঁপিয়ে রেখেছে l  নিজের পরিচয় গোপন রেখেছি l  বাঘের ঘরে ঢুকেছি l  প্রাণের মায়া করিনা কিন্তু সরকারের কাজ প্রাণ দিয়েও করি l  সত্ অফিসার বলে সুনাম আছে l  তবে এ ধরনের কাজে এই প্রথম l
      রাত কাটিয়ে সকালে বেরোবার তোড়জোড় করছি l  এই একরাতে ই দেখেছি কি ভীষণ গরীব এরা l  খাদ্য নেই আশ্রয় নেই l  বস্ত্র তো দূরের কথা l  শিক্ষা দীক্ষা নির্মম ঠাট্টার মত শোনায় l  লোকটি কিন্তু এত কিছুর মধ্যেও খুব শান্ত l  সকালেই কিছু লোক এসেছে ওর কাছে দেখলাম l  খুব আলোচনা চলছে কি নিয়ে l  আমি গরজ দেখালাম না l  কি দরকার ? জানতে পারলে প্রাণ নিয়ে বেরোতে পারবনা l
       একটা গাড়ি এরাই ঠিক করে দিয়েছে l  আমাকে বিদায় জানাবার আগে লোকটি একান্তে ডাকল l  বলল - বাবু, গাড়ি নিয়ে সোজা বীরমুন্ডির কাছের শহর টায় চলে যাও l  ফিরতি ট্রেনে ঘরে ফের l  তুমি কি কাজে এসেছ সে আমরা সব্বাই জানি, কিন্তু তোমাকে চেনেনা কেউ l  আমি চিনতে পেরেছি l  তোমাকে কেন ছেড়ে দিচ্ছি ? কারণ ঠিক তোমার মত দেখতে আমার বড় পুত টা l  সে দু বছর হল মারা গেছে পুলিশের গুলিতে l  আমার চোখের সামনে l  আমি তখন এসবে ছিলামনা l  তাকে বাঁচাতে গিয়ে গুলি আমার পায়ে লাগে l  সেই থেকে খুঁড়িয়ে হাঁটি l সেই থেকে যুদ্ধ শুরু l  তোমার আসার কথা জানতে পেরে ঠিক করেই ছিলাম যে নিকেশ করে দেব l  হলোনা ! তুমি যে ঠিক আমার পুত টার মত ! ভয় নেই l  একা এসেছ ! মুখটা না দেখলে তোমার বরাতে কি ছিল বলতে পারিনা, তবে এখনও সময় আছে l  আর কেউ জানবার আগে তুমি চলে যাও l
_______________

অফিসে ফিরে জানালুম - অর্জুন মাহাতো বর্ডার ক্রস করে গেছে l  আমাদের আওতায় আর নেই l 

আজু রজনী

আজু রজনী



মিমির বয়েস পঁচিশ  l  এতকাল ধরে সমানে বলে গেছে বিয়ে টিয়ে ধাতে পোষাবে না l  সকাল থেকে দুনিয়ার লোকের খিদমত খাটা আর শ্বশুর বাড়ির সবার একটা hopeless গোছের reaction -এসব সহ্য করার প্রশ্নই নেই ! মিতা বলেছিল - এত ভাবিস না l  তুই যেমন চাইছিস ঠিক সেরকমই কেউ আসবে l  জানিস না ? someone somewhere is made for you l  মিমি গোল গোল চোখ করে বলেছিল - মা !! ওহ্ ! সেই গোলাপী যশ চোপড়া মার্কা রোমান্টিক ডায়লগ তোমার এখনও ভাল লাগে ? মিতা অপ্রস্তুত হয়ে লাজুক হেসে বলেছিল - কি জানি l  লাগে তো l  এখনও তোর মতন ইন্টেলেকচুয়্যাল হতে পারিনি l  মিমি মনে মনে আফশোষ করল l  ইশ মা কে রাগিয়ে দিলাম l  একটু patriarchal  tetriarchal  সব theory গুলো শোনাব ভাবলাম l  ইশ l
________:____________
       আজ তাপস খুব ব্যস্ত l  বৌকে ডেকে বলল - শোন, তুমি একটু ভালো করে সেজেগুজে যেও l  এরকম তেলচিটে হয়ে যেও না l  মিতা ঘাড় নাড়ল l ও এমনিতেই খুব submissive l  কারো অবাধ্য হয়না l  লক্ষ্মী বলে সুনাম আছে l  এতে মিতা ও যে আত্ম সন্তুষ্টিতে ভোগেনা এ কথা হলফ করে বলা যায়না l
         ক্লাবে মিমির কলেজের বন্ধু, সৌম্যদীপ (এর সঙ্গেই মিমির বিয়ে হতে চলেছে ) ও তার বাবা মা আসছেন l  সৌম্য কলকাতায় থাকবে কিন্তু মিমি যাচ্ছে বিদেশে পড়তে l  তাই registry করে নেওয়া হবে l  (আজকাল ছেলেরাও কনে হাতছাড়া হয়ে যাবার নিরাপত্তা হীনতায় ভোগে l  কিচ্ছু করেনা দুটোর একটা ও l  মিতা ভেবেছিল - কেন বিয়ে ? তাপস বলেছিল - ছাড় l  নিজেদের দায়িত্ব নিজেরা নিক l
________:___________

      ক্লাবে ঢুকতেই চেনা পরিচিত দের সাথে দেখা l  এখানে ও মিতার হাসিমুখে তাকিয়ে থাকা ছাড়া বিশেষ ভূমিকা নেই l  কিছু পরে মিমি সৌম্য আর ওর বাবা মা কে নিয়ে ঢুকল l  মিতার মুখের হাসিটা কেমন freeze করে গেল l  এ তো শ্রীকান্ত দা l  সৌম্যর বাবা ? বুকের মধ্যে যেন হাতুড়ি পড়ছে l সৌম্যর বাবা বললেন - কেমন আছ ? মেয়ে তো পুরো অন্য মেরুর l  একেবারে উলট্পুরান l  মিতা হাসতে চেষ্টা করল l

_________:________

রাতে ডিনার টেবিলে বাপ আর মেয়ের কি হাসি !! দেখেছিস ? তোর মায়ের মুখটা ? ওহ্ হো হো হা হা l  ছি কি লজ্জার কথা ! মেয়ের সাথে এই নিয়ে !!

_______:_________

মিমি এখন নিজের ঘরে l  রাত ওর খুব প্রিয় সময় l  disturb করা চলেনা l  শোবার ঘরে ঢুকতেই মিতা টের পেল তাপস জেগে l  ওকে দেখে গাঢ় গলায় বলল - মিতা পুরনো সব কিছু আঁকড়ে থাকতে নেই l  হেসে উড়িয়ে দিতে হয় l
এই জন্যেই তাপস কে তার এত ভালো লাগে l  নাই বা হলো ভালবাসার বিয়ে l  বিয়েতে ভালবাসা পূর্ণ মাত্রায় l  আর কিছু চাইনা তো l

উন্মাদের কলাম : বৃষ্টিহীন

উন্মাদের কলাম : বৃষ্টিহীন

বৃষ্টিহীন

মিস্টার রামরতন ঝুনঝুনওয়ালার মনে দুশ্চিন্তা বাসা বেঁধেছে l  উনি বেঙ্গলের ভিলেজ সাইডে যে ধান জমি খরিদ করেছিলেন সেটা তে এ বছর থেকে বছরে ছ বার ধান ওঠার কথা l  কিন্তু দুঃখের কথা হল যে একবার ও ফসল ওঠেনি l  এমন বেমতলব ইনভেস্ট হয়ে গেল যে বলার নয় l  উনি এক বিজ্ঞানির থেকে ফর্মুলা নিয়েছিলেন বিনা জলে ধান চাষ l  শুধু শুরুতে একবার জমিতে রেশিও মেপে হাইড্রোজেন আর অক্সিজেন ইন্জেক্ট করতে হবে l  ব্যস সারা বছর ওই বিশেষ ফর্মুলায় আপনাআপনি জমিতে চাষের প্রয়োজনীয় জল থাকবে l  কিন্তু লোকটা মনে হয় ফ্রড l  রাম রতন বাবু মাথায় হাত দিয়ে এই ঘোর গরমে ঠা ঠা পোড়া রোদে ফুটিফাটা জমির দিকে চেয়ে বসে আছেন l
        ফেলুদা মিস্টার নরেশ ঝুনঝুনওয়ালার কথা খুব মেনে চলে l  শুধু সত্ পুলিশ অফিসার বলেই নয় ভদ্রলোক ফেলুদার একেবারে পাঁড় ভক্ত l  ফেলুদার কথা একেবারে বেদ বাক্য l  কেসটা হাতে নিয়েই ফেলুদা বলল - তপসে অফিসার বাবুর পিতাজিকে কে ঠকাল বলত ? বললুম কি করে জানব ? এখনও যথেষ্ট ক্লু এর অভাব l  ফেলুদা কাগজ থেকে মাথা না তুলেই বলল - এর আবার ক্লু কি ? ওনার মাথার অসুবিধে l  এ যে জানে সেই প্রফেসর শঙ্কুর একটা নকল হাজির করে এরকম কাণ্ড ঘটাতে পারে l  চল শুরু কর l  দেখি তুই কতটা সাবালক হয়েছিস l 

ঘুম

উঁহু এ হাতে নয়, ডান হাতটায়।  মীরা দেখালেন বিভূকে। বিভূ আসতে আসতে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল মীরার হাতটায়।  বড্ড ব্যথা? দিদি? মীরার মায়া হল।  মাথা নাড়লেন। না, খুব নয়, ওই অল্প অল্প। সামান্য হাসলেন। কি করে বলবেন বছর পাঁচেকের  নাতি কে যে ব্যথায় প্রাণ চলে যাবার মত।  হাতটা কনুই থেকে লগবগ করে ঝুলছে। এখন তো কেউ নেই বাড়িতে। যত কষ্টই হোক তবু অন্তরে ঘা এখনো পরেনি। এরপর বিভুর বাপ মা এলে কষ্টের শেষ হবে একেবারে। বিভু তখনও ছলছলে চোখে মীরার দিকে তাকিয়েছিল। দিদি মাম কে বাবিকে বলবেনা তো আমি তোমায় ফেলে দিয়েছি?      ওর  চোখে খুব ভয় ।  না না , সোনা, তাই কি বলতে পারি? তুমি কি ইচ্ছে করে ফেলেছ? আমি তো নিজেই পড়ে গেছি। বিভু একটু আশ্বস্ত হয়ে মীরার কোলের কাছে ঘেঁসে এল। দিদি ঘরে শুয়ে থাকবে? চল যাই। মীরা উঠে পরলেন। 
                  বিকেল পর্যন্ত যন্ত্রণা সইতে সইতে চেতনা হারিয়ে ফেললেন মীরা। বিভুর মা বাবা বাড়ি ফিরে অচেতন মীরাকে দেখে বিপদে পড়ল। দেখ দেখি, এই অবেলায় কোথায় ডাক্তার কোথায় কি! মা যে কি করে! বারণ করলেও শোনে না। কি করা যাবে এখন? বিভু খবর ততক্ষণে দিয়ে দিয়েছে যে দিদি পড়ে গিয়ে হাতে লেগেছে। খুব ব্যাথা। ওই ডান হাতটায় । কি করে পড়ে গেল দিদি? বিভু ভ্যা করে কেঁদে ফেলল।  মা বলল, আহা, ওই একরত্তি ছেলে কি জানে? মায়েরই ত সাবধান হওয়া উচিৎ!
                      হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার সময় বিভুর বাবা ওর মা কে বলল - ছেলেটা কে এখনই বোলো না যে মা কোমায়।  খুব কান্নাকাটি করবে। 
                        আজ দশ দিন  হয়ে গেল মীরা কোমায়। ডাক্তার হাল ছেড়ে দিয়েছেন। বিভু বিকেলে ঘূম থেকে ঊঠে মা কে বলল - মা দিদি কবে ফিরবে ? মা - কেন রে? দিদি যে খুব ঘুমোচ্ছে। বিভু বলল - দিদি আমার সঙ্গে আর খেলবে না? সেদিন যে খেলতে খেলতে আমি দিদি কে এক ঠেলা দিলাম আর দিদি পড়ে গেল দিদির হাতে ব্যথা লাগল, তারপর থেকেই দিদি ঘুমোচ্ছে ? মা তাড়াতাড়ি বিভুর মুখ চেপে ধরল। চুপ, একদম চুপ। বাবা যেন জানতে না পারে ।

দিদিমণি

একটু সরে বসুন প্লিস l  শুনেও না শোনার ভান করলেন মহিলা l  চোখ বন্ধ করে মাথা দোলাতে দোলাতে চললেন l  লোকাল ট্রেনে এ সময়ে যে মানুষ মারা ভিড় হয় তার মধ্যে বসে কেউ যে এমন দম বন্ধ করে ঘুমোতে পারে সেটা ভাবতেও অদ্ভুত লাগে l  বসার জন্যে একটু ফাঁকা জায়গা মিলবেনা জেনে শ্রী গোমড়া মুখে বিরক্তি টা প্রচ্ছন্ন না রেখেই দাঁড়িয়ে রইল l  ট্রেনটা স্টেশনে এসে ব্রেক দিলেই না পেরে মহিলার ওপর ঝুঁকে যাচ্ছিল সে l আর তাইতে আধবোজা চোখ খুলে একটু অপ্রসন্ন মুখে তিনিও তাকাচ্ছেন l এভাবেই চলছিল l  লেডিস কামরা l পুরুষ হকারের আধিপত্য l  দশ টাকায় তিনটে লেবু বিক্রি হচ্ছে l  হামলে পড়ে সকলে কিনছে l  মহিলাও বাদ নয় l  শ্রী বলল কি ঝুঁকে পড়ে এভাবে লেবু কিনছেন ? দাঁড়াতে পারছিনা একে ! কোন হেল দোল নেই l মহিলার গলা শোনা গেল l ট্রেনে যাতায়াতের অভ্যেস না থাকলে এরকম হয় l  হকার ছেলেটি দাঁত বের করে ততক্ষণে জিজ্ঞেস করছে মহিলাকে l  দিদিমণি কদিন দেকিনি যে ? মহিলা জবাবে জানালেন ইস্কুল বন্ধ ছিল l  অ ! ইস্কুলের দিদিমণি ! শ্রী মনে মনে খুব হাসল l  তাই এত বিরক্ত l  সাতসকালে পাঁচন গিলেছেন যেন l  পরের স্টেশনে অনেক লোক নামবে l  দিদিমণি ও নামলেন l  শ্রী স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বসল l  সে একেবারে শেয়ালদা নামবে l
       ঝিমুনি লেগে গিয়েছিল l  অনেকের ডাকে চোখ খুলতেই দেখল রেল পুলিশ l  কি ব্যাপার ? অনেক ঘুমিয়ে পড়েছিল ? ইশ ছি ছি l  শ্রী তাড়াতাড়ি উঠে পড়ল সিট ছেড়ে l  কিন্তু পুলিশ গুলো পথ আটকাল  l  না না l  কোথাও যাবেননা l  দেখে তো ভদ্রলোক ই তো মনে হচ্ছে l  কি হল ? শ্রীর চোখে প্রশ্ন l একটি পুলিশ গলাটা এক রকম করে বলল - কি ন্যাকা ! না ? বুঝতে পারছেন না ? পায়ের তলায় রাখা ব্যাগটা দিন l  কদিন এ লাইনে ? শ্রী হতভম্ব কাঁদ কাঁদ l  বিশ্বাস করুন আমি কিছু জানিনা l  এটা আমার নয় l  আমি তো শ্বশুর বাড়ি যাচ্ছি l  ঠিক এই সময়ে সেই লেবুর হকার প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে মজা দেখছিল l  শ্রী বলল এই তো l  ও জানে l  কি ভাই বলনা l  ব্যাগটা তো দিদিমণির ! হকারটা এক গাল হেসে বলল - দিদি কি নিজের মালপত্র ও ভুলে গেলেন ? ব্যাগ ট্যাগ দেখেশুনে নিয়ে নামুন l  শ্রী কেঁদে ফেলল - মিথ্যে কথা l  পুলিশ বলল - থানায় গিয়ে বলবেন l 

উন্মাদের কলাম : শ্বাশ্বত

উন্মাদের কলাম : শ্বাশ্বত

কবির জন্মদিন

          ভরা বৈশাখের বিকেলে গুমোট গরমে টেনিদার ইচ্ছে হল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিন করবে । কিন্তু বললেই তো হলনা । প্রিপারেসান আছে । রোয়াকে এসব মহৎ কাজ না করে টেনিদা বলল - চল, কলেজ স্কোয়ারে যাই । নিমরাজি না হয়ে উপায় কি? হাবুল নিচু স্বরে বলল কাম সারসে । টেনিদা বাঘের মত গলা করে বলল - কিরে হাবলা? ঠাকুর দেবতার পাট একেবারে তুলে দিয়েছিস মনে হচ্ছে?   ক্যাবলা হাসি চাপল । ঠাকুর হলেন রবীন্দ্রনাথ ? আমার পটল দিয়ে সিঙ্গি মাছের ঝোল খাওয়া শরীর । বিবাদে গেলুম না । বললুম - চল চল পুলের ধারের বেঞ্চিতে বসি ।
            পার্ক বেশ ভর্তি । সাঁতারের লোকে ভরা । তবু এক কোণে বেঞ্চিতে গিয়ে চার মূর্তিতে বসলুম । টে নিদা এদিক ওদিক দেখে বলল গান বেছে এনেছি । হাবুল আমি আর ক্যাবলা চোখ চাওয়া চাওয়ি করে ইশারা সেরে নিলুম । যদি বেগতিক দেখি মারব ছুট । বললুম - তোমার হঠাত  এমন শখ হল কেন ? আমরা তো আগে কখনও রবীন্দ্র জয়ন্তী করেছি বলে মনে পড়ছে না । টেনিদা বলল - পাড়ায় ভাবমূর্তি টা উজ্জ্বল করতে হবে রে । আমাদের লোকে আর ভাল চোখে দেখছে না । অবাক হবার ভান করলুম - কি করে জানলে ? টেনিদা বলল - দেখিস না? এখন আর কেউ খোঁজ করেনা । এটা ওটা খাওয়ায়না । অ আচ্ছা । তা কর জন্মদিন পালন । কি দিয়ে করবে? টেনিদা বলল - ক্যাবলা একটা ভালো দেখে কবিতা পড়বে । কি কবিতা ? টেনিদা খ্যাচ খ্যাচ করে উঠল । ওহ জ্বালাসনি তো । কত কবিতা । ক্যাবলা বলল - কবিতা কি কম পড়িয়াছে ? টেনিদা বলল - কুমোরপাড়ার গরুর গাড়ি আছে , ছোট নদী আছে । হাবুল শেষ করতে না দিয়ে বলল -  ছোট খোকা বলে অ আ, শিখে নাই সে কথা কওয়া । লম্বা হাত টা বার করে টেনিদা এক খানা কষে রদ্দা দিতে গেল । কিন্তু হাবুল নিখুঁত ডজ করল । আমি বললুম তুমি বরং তোমার রোলটাই বল । টেনিদা গান ধরল - এ কি লাবন্যে পূর্ণ । যেই না লা বলে আ আ টান দিয়েছে খুদে সাঁতারু কয়েক জন জল থেকে উঠে সোজা দৌড়তে শুরু করে দিল । গতিক দেখে আমি হাবুল আর ক্যাবলাও সটকাবার ফন্দি করেছি যেই টেনিদা বাঘা গলায় বলল - গান থামাতে চাইলে এখুনি মটন রোল নিয়ে আয় প্যালা । কুইক । আমরা তিন জনেই দৌড় লাগালুম । 

রবি পক্ষে

রবি পক্ষে
"আমার পুরনো খাতা খানা রেখেছিলেম নতুন কবিতার তরে l  নতুন যুগের ওপার হতে বইবে নতুন হাওয়া l  তার সব প্রকাশ টুকুই হবে অন্য রকম l  তাই খাতা খানা মেলে ধরতেই পেলেম  ঝকঝকে উজ্বল এক পাতা l  তাকে আর যাই বলা যাক পুরনো বলা চলেনা l নব্য যন্ত্র তাকে এমন চমক দিয়েছে যে সে এখন খাতা ছেড়ে আমার সামনে রাখা চৌখুপী বাক্সতে l  আর কি বলব তোমায় প্রতিটি পাতায় কলমের আঁচড় কাটাকুটির ধার ধারেনা l  ছেলেবেলার পেন্সিলের দাগ মোছার মতই সহজ l  কি ভালই যে লাগছে l  তবে সব নতুন জিনিসের মতই এর ও একটি মন কেমনের কথা আছে l  সে হল পাণ্ডুলিপি কাটাকুটির ছলে সৃষ্টি হত যে নিত্য নূতন চিত্র তা এতে গড় হাজির l  "

কবিগুরু নিজে কি লিখতেন জানিনা তবে এখন এই virtual লেখালিখির সময়ে এরকম কিছু কি লিখতেন না ?

আকাশটা



হাতে তোলা সদ্য ফোটা যুঁই ফুল গুলো নিয়ে একমনে প্রাণ ভরে সুবাস নিচ্ছিল তিতির।  আর ভাবছিল বেঁচে থাকাটা যদি শুধুই গন্ধ নির্ভর হত ! খাওয়ার ঝামেলা থেকে রেহাই।  কোনো কঠিন কিছুই থাকতনা।  স্রেফ হাওয়ায়  জীবন। বেশ হত কিন্তু।  তবে ভাববার বেশী সময় পাওয়া গেলনা।  হাতের ফোনে সমানে ভেসে উঠছে দরকারী কথা।  আজ নতুন ল্যাবে যেতে হবে।  কলেজে নতুন একজন প্রফেসর এসেছেন। তিতির শুনেছে তিনি নাকি একজন জাদুকর।  সেই থেকে মেলবার তাগিদটা বড় বেশী হয়ে পড়েছে।   তিনি আসার আগেই তাঁর  জন্যে ল্যাব তৈরী হয়েছে।  এ পর্যন্ত সেখানে সব্বার প্রবেশ নিষেধ ছিল।  আজ সেখানে গুরু শিষ্যের সাক্ষাত।  বাকী সহপাঠীরা তার মত কেউ এত উৎসাহী নয়।  কিন্তু তিতির  ম্যাজিক দেখবে এই আনন্দে আজই যাবে ঠিক করেছে।  অন্য স্যার যাঁরা আছেন তারাও বলেছিলেন - কি হবে ? পরে যাও।  ওঁকে একটু এখানকার ব্যবস্থার সঙ্গে সড়গড় হতে দাও।  কিন্তু তিতির মনে মনে জানে সে যাবেই।  ল্যাব এসিস্টেন্ট সনাতনদা কে তাই বলে রেখেছে যে সে আজ যাবেই।
                 বিরাট কাচের সুইং ডোরটা ঠেলে তিতির ঢুকল সদ্য বানানো এই হলঘর টায়।  বিল্ডিং এর এক্কেবারে ওপর তলায় বানানো হয়েছে এটা।  ভেতরে ঢুকে দেখল প্রচুর যন্ত্র পাতি, সাজ সরঞ্জাম।  লম্বা লম্বা টেবিলের ওপর সাজানো।  কখনো ল্যাবরেটরিতে ঢুকে এভাবে দেখার সুযোগ পায়নি সে।  ঘুরে ঘুরে দেখছিল ঠিক সেই সময়ে কারো গলা শুনতে  পেল    - তাহলে তুমিই তিতির ? তিতির এরকম চমকান কখনো চমকায়নি।  হঠাৎ কখন এসেছেন ইনি ? এই তবে নতুন স্যার?  সে একটু সামলে নিয়ে বলল - হুঁ আমিই তিতির।  স্যার বললেন সনাতন বলেছে যে আজ একজন ছাত্রী আসবে ল্যাব দেখতে।  তার নাম তিতির।  একটু মুচকি হেসে বললেন - এর মধ্যে কিন্তু কোনো ম্যাজিক নেই।  তা তুমি ও আজ এখানে প্রথম আর আমিও।  চল আজ একটু নেড়েচেড়ে দেখা যাক।
                   দুজনে হাঁটতে হাঁটতে বিভিন্ন কাচের বিকার টিউব ফ্লাস্ক এসব দেখছিল।  স্যার বললেন - তিতির চল একটু আকাশ তৈরী করি।  তিতিরের মুখটা হাঁ হয়ে গেছে।  আকাশ ?  আকাশ  তৈরী করা যায় নাকি? স্যার হাসলেন।  করা যায় বইকী।  স্যার একটা টেস্ট টিউব নিলেন হাতে।  নিজের এপ্রনের পকেট থেকে মোড়ক বার করলেন। আর তারপর সেই মোড়ক খুলে একটু নীল রঙের  পাউডার নিয়ে  টেস্ট টিউবটায় ফেললেন।  টিউব থেকে নীল নীল ধোঁয়া বেরোতে লাগল।  আস্তে আস্তে সেটা পুরো ঘরে ছড়িয়ে পরল।  তিতির অবাক হয়ে দেখল ঘরের দেওয়াল গুলো যেন কি করে মিলিয়ে যাচ্ছে।  ভয়ে সে চোখ বন্ধ করে ফেলল। স্যার বললেন - চোখ খোলো তিতির।  দেখ আকাশ তৈরী।  তোমার যুঁই ফুল গুলো ছড়িয়ে দাও।  তিতির দুহাত ছড়িয়ে দিল।  আস্তে আস্তে ভয়টা  হারিয়ে গেল।  তিতির দেখল
শরীরটা  কি হালকা ! যেন সে কিছুতেই আটকে নেই।   স্যার বললেন - ম্যাজিক তিতির।   তুমি ল্যাব এ ম্যাজিক দেখতে এসেছিলে তাই তোমাকে ম্যাজিক দেখালাম।
                    সেই থেকে তিতিরের আর কিছুতেই ভয় হয়না । স্যার তাকে আকাশ তৈরি করতে শিখিয়ে দিয়েছেন যে !
               

#কষ্ট


এক এক দিন খুব ধীরে কাটে। চাইলেও সময়কে জোর করা যায়নাহেলতে দুলতে গদাই লস্করি চালে সে আমার সময়কে কেবলই নষ্ট করে l এই সব দিন বড় কষ্টেরএমনই একদিন ঠিক করেছিলাম কষ্টের হাত ধরবছাড়ব না কিছুতেই আসলে খুব একাকেউ চায়না ওকেআর বিশ্বাস কর ঠিক সেইদিন থেকে কষ্টের সাথে আমার খুব বন্ধুত্বএখন কষ্ট আছে,  আমি আছি,  আর অদ্ভুত ! দিনগুলো গড়গড়িয়ে যায়বন্ধুত্ব এমনইতোমাকে বুঝতেই দেবেনা যে দিন পাত আসলে খুব দুরূহ। 

শ্বাশ্বত

সেই কোন ভোরে উঠে দিন শুরু করেছি l  এতটুকু বিশ্রাম নেই l  প্রতীক থাকেনা বলে একা হাতে সব দেখতে হয় l  এই সময়ে ক্লিনিক থেকে জরুরি ফোন l  মাদাম যদি একটু আসতে পারেন প্লিস ! খুব বিপদ হয়েছে l নিস্পৃহ যে থাকতে পারিনা সেটা আমার ই স্বভাবের দোষ l বললাম সজল দা কি হল ? উত্তর এল sir এর শরীর খারাপ l  বাড়ি থেকে বেরোনোর সময়ে মাথা ঘুরে গেছে l  এই গরম l  হতেই পারে l  জিজ্ঞেস করলাম patient কজন ? বলল সাত l  ঘেমে গেলাম শুনে l  আটটা নাগাদ ও যদি পৌঁছে যাই দশ থেকে সাড়ে দশটা বাজবে l  তাড়াতাড়ি করে স্নানে চলে গেলাম l  বাথরুম থেকেই শুনলাম বুবুনের ঠাকুমা বলছেন আজ যে বীথির (ওঁর বড় মেয়ে ) আসার কথা l  শুচি কি রান্না হবে ? বললাম মা আমি বুবুন কে স্কুলে দিয়ে একটু ক্লিনিকে যাব l  ফিরে এসে দেখছি l  মা বললেন মায়া (রাঁধুনি ) আসবেনা l  চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে বললাম এসে সব ব্যবস্থা করছি l  মার গম্ভীর  গলা পেলাম l  কি করে তুমি সব ফেলে নাচতে নাচতে সাত সকালে চললে দেশসেবা করতে, ভেবে পাইনা l  সংসারের ঝক্কি আমি আর কেন পোহাব বাপু l  ভাবছি বলি যে ঠিক নাচতে যাচ্ছি না, কিন্তু সময়াভাব l  তত ক্ষণে বুবুন টানাটানি শুরু করে দিয়েছে l  মাম দেরি হচ্ছে চল l  স্কুটিতে তাড়াহুড়ো করে নিজের জলের বোতল নিতে ভুল করলাম l  কিছু করার নেই l  বুবুন কে স্কুলের গেটে নামিয়ে এলাম ক্লিনিকে l চেম্বারে ঢুকে বসে জীরোনোর উপায় নেই l  সময় কম l  বললাম patient পাঠান l  সব একরকম হচ্ছিল, শেষে একটি মেয়ে এল l  সাথে তার স্বামী l  অবাক হয়ে দেখলাম লোকটি ওই সাত সকালে আকন্ঠ  মদ খেয়ে এসেছে l  মেয়েটি লাজুক হাসি মুখে সামলাতে চেষ্টা করছে l  কিন্তু লোকটি তাকে কথা বলতেই দিচ্ছেনা l  যতবার সে বলতে চাইছে তার অসুবিধে কোথায়, লোকটি ততবারই তাকে থামিয়ে নিজে কথা বলছে l  মেয়েটির চোখে কেমন ভয়ের ছায়া l  একবার ভাবলাম বলি patient দেখবোনা l  সময় চলে যাচ্ছিল l  তারপর মনে হল মেয়েটির সুরাহা হবেনা l  দক্ষিণ দেশীয় l  কথা বুঝতে অসুবিধে হচ্ছিল l  লোকটি ইংরিজি জানলেও মেয়েটি স্বচ্ছন্দ নয় l  শেষমেষ লোকটিকে রুগীকে পরীক্ষা করব বলে ঘরের বাইরে পাঠালাম l মেয়েটির মুখ্য অসুবিধে তার এখনো বাচ্চা আসেনি l  তাকে দেখতে দেখতেই প্রতীকের ফোন এল l  শুচি তুমি এত সকালে চেম্বারে কেন ? দিদিরা আসছে l  মা একা l  একটা কাণ্ড জ্ঞান নেই ! অদ্ভুত !! আগে বাড়ি যাও l   মা নিজে নিজে কিছু করতে গিয়ে কিছু হলে ? উহ কি মুস্কিল ! প্রতীকের গলাটা ফোন পেরিয়ে ঘরের মধ্যেও শোনা যাচ্ছিল l  আমি বলতে চাইলাম চিন্তা কোর না l  কিন্তু প্রতীক তখনও সমানে বলে চলেছে l  মেয়েটি অবাক হয়ে আমাকে দেখছিল l  খুব অস্বস্তি হচ্ছিল l  আমি মাথা নিচু করে প্রেসক্রিপশন লিখতে লিখতেই প্রশ্ন টা ভেসে এল l  husband ?

একটি বিকেল বেলার গল্প

চাটুজ্যেদের রোয়াকে আর হয়ত কিছুদিন পর থেকে বসা চলবেনা।  কানাঘুষো শোনা যাচ্ছে যে বাড়িটা প্রমোটার কে দেওয়া হবে।  এ খবরে আমাদের মন অতি বিষন্ন।  বিশেষত টেনিদার।  এখানে ও এখনও যেভাবে রাজা উজির মারে আর আমাদের গ্যাঁট কাটে সেটা অন্য কোথাও অসম্ভব।  আর আমি তো মনে মনে স্থির করেই নিয়েছি একবার রক হাতছাড়া হলে আর টেনি মুকুজ্জের সাথে একেবারে no relation . ওর হাতে যা হেনস্থা হওয়ার আমিই বেশি হয়েছি।  তবুও এতদিনের আড্ডাস্থল , মন কি মানে ! কাল বিকেলে সেই রকেই তো যা একখানা কান্ড হল কি বলব।  সেই কথাটা বলতেই এই ঠাঠা পোড়া রোদ্দুরে আমি এলাম।
                              হলো কি , গতকাল টেনিদা যথারীতি বাড়ির নিচে থেকে প্যালা প্যালা are you dead ? বলে চীৎকার শুরু করল।  মেজদার কানমলার ভয়ে দৌড়ে নেমে এসে বললাম একটু কি ভলিউম কন্ট্রোল হয়না ? কি বলছ তাড়াতাড়ি বল।  আমি joint এর প্রিপারেসন নিচ্ছি।  টেনিদা বিশ্রী ভাবে ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ করে হেসে বলল এখন তো আয়।  আগে পাড়ার মান সম্মান তারপর নয় পড়ার মান।  কোনো উপায় নেই দেখে ওর সাথে রোয়াকে গিয়ে বসলাম।. দুজনে বসে গুলতানি শুরু করব ঠিক তখনি এক বয়স্ক অবাঙ্গালী লোক এসে রকে বসলেন।  টেনিদা মুখ খিচিয়ে বলল - ভ্যালা জ্বালা।  ভদ্রলোক কিন্তু ততক্ষণে হাসি হাসি মুখ নিয়ে কাছে চলে এসেছেন।  আমাদের দিকে তাকিয়ে কথাও শুরু করে দিলেন।  টেনিদা  ওর পক্ষে যতটা সম্ভব ফিসফিস করে বলল - এই এটা দালাল।  প্রোমোটার  এর।  পাত্তা দিসনা। কথা শুরু হল।
        ভদ্রলোক জানালেন ওঁর নাম রামরতন ঝুনঝুনওলা।  উনি শুনেছেন এ বাড়িটা বিক্রি আছে তাই খোঁজ নিতে এসেছেন। বললেন - সুনেলম কি এ মাকান ঠো বিচবে তো ও বেপারে একটু কোথা করতাম।  টেনিদা বলল - ভুল শুনেছেন। এ বাড়িটা ভুতের বাড়ি।  খুব শিগগির এটা কর্পরেসান থেকে পুরোপুরি ভূতেদের বাসস্থান বলে ডিক্রি দেবে।  কিনলে বেদম ঠকা হবে।  ঝুনঝুনওলা বললেন - ই কোথা আপুনি বিশোয়াস কোরেন ? ভূত উত কুছু আছে না কি ভাজারি বাবু ? কর্পরেসান থিকে একটু ঝামেলা হচ্ছে তো সে হামি বুঝে নেবে।  টেনিদা ওর নামের এরকম দুরবস্থায় বিপুল চটল।  কিন্তু মুখে কিছু বলছেনা।  ঠিক এই মোক্ষম সময়ে ওপরের বারান্দা  থেকে চাটুজ্যে গিন্নী এক বালতি জল ফেলল।  গরমে জলে ভিজতে মন্দ লাগলনা। আর এই ফাঁকে টেনিদার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হলো।  ঝুনঝুনওলা কিন্তু খুব একটা কাবু হলেননা।  বললেন - হামি পান্ডিত কে লিয়ে আসব।  পূজা উজা দিতে হোবে।  হাবান করাইতে হোবে।  বাস।  ঔর কি।  ভদ্রলোক ফাইন ধুতি পরে আছেন।  পা গুটিয়ে বাবু হয়ে গুছিয়ে বসলেন।  যাবার কোনো নামই করছেন না।  বেগতিক দেখে আমি বললাম রবিবার দেখে আসুন।  আমি কাকাবাবুর সাথে কথা বলিয়ে দেব।  আজ তো কেউ নেই।  টেনিদা ওর কনুই দিয়ে এক গোত্তা মারল আমার পাজরে।  খুব জোরে লাগলেও আমি পাত্তা না দিয়্রে ওকে বললাম - আরে বাবা এখনকার মত তো রেহাই পাই।  এঁকে ভাগ দিতে হবে বলে টেনিদা আজ কিছু খাওয়ার ও নাম করছেনা।  ভদ্রলোক গুনগুন করে ভজন গাইছেন।  মনে হল খুব ধার্মিক গোছের।
           হঠাত একটা লালবাতি ওয়ালা পুলিশের গাড়ি এসে রকের সামনে থামল।  টেনিদার তো ভয়ে মুখ শুকিয়ে গেছে।  ও যে কিরকম সাহসী সে তো সব্বাই জানে।  ঝুনঝুনওলা কিন্তু এক ভাবে বসে।  চোখ বন্ধ করে গেয়ে চলেছেন।  গাড়ির দরজা খুলে ততক্ষণে এক অফিসার , খুব স্মার্ট একেবারে ঝকঝকে যাকে বলে , সামনে এসে দাঁড়ালেন। বিশুদ্ধ হিন্দিতে বললেন বাবুজি ঘর চলিয়ে।  বিনয়ের সাথে অনুযোগ করলেন যে কেন উনি এভাবে একা একা এসেছেন।  তাও এতদুরে।  আমরা তো অবাক।  টেনিদা নাক টাক চুলকে বলতে চাইল যে এ ব্যাপারে আমাদের কোনো ভুমিকা নেই।  আমরাও জানিনা যে উনি বাড়িটা কেন কিনতে চান।  বিশেষ করে ওঁর ছেলে যখন এত বড় একজন পুলিশ অফিসার।  আমি হাসি চাপলাম।  পুলিশের যেন ঘর বাড়ি লাগেনা।  অফিসার আরো বিনয়ের সঙ্গে আমাদের ধন্যবাদ জানালেন ওঁর বাবাকে বসিয়ে রাখার জন্যে।  বললেন পিতাজি কি কারণে একটু মানসিক অসুস্থতায় ভুগছেন।  ডাক্তার হাসপাতালে দিতে বলেছিলেন কিন্তু পিতাজিকে এ অবস্থায় চোখের বাইরে করতে পারবেননা।
টেনিদা শেষবারের মত বলতে চাইল - উনি যে বাড়িটা কিনবেন বলছিলেন ? অফিসার হেসে বললেন ওই তো ওঁর অসুবিধে।  অসুখ।  তারপর  হাতজোড়  করে বিদায় চাইলেন।  ঝুনঝুনওলা কিন্তু খুব একটা রাজি ছিলেননা।  সঙ্গের লোকেরা অনুনয় বিনয় করে নিয়ে গেলেন।
         টেনিদা উদাস সুরে বলল - দেখ কি সুসন্তান।  কেমন বুঝিয়ে নিয়ে গেলেন। আমি নিঃশাস ফেলে বললাম - যাক আর একজন প্রোমোটার কে সরানো গেল।  তারপর দুজনে রোযাকটার গায়ে হাত বুলিয়ে বাড়ি ফিরে এলাম।   


ইচ্ছে

এই কে আছিস আমার মনটাকে একটু তুলে রাখ l  দেখিস যেন লকারে চাবিটা ঠিক করে দিস l বড্ড দামী রে l  হারালে বা হাপিস হলে খুব প্রবলেম l
এইরকম কথা শুনতে শুনতে আজকাল বিরক্তি ধরে গেছে l  মুরোদ নেই যে লকারে রাখার মত সত্যি কিছু আনতে পারে শুধু কতগুলো কথার কচকচি l
তবুও গিন্নী আঁচলের চাবির গোছাটা ঝনঝন করে মাটিতে ফেললেন l  তা  থেকে বেছে বেছে সবচেয়ে নকশা কাটা চাবিটা বার করলেন l  আর তারপর দেরাজের গোপন কুঠরীতে চাবি ঘোরালেন l  কত্তা আড়চোখে মৃদু হাসিতে মুখ ভরিয়ে দেখে নিলেন l
আড় ভেঙ্গে বললেন - গিন্নী কত জমল? গিন্নী বাঁকা মুখে ঘাড় বেঁকিয়ে বললেন - রাজার ঐশ্বর্য l  এবার কি দয়া করে নিত্যকর্ম করা হবে ?
নববর্ষ
শিপ্রার তীর হতে বসন্তের মলয়ানিল অন্তর্হিত । এখন প্রখর গ্রীষ্মের উত্তপ্ত হাওয়া নদীর জলীয় বাষ্পে আরও ক্লান্তিকর হয়ে উঠেছে । মহাকবি আজ মালিনীর গাঁথা বেলির মালাটি কণ্ঠে পরেন নি । বেশভূষা অসহ্য লাগছে । মালাটিতে জল ছিটিয়ে সামনে রাখা আছে । মাঝে মাঝে তা থেকে মৃদু সৌরভ উঠছে । কবি আজ একটু আনমনা । নবরত্ন সভা গ্রীষ্ম কালীন অবসর ভোগ করছে । কিন্ত রানী ভানুমতীর আর্জি যে আর একখানি কুমারসম্ভব গোছের কাব্য নিতান্তপক্ষে না লিখলে তাঁরও প্রকৃতির এই চরম অবস্থা সহ্যের অতীত হচ্ছে । 
কালিদাস চেয়ে আছেন শুন্য চোখে । এমন সময়ে দেখলেন কুটীরের প্রাঙ্গণে প্রবেশ করলেন ভজহরি মুখোপাধ্যায় । তিনি বিলক্ষন চেনেন এঁকে । একখানি আসন এগিয়ে দিলেন বটে তবে বললেন – এত তাপে মৃত্তিকাই সর্ব শ্রেষ্ঠ আসন । তারপর প্রশ্ন করলেন – অধম কে কি মনে করে ? ভজহরি মুখার্জী ওরফে টেনিদা বলল –এবার স্যর খুব ঝামেলা ৷ নববর্ষের অনুস্ঠানের দফারফা ৷ শিল্পীদের কুলফি দিয়েও পাওয়া যাচ্ছেনা ৷ এত চার্জ যোগাড় করা অসম্ভব ৷ একটা উপায় যদি বলেন তাই এলাম ৷ কবি হেসে ফেললেন ৷বললেন – এই জন্যে টাইম ট্র্যাভেল করতে হল ? আমার কথা মনে হওয়ার কারণ ? টেনিদা বলল – খুব সোজা ৷ রানীর খেয়াল যিনি মেটাতে পারেন তিনিই উপযুক্ত এ আলোচনার ৷ কিছুক্ষণ নীরব থেকে কবি বললেন – তোমরা যে একটুও পাল্টাতে পারোনা ৷ বলেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ৷ তারপর বললেন – নববর্ষ কি নববর্ষার দিনটিতে করা অসম্ভব ? তাহলেই তো গোল মেটে ৷ টেনিদা চীৎকার করে উঠল – ডি লা গ্র্যান্ডি মেফিস্টোফিলিস । কালিদাস বললেন এ কি ভাষা ? টেনিদা বলল ইটি আপনার নতুন কাব্যের নাম ৷ আপনার জন্য এটুকু তো করতেই পারি ।

ইকেবানা

দুঃখটাকে ওই নতুন কেনা নীল চীনের ফুলদানিতে রাখো ।  চারপাশে সবুজ অভিমানের পাতাবাহার সাজাও । দু একটা রাগ লাল গোলাপের মত গুঁজে দিও । আর হ্যাঁ, ঈর্ষার দর্শক কে ডেকে এক গেলাস মন কেমন সরবত দিও । ওর ভালো লাগবে । দিনের শেষে দেখবে ফাঁকা ঘরে কেমন একপা একপা করে খুশী ঢুকবে চুপিচুপি । তবে এই যা কষ্ট, যে, নীল চীনের ফুলদানিতে ততক্ষনে দুঃখ নেতিয়ে পরবে । রাগের গোলাপের রঙ ও আর ততো গাড় থাকবেনা । তবে সবুজ অভিমানের পাতাবাহার তখনও বেশ স্নিগ্ধ থাকবে । মিলিয়ে নিও । 
সত্যাসত্য
রবিবারের সকাল । ফেলুদার প্রাতঃকালীন ব্যায়াম ও শরীর চর্চা শেষ । এমনিতে সে আগের মতই ফিট । শরীর আর মন দুয়েতেই । তবে কাজকর্মে একটু ভাঁটা । তাতে অবিশ্যি তার কোনও হেলদোল নেই । তার মতে সব কিছুর পেছনে একটা কারণ আছে । এটাকে cosmic law বলে । এখন হল নিজের জ্ঞানগম্যি বাড়ানর সুযোগ । সে তাই সময় পেলেই ইন্টারনেট এ ব্যাস্ত । আমার এর ফলে একটু  GK আর Current affairs  এর  জ্ঞান বাড়ছে । আজ সকালে ফেলুদা তার পূর্বে ব্যাবহৃত যন্ত্র পাতি গুলো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করছিল । ঠিক সাড়ে নটার সময়ে বলল তোপসে একজন নিপাট বাঙ্গালী ভদ্রলোক আসবেন । মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই । এ ঘরে আনিস । খুব পরিচিত ও কাছের লোক ছাড়া ফেলুদা তার study তে বাইরের কাউকে allow করেনা । তাই একটু অবাক হলাম । মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই প্রায় ফেলুদারই সমবয়েসী একটি লোক এলেন । পরনে ধুতি ও পাঞ্জাবী । চোখে মোটা কালো ফ্রেমের চশমা । দৃষ্টি খুব উজ্জ্বল । বললেন – প্রদোষ বাবুর সাথে দেখা হওয়ার কথা আছে । নিশ্চয়ই ! বলে ভেতরে নিয়ে গেলাম । ফেলুদা তখন বাইনকুলারটা মুছছিল । ওঁকে দেখেই উঠে দাঁড়াল । সাদরে বসাল । আমি বহুদিন পর একটু কৌতুহলাক্রান্ত হয়ে পড়লাম । কোনের সোফাটায় বসে পড়লাম । জানা গেল ইনি ব্যোমকেশ বক্সী । সত্যান্বেষী । দুজনের যে কথা হল সেটা আমি হুবহু তুলে দিচ্ছি । পাঠকের বিশ্লেষণ করতে সুবিধে হবে । বুদ্ধির ধার বাড়বে ।
ফেলুদা – বুঝতে পারছি যে আপনি একটু অসচ্ছল হয়ে পড়েছেন ।
ব্যোমকেশ বাবু – কি করে বুঝলেন ?
ফেলুদা – দেখুন আপনার বন্ধু অজিতের সাথে পাব্লিশিং এর ব্যাবসাটা ভালো চলার কথা নয় । একে আজকাল বইপত্র পড়ার চল কম তার ওপরে  বাংলা সাহিত্যের তো নাভিশ্বাস । লেখক কই ? আপনারা তো মেইনলি নভেল ধরনের বই ই ছাপতেন
ব্যোমকেশ বাবু -  কথাটা অস্বীকার করছিনা তবে জমা টাকায় এখনও হাত পড়েনি ।
ফেলুদা – ওটা অবিশ্যি আপনার personal matter. লালমোহন বাবু ও এখন লেখা থেকে অবসর নিয়েছেন ।
ব্যোমকেশ বাবু ( একটু হেসে ) – সে আপনার কেস কমেছে বলে । ওনার প্রখর রুদ্র আপনি ছাড়া দাঁড় করায় কে ! কিন্তু মশায় আপনি একটুও কাতর নন ।
ফেলুদা ( প্রশংসায় একটু লাজুক ভাব করে ) – সে আপনার মত সত্যানুরাগী নই বলে ।
ব্যোমকেশ বাবু – মানে ?
ফেলুদা – মানে খুব সোজা । ঘরে সত্যবতী নেই । আমি ব্যাচিলর । যাক গে রহস্য ছেড়ে আসুন কাজের কথায় আসা যাক । এখন ক্রাইম টাইম গুলো কেউ আর লুকিয়ে করেনা । সব বুক বাজিয়ে দিনের আলোয় করে । তাই আপনার আমার এমন বেকার অবস্থা । তবে alternative profession নিয়ে একটু ভেবেছি । আলোচনা করা যাক । দেখুন এখন আর কেউ personally appoint করবেনা । এখন collective client সব । ধরুন আমরা দুজনে মিলে এমন কিছু তথ্য জোগাড় করলাম যেটা বাজারে ছেড়ে একটি পয়সাও রোজগার হবেনা  কিন্তু ওই তথ্যই কিছু প্রভাবশালী লোকের রাতের ঘুম কেড়ে নিতে পারে । বুঝলেন ?
ব্যোমকেশ বাবু – এগিয়ে যান । পরের পাতায় ।
ফেলুদা – কাজ টা হল কোনও ভাবে এঁদের কানে আমাদের তথ্য সংগ্রহের খবরটা দিতে হবে । ব্যাস কেল্লা ফতে ।
ব্যোমকেশ বাবু – একটু অনৈতিক হবেনা ?
ফেলুদা – আলিসাহেবের সেই পারির রেস্তোরাঁয় ফ্রেঞ্চ সাংবাদিকের সাথে মোলাকাত মনে আছে তো ? না-লিখিয়ে সাংবাদিক ? nothing is wrong in love and war. খবর না ছাপানর জন্যে পকেট ভর্তি ।

ব্যোমকেশ বাবু – আপনি তো ধুরন্ধর লোক মশায় ! 
তত্বকথা

চাটুজ্জেদের রোয়াক আজ সকাল থেকেই সরগরম l হাবুল সেন খাস ঢাকাই ভাষায় আসন্ন ছুটি নিয়ে মতামত দিচ্ছিল l ভোটের জন্যে একটা ছুটি ছুটি ভাব তো আকাশে বাতাসে ভাসছে l সে বলছিল - এই যে এক খান আস্ত ছুটি, কুন কাম নাই , সুদ্দু সারাদিন ধইরা ল্যদ খামু আর সুখাদ্য খামু, এইডাই হইল গিয়া আসল গণতন্ত্র l টেনিদা মুখখানা একেবারে জলদগম্ভীর করে বলল - হাবলা তোর সারাদিন কেবল খাই খাই l একটু এগিয়ে ভাবতে শেখ l ভাবনায় একটু পরিবর্তন আন l টেনিদার এই দার্শনিক ব্যাপার দেখে আমার তো পিলে চমকে উঠল l ক্যাবলা একটু নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে বলল - আজ মনে হচ্ছে শুধু রোল এ হবেনা l ট্যাঁক খসবে ভাল মত l টেনিদা সঙ্গে সঙ্গে react করল l ক্যাবলা খবরদার l আর একটা বাজে কথা বলেছিস তো l আমি বললুম তোর কান কানপুরে পাঠিয়ে দেব l টেনিদা একটা সিনিক্ হাসি হেসে বলল - একটু পরিবর্তন আন l এক কথা বার বার বললে public খাবেনা l হাবুল সেন বলল পোলাপানের কথা ছাড়ান দ্যও l তুমি বরং পরিবর্তনের কথাডা কি কইতাছিলে কও l কিন্তু ভবি ভোল বার পাত্র টেনি মুকুজ্জে নয় l বিরক্ত মুখে বলল গণতন্ত্র সাম্যবাদ এসব শুনতে খুব ভাল কিন্তু খালি পেটে কোনটাই হয়না l তখন থেকে শুধু কুরুবকের মত বক বক করে চলেছিস l আমি দেরি না করে বললুম চল ক্যাবলা একটা চিকেন রোল আনি l টেনিদা add করল - ওটা ডবল আন্ডা ডবল চিকেন হবে l বেদুইনের টা আনিস l পেট ভরলে টেনিদা বলল বল গণতন্ত্র কি l ক্যাবলা বলল এ  সোজা l মানুষের জন্যে মানুষের দ্বারা মানুষের সরকার l টেনিদা চোখ কপালে তুলে বলল এই বুদ্ধি নিয়ে first হস l ফুহ l ওটা হল অমানুষের দ্বারা অমানুষের জন্যে অমানুষের সরকার l তোদের ডেফিনেশনটা পুরনো l ওটার পরিবর্তন হয়েছে l আমরা উঠে দাঁড়িয়ে পড়তেই টেনিদা বলল আ মোল চল্লি কোথায় ? সাম্যবাদ টা শুনে যা l বললুম বলে ফেল l টেনিদা বলল তবে শোন, সাম্যবাদ হল সবাই কে সমান চোখে দেখা l তাই বন্ধু শত্রু সব সমান l শত্রুর দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দাও l আখেরে লাভ হবে l গণতান্ত্রিক সাম্যবাদী সরকার l বুঝলি ? নাকি এখনো পরিবর্তন এলোনা ?